শুক্রবার ২০ জুলাই, ২০১৮, ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যায় ‘রাজনীতি’ পায়নি পুলিশ

জুন ১২, ২০১৮ | ৮:১১ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাছিম আহমেদ সোহেল হত্যাকাণ্ডে কোনও ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে খাবার সরবরাহ নিয়ে দুইদল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

সোহেল হত্যা মামলায় দাখিল করা অভিযোগপত্রে ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে ৫১ জনকে।

মঙ্গলবার (১২ জুন) চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করা হয়েছে। সোমবার অভিযোগপত্রটি নগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থাকার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফ হোসাইন।

আদালত দাখিল করা অভিযোগপত্রটি ‘সিন’ করার পর ধার্য তারিখে গ্রহণযোগ্যতার শুনানির আদেশ দিয়েছেন বলে সারাবাংলাকে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী (বর্তমানে প্রয়াত) এবং সাধারণ সম্পাদক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারীদের মধ্যে কোন্দলের জেরে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন। নাছির অনুসারীদের অভিযোগ ছিল, সোহেল তাদের কর্মী। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বজায় রাখতে মহিউদ্দিনের অনুসারী কর্মীরা তাকে হত্যা করেছে।

তবে তদন্তে মহিউদ্দিন ও নাছির অনুসারীদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কোন বিষয় পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক আরিফ হোসাইন।

অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সে সম্পর্কে এই পুলিশ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে জানান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজমুল হক ও মো.ফয়সালসহ একটি গ্রুপ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবসা করতেন। তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম গ্লোরিয়াস। অফিস নগরীর সুগন্ধা এলাকায়। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ বিভাগের নবীনবরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে এই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ করেছিল।

২০১৬ সালে একই অনুষ্ঠানের সময় তাদের আবারও খাবার সরবরাহের অর্ডার দেওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহেলসহ কয়েকজন ছাত্র মিলে নগরীর কাতালগঞ্জে ভিটাবেন ক্যাফে নামে একটি রেস্টুরেন্ট খুলেছিলেন। সোহেলদের বক্তব্য ছিল, ২০১৫ সালে গ্লোরিয়াসের সরবরাহ খাবারের মান খারাপ ছিল। এজন্য তারা ভিটাবেন থেকে খাবার সরবরাহ করবেন। মূলত এর থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত এবং হত্যাকাণ্ড বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা আরিফ হোসাইন।

সূত্র মতে, অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন- ওয়াহিদুজ্জামান নিশান, জিয়াউল হায়দার চৌধুরী, এসএম গোলাম মোস্তফা, তামিম উল আলম, ইব্রাহিম সোহান, কাজী মো. জয়নাল আবেদীন, সাইফ উদ্দিন, মো. আবু জাহের উজ্জ্বল, সাইকুল ইসলাম তারেক, নুরুল ফয়সাল, মো. সাইফুল ইসলাম সাকিব, আবু ফয়েজ, রাশেদুল হক ইরফান, মো. নাজমুল হক, সোলায়মান বাদশা, আসিফ ও শামীম ওরফে ব্লেড শামীম।

এদের মধ্যে ১৪ জন নিহত সোহেলের বাবার দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। বাকি চারজন তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যুক্ত হয়েছে। তবে এজাহারভুক্ত মূল আসামি আশরাফুল ইসলাম আশরাফ এবং অপর দুজন মো. নিজাম উদ্দিন আবিদ ও সাজ্জাদের বিরুদ্ধে তদেন্ত অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অভিযোগপত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, ভিডিও ফুটেজ দেখে ১৫ জন এবং তদন্তে তিন জনের তথ্য পেয়ে তাদের অভিযোগপত্রভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে যুক্ত হওয়া তিনজন বহিরাগত। এরা হলেন, সোলায়মান বাদশা, আসিফ ও শামীম ওরফে ব্লেড শামীম। বাকি ১৫ জন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আসামিদের মধ্যে ১৫ জন বিভিন্ন সময় এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার কথা বললেও অভিযোগপত্রে বহিরাগত তিনজনই নগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি ওয়াসিম উদ্দিনের অনুসারী। যুবলীগ নেতা ওয়াসিম নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে ওয়াহিদুজ্জামান নিশান, জিয়াউল হায়দার চৌধুরী, এস এম গোলাম মোস্তফা, তামিম উল আলম, রাশেদুল হক ইরফান ও নাজমুল হক প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র ছাত্র ছিলেন।

আসামি ইব্রাহীম সোহান, কাজী জয়নাল আবেদীন, সাইফ উদ্দিন, আবু জাহেদ উজ্জ্বল ও নুরুল ফয়সাল স্যাম এমবি ’র ছাত্র ছিলেন।

বাকিদের মধ্যে আবু ফয়েজ এলএলএম এবং সাইফুল মোহাম্মদ তারেক ও সাইফুল ইসলাম সাকিব এলএলবি’র ছাত্র ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর তাদের সবাইকে বহিস্কার করেছিল প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ নগরীর ওয়াসার মোড়ে বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে বিরোধের জের ধরে নাছিম আহমেদ সোহেলকে একদল শিক্ষার্থীর মারধরের মধ্যে তাদের একজনের ছুরিকাঘাতে নিহত হন।

পরদিন সোহেলের বাবা আবু তাহের তার ছেলেরই এক সময়ের বন্ধু ইব্রাহীম সোহানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন, যাতে অজ্ঞাতনামাদেরও আসামি করা হয়।

সারাবাংলা/আরডি/টিএম

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যায় ‘রাজনীতি’ পায়নি পুলিশ
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যায় ‘রাজনীতি’ পায়নি পুলিশ