মঙ্গলবার ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

পোশাক রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

জানুয়ারি ৩, ২০১৮ | ১:১৩ অপরাহ্ণ

পোষাককে আমরা যতই ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশ, ব্যক্তিত্ব ও রুচির পরিচায়ক মনে করি বা ব্যক্তির কমফোর্টের অংশ ভাবি না কেন প্রকৃতপক্ষে পোষাক একটা স্বতন্ত্র রাজনীতি। পেঁয়াজের দাম বা ইলেকট্রিসিটির দাম বা রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বা রোহিঙ্গা-আশ্রয়ের মতো ধুরন্ধর রাজনীতি। আর এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভিক্টিম নারী। একইসঙ্গে লিঙ্গীয় রাজনীতি আর কাপড় রাজনীতির ডামাডোলে পড়ে ঘরের ভেতর থাকা সুবোধ নারীরা কূল পান না তারা আসলে কোন পোষাক পরবেন। গরমের দিনে নিজের পরতে ইচ্ছে করে হালকা ফিনফিনে কাপড়, শীতের দিনে বাতাস এড়াতে জিন্স সোয়েটার কিন্তু বাস্তবতা জোর করে ধরে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষাসহ সকল ঋতুতে পরায় সালোয়ার-কামিজ, বোরকা-হিজাব ইত্যাদি স্টেরিওটাইপ পোষাক, যা নারীকে নিজের ভেতর নিরাপদ বোধ করার শিক্ষা দেয়। আর শিক্ষা দেয় অশিক্ষিত থেকে শিক্ষিতদের মোহন-মানদণ্ডে ‘ভদ্র’ নারী হবার।

পোষাক নারীকে কি শিক্ষা দেয় তার চেয়ে বড় কথা এখন, পোষাক কি আদৌ নারীকে কোন নিরাপত্তা দেয়? কালো হাত-পা বন্ধ বোরকা থেকে শুরু করে মিনি-স্কার্ট পর্যন্ত বা হাফপ্যান্ট থেকে হিজাব পর্যন্ত এমন কি কোন পোষাক আছে যা নারীর গায়ে থাকলে আর সহিংসতার শিকার হতে হবে না? ধর্ষণের শিকার বা এসিড সন্ত্রাসসহ কোন প্রকার হয়রানির শিকারই আর কোন নারী হবে না? এই পোষাক-রাজনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ জাতি দেখেছে ‘ওড়না’ নিয়ে। এটি সবচেয়ে আলোচিত ঘটনারও অংশ অবশ্য। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদেরকে পাঠ্যবই থেকে শিখে নিতে হচ্ছে ছোটবেলা থেকে নারীদের পরিচ্ছদের সবচেয়ে অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ ওড়না। ওড়না যারা পরে না তারা আর যাই হোক, ভাল হতে পারে না।

আমাদের সমাজে যারা ওড়না পরে না, তারা উচ্ছৃঙ্খল, তারা খারাপ, তারা সমাজ নষ্টের বিষ, জাহান্নামের ছাইকাঠি এবং সর্বোপরি তাদেরকে যে কোন হয়রানি করা বৈধ। আমাদের সভ্য সমাজে এখনও কোন নারী ধর্ষণের শিকার হলে সবার আগে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করা হয় তার পোষাক কেমন ছিল! এখনও তনু-খাদিজার মতো মেয়েরা হিজাব পরিহিত অবস্থায় ধর্ষণের শিকার হয়ে ক্ষত-বিক্ষত লাশে পরিণত হলে তাদের আচরণ, প্রেম এবং সমাজে তাদের অংশগ্রহণ কতখানি পরিশীলিত ছিল তা নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। বোরখার আড়াল ভেদ করে তখন ফুটে ওঠে তাদের মঞ্চ-নাটকের সদস্য হওয়ার ঔদ্ধত্য। বড় হয়ে ওঠে প্রেমের অপরাধ। যেন জলে স্থলে অন্তরীক্ষে নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে থাকা ভদ্র পোশাকের, যারা প্রেম করে কিংবা নাটক করে কিংবা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা নয়।

কেউ কেউ বলে থাকেন, ওড়না বা হিজাব যার যার ব্যক্তি-স্বাধীনতা। কেউ যদি হিজাব না করাটা স্বাধীনতা মনে করেন তো হিজাব করাটাও যার যার স্বাধীনতা। এখন প্রশ্ন, স্বাধীনতা অর্থ আসলে কি? যার যখন যা পরতে ইচ্ছে করবে, যা করতে ইচ্ছে করবে, কারো ক্ষতির কারণ না হয়ে ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই স্বাধীনতা নিশ্চয়ই। তাহলে খাওয়ার সময় পর্যন্ত নেকাব না খুলে, সুইমিং পুলে নামার সময়ও বোরকা গায়ে দিয়ে যদি নামতে হয় সেটা কি করে স্বাধীনতা? প্রয়োজনে হিজাব এবং প্রয়োজনে হিজাব খুলে যে কোন পোশাক পরার নাম পোশাক-স্বাধীনতা। এর অন্যথা হলে বুঝে নিতে হবে সেটা চাপিয়ে দেওয়া এবং চূড়ান্ত রকমের আরোপিত।

