মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, ১০ মাঘ, ১৪২৪, ৫ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

Live Score

প্রিমিন্সট্রুয়াল সিনড্রোম- শেষ হোক লজ্জা ও অজ্ঞতার দিন

ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | ৪:৩১ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা

বেশ কিছুদিন হল তিথির সবকিছু অসহ্য লাগছে। ক’দিন হলো তার স্বামী তারিক তাকে বুঝতে পারছেনা একদমই। বিয়ের ছয় মাস হতে চললো, কিন্তু তিথির এই হঠাৎ হঠাৎ বদলে যাওয়ার রহস্য সে বুঝতে পারেনা। মাসের বিশেষ একটা সময়ে এসে সবসময় হাসিখুশি থাকা তিথি একদম নেতিয়ে যায় আর তার মেজাজও খিটিখিটে হয়ে যায়। সাধারন রসিকতাগুলোও যেন নিতে পারেনা। এই গম্ভীর তো এই রুক্ষ তো এই অস্থির। এই সমস্যাগুলো দেখা যায় সাধারণত তিথির মাসিকের আগে এবং মাসিকের পরে সেটা আবার ঠিক হয়ে যায়।

তিথির এই ব্যাপারটা তারিক ঠিক বুঝতে পারেনা। তিথিকে জিজ্ঞাসা করলে সে নিজেও ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারেনা যে এই সময়টাতে তার এতো অস্থির আর অসহ্য কেন লাগে। তিথির মুডের ওঠনামা থেকেও যেটা বড় সমস্যা হয় সেটা হল এই সময়টাতে শারীরিক ব্যাপারগুলোতে তিথি কেমন যেন বেশি সংবেদনশীল হয়ে যায়। স্তন, তলপেট আর উরু ব্যাথাসহ সারা শরীরেই কেমন যেন অস্বস্তিকর ব্যাথা। চিন্তিত তারিক স্ত্রীকে নিয়ে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। লক্ষণ শুনে চিকিৎসক তাদেরকে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবার পরামর্শ দেন।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ তাদের বুঝিয়ে বলেন যে তিথির এই শারীরিক আর মানসিক সমস্যা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার, কমবেশি সব মেয়েই এতে ভোগে। চিকিৎসকের সাথে কথোপকথনে বেড়িয়ে আসে যে এই সমস্যা তিথির বিয়ের আগে থেকেই ছিলো কিন্তু সে তখন এ ব্যাপারে সচেতন ছিল না। মাসিকের আগে পেটে ব্যাথা হয় এটাকে সে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। কিন্তু এই যে অকারণ মন খারাপ হয়, সবকিছু অসহ্য লাগতে থাকে এই ব্যপারটাকে তার নিজের কোন একটা মানসিক সমস্যা ভেবেছিল। বিষয়টা নিয়ে কখনো কোন বন্ধু বা পরিবারের কারো সাথে আলোচনাও করেনি সে।

চিকিৎসক তাদেরকে বিশেষ করে তারিখকে বুঝিয়ে বলে যে তিথি যে সমস্যায় ভুগছে এটাকে প্রিমিন্সট্রুয়াল সিনড্রোম বা মাসিক পূর্ববর্তী উপসর্গ বলে। মাসিক বা পিরয়ডের এক বা দুই সপ্তাহ আগে থেকে অনেক মেয়েই এই সমস্যায় ভুগে থাকে।

শিকদার মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ শেখ জিনাত আরা নাসরিন বলেন, মাসিক পূর্ববর্তী উপসর্গের বেশ কিছু লক্ষণ আছে। যেমন মাথাব্যাথা করা, স্তন ভারী হয়ে যাওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে স্তনে ব্যাথা হওয়া, পায়ে পানি আসা, ক্ষুধামন্দা, বিষন্নতা, তলপেটে হালকা ব্যথা হওয়া, মেজাজ খিটখিটে থাকা, বমি ভাব, গা গোলানো ইত্যাদি

তিনি আরো বলেন, অল্প বয়সী মেয়েদের জন্য ব্যাপারটি খুবই স্বাভাবিক তবে উপরোক্ত লক্ষণগুলো যদি কারো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রকাশ পায় তাহলে সেটি এন্ডমেট্রিডনিস এবং পিআইডির মতো রোগের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে। তার পরামর্শ, এক্ষেত্রে সেই নারীর উচিৎ চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা। প্রয়োজন মনে করলে চিকিৎসক নির্দিষ্ট মাত্রার ওষুধ দেবেন। তবে তিনি সবচাইতে বেশি জোর দেন পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র, স্কুল কলেজ সবজায়গাতেই নারীর এই বিশেষ সময়ে তাঁকে মানসিক সহযোগিতা দেওয়ার উপরে। এই বিশেষ সময়ে নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল না হলে পরবর্তিতে তারা বড়ধরনের মানসিক সমস্যায় পড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

মাসিক পূর্ববর্তী উপসর্গগুলো বা পিএমএস – এর শরীরবৃত্তিক কারণ কি?

আনোয়ার খান মডার্ণ হসপিটালের স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিশেষজ্ঞ ডঃ শারমিন আব্বাসী বলেন মাসিকের আগে মেয়েদের কিছু হরমোনাল পরিবর্তন হয় যেটা খুবই স্বাভাবিক। মাসিকের আগে আগে নারীর শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উচ্চ থাকে আবার মাসিক হওয়ার পরেই সেটা হঠাৎ করে নেমে যায়। হরমোনের এই হঠাৎ পরিবর্তনের জন্য মাসিক চলাকালীন সময়ে মেয়েদের নানাধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাছাড়া কিছু ভিটামিন যেমন ভিটামিন ই, সি, বি১২ এবং ভিটামিন বি এর অভাবও অনেকসময় প্রভাব ফেলে।

তিনি পরামর্শ দেন, পিএমএসের সময়ে যেকোন শারীরিক এবং মানসিক সমস্যায় মেয়েরা যেন পরিবারের সদস্য বিশেষ করে অন্য নারীদের সাথে শেয়ার করে। উপসর্গগুলো অতিরিক্ত হলে, অবশ্যই একজন চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

সারা বিশ্বেই পিএমএস একটি গুরুত্বপুর্ণ শারীরিক সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সী নারীরা সাধারণত এই সমস্যায় ভুগে থাকে। এ সময়ে প্রায় দুইশত ধরনের শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আলোচিত উপসর্গগুলো ছাড়াও হালকা জ্বর, পেট ফাঁপা, মেরুদণ্ডের নীচের অংশের ব্যাথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ব্রণ, পেশী এবং হাড়ের জোড়ে ব্যাথা আর যখন তখন ক্ষিদে পাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায়। সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেবে তা নয়। তবে যেকোন উপসর্গই যদি অতিরিক্ত মাত্রায় দেখা দেয়, তবে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করতে হবে অবশ্যই, যাতে আরো বড় ধরনের কোন সমস্যা না দেখা দেয়।

কিভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা যায়

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এন্টি ডিপ্রেস্যান্ট, হরমোনাল, ভিটামিন বা অন্য ওষুধ দিতে পারেন পিএমএসের চিকিৎসায়। তবে ডঃ শারমিন আব্বাসী জোর দেন নিজের ভালো লাগে এমন কাজ করতে। যেমন, মুভি দেখা, গান শোনা, পছন্দের খাবার খাওয়া, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া, ঘুরে বেড়ানো, শপিং করা বা যাই ভালো লাগুক তাই করা। অনেকসময় এক কাপ কাপুচিনোর চনমনে ঘ্রাণ বা ডার্ক চকলেটের মিঠেকড়া স্বাদ অনেকের মন ভালো করে দেয়। কেউ বা রিকশায় ঘুরতে বা প্রিয় কোন জায়গায় নিরিবিলি সময় কাটাতে পছন্দ করে।

মোটকথা নিজের ভালো লাগার কাজ করলে পিএমএসের অস্বস্তিকর সময় পাড়ি দেয়া কোন ব্যাপারই নয়। আর এই ক্ষেত্রে কাছের মানুষদের সহমর্মী আচরণ খুব বেশি প্রয়োজন। বিষণ্ণতার মুহূর্তগুলোয় অনেকেই অকারণ মেজাজ দেখাতে পারে। আশপাশের মানুষগুলোর একটু ধৈর্যশীল থাকাই তখন মেয়েটির জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরী করে।

নারীরা আজ ঘরে বাইরে কোথাওই কোন কাজে পিছিয়ে নাই। মাসিক এবং মাসিক পূর্ববতী শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও খুবই স্বাভাবিক একটি সমস্যা। এ নিয়ে লজ্জা, সংকোচের কিছু নেই। এটি লুকিয়ে রাখারও কোন কারন নেই। তাই স্কুল, কলেজ, কর্মস্থল, পরিবার সবজায়গাতেই পিএমএস কে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যাপার হিসাবে নিতে হবে এবং নারীর জন্য সহমর্মী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

অলঙ্করণ- আবু হাসান

সারাবাংলা/আরএফ/ এসএস

 

 

Tags: ,