হিজাব যদি স্বাধীনতাই হয় তবে ৩ বছরের বাচ্চা বইমেলার কাহিল রোদ-গরমে বিশাল হিজাবের ভেতর দরদর ঘেমে-নেয়ে মীনা কার্টুনের পাশে নুয়ে পড়ে ছবি তোলার চেষ্টা করাটা কোন স্বাধীনতার অংশ? হাঁটতে না শেখার আগেই ছোট্টশিশুদের শৈশব কৈশোর বস্তাবন্দী করে ফেলা কোন পোষাক-স্বাধীনতার অংশ? যে বাচ্চা নিজের হাতে খাবার খেতে শেখেনি, হাঁটতে শেখেনি, বই হাতে ধরতে শেখেনি সেই বাচ্চা কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে হিজাব পরবে নাকি পরীদের মতো পাখাওয়ালা হালকা ফ্রক পরবে? নাকি বাচ্চার হয়ে হিজাব পরার সিন্ধান্ত মা বাবা বা পরিবারের নিতে পারাকেও আমরা ব্যক্তিগত পোশাক পরার স্বাধীনতা বলব?

উপমহাদেশে অপমানজনকভাবে একটি খোঁচা মারা হয়। ছেলেরা যারা একটু লাজুক, একটু ভীতু, তুলনামূলকভাবে কম অগ্রসর তাদের পরিচিতজনরা ভর্ৎসনা করে বলা হয় ‘তুমি ঘোমটা পরে বাসায় বসে থাকো’। এই কথাটি যারা বলেন তারা ঘোমটা পরে বাসায় বসে থাকা নারীদের অত্যন্ত পরিশীলিত, ভদ্রতার স্কেলে সর্বোচ্চ নাম্বার দিয়ে সকল নারীদের সেই মানদণ্ডে বিচার করলেও ‘ঘোমটা’ বিষয়টি তাদের নিজেদের কাছেই অপমানজনক। যেন নারীদের অপমানিত থাকাই নিয়তি, তাদের টানটান মেরুদণ্ড, ঘোমটাবিহীন সপ্রতিভ ব্যক্তিত্ব থাকতে নেই। টানটান ব্যক্তিত্ব, নির্লিপ্ততা, রক্ষাকবচ, অভিভাবক হবার দায়িত্ব একেশ্বরবাদের মতো এক পুরুষের ওপরই ন্যাস্ত!

বেগম রোকেয়ার লেখা কোন এক প্রবন্ধে পড়েছিলাম ‘আমরা যখন জ্যান্ত লাগেজ, তখন যাহাতে চুরি হইতে না পারি, সেজন্য জাগ্রত প্রহরীর প্রয়োজন’। এরপর তিনি নারীদের প্রশ্ন করেছিলেন, এমন জ্যান্ত লাগেজ হতে কেন নারীদের নিজেকে অপমানিত মনে হয় না?  এই নীরব অবমাননা কেন তারা ভাত ডাল আলুভর্তার মতো নীরবে হজম করে?

পোশাক নিয়ে এমন বিড়ম্বনায় কখনো পুরুষদের পড়তে হয় না বললেই চলে। কি হাফপ্যান্ট, কি খালি গা কারো কিছু যায় আসে না। যত শেকল, যত প্রতিবন্ধকতা, যত ‘না’ সকলি নারীদের জন্য তুলে রাখা; পুরুষদের জন্য দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত কোন বিধিনিষেধ নেই।

পোশাক নিয়ে আর কোন রাজনীতি না হোক। পরিবেশ, পরিস্থিতি আর ইচ্ছেমতো হাফপ্যান্ট, সালোয়ার কামিজ, জিন্স টপ, স্লিভলেস, টপলেস, বোরকা বা হিজাব যার যা খুশি তাই শরীরে জড়াক। তবে তা যেন হয় স্বতস্ফূর্ত, অন্যের চাপাচাপি বা গায়েবি সমাজের সিদ্ধান্তে না হয়। যার শরীর সেই বুঝুক শরীরে কোন পোশাকটা আরাম দেবে।

 

[রোকেয়া সরণি কলামে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব মত]

সারাবাংলা/ এসএস

 

Tags:

পোশাক রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা
পোশাক রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা
পোশাক রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা