মঙ্গলবার ১৯ জুন, ২০১৮, ৫ আষাঢ়, ১৪২৫, ৪ শাওয়াল, ১৪৩৯

প্রিয়াঙ্কার দ্যুতিতে বর্ণোজ্জ্বল এক সংবাদ সম্মেলন

মে ২৫, ২০১৮ | ৩:৪০ অপরাহ্ণ

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর।।

ঢাকা: সাবেক বিশ্বসুন্দরী প্রিয়াঙ্কা। তবে তার রূপের গল্প পুরনো হয়নি কোনোদিনই। তার উপরে পর্দা ধাঁধানো উপস্থিতি, সবসময়ই তাকে রেখেছে আলোচনার কেন্দ্রে। অভিনয় শৈলী এতই নিপুণ যে অটিস্টিক এলোমেলো তরুণী ঝিলমিল চ্যাটার্জীর চরিত্রেও অপরূপা প্রিয়াঙ্কা।

সেই প্রিয়াঙ্কা চোপড়াই ২১ মে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে, রোহিঙ্গা শিশুদের দেখতে। এটাই শিশুদের জন্য প্রিয়াঙ্কার প্রথম সফর নয়। এর আগেও সে গিয়েছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত শিশুদের দেখতে, দুর্ভিক্ষ পীড়িত শিশুদের দেখতে। তার নিজের সংস্থা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ফাউন্ডেশনও কাজ করে শিশুদের জন্য। এখন পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে প্রিয়াঙ্কার এই একক প্রচেষ্টায় চলা সংস্থা। তবে প্রিয়াঙ্কা নিজে মনে করেন, শিশুদের জন্য তার কাজের তুলনায় তার প্রতিষ্ঠানটা নিতান্তই ছোট- ঠিক এভাবেই তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা করেন ২৪ মে ঢাকার লা মেরিডিয়ান হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে।

সাংবাদিক সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। একে রোজার দিন তায় বৃহস্পতিবার, কোন বোকা সাংবাদিক আছে যে ঢাকার জ্যামের কারণে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হারাবে? দুপুর গড়াতেই সবাই উপস্থিত সংবাদ সম্মেলনে। সবাই প্রিয়াঙ্কাকে দেখতে একেবারে কাছ থেকে। উপরন্তু সামনে বসার প্রতিযোগিতা এত বেশি যে যার কাছে যা আছে তাই দিয়ে জায়গা রাখছে।

ঘড়িতে যখন ঠিক সাতটা তেত্রিশ, সাদা জ্যাকেট, সাদামাটা জিন্স আর সাদা উঁচু হিল পরে দীর্ঘদেহী প্রিয়াঙ্কা প্রবেশ করলেন বলরুমে। স্টেজে উঠার আগে সাবলীলভাবে জিজ্ঞেস করলেন, এদিক দিয়ে যাবো? যেন তার জন্মই হয়েছে এদিক দিয়ে যাওয়ার জন্য, জিজ্ঞেস করা তো শুধু একটা এমনি বলার জন্য বলা কথা।

স্টেজে উঠেই কুশল বিনিময় করলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। বাংলায় দুইটা মাত্র কথা জানেন, তোমার নাম কী? আর রসগোল্লা, এও জানালেন। এটাও জানাতে ভুললেন না, রসগোল্লা খুবই জরুরি শব্দ কারণ খাবারই তো জীবনের আসল আনন্দ!

শুরু হলো আলোচনা, সাংবাদিকরা কী প্রশ্ন করবে? প্রিয়াঙ্কাই শুরু করলেন প্রশ্ন, এই হলে থাকা কার কার সন্তান আছে, একটু হাত তুলুন। মাঝামাঝি থেকে নিজেদের মধ্যেই একজন দুষ্টুমি করে বলে উঠলেন, তোমার কয়টা সন্তান আছে? শোনার কথা না শুনলেও এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের হিসেবে। প্রিয়াঙ্কার না। মাইক্রোফোন ছাড়া বলা হলেও প্রশ্নটা তার কানে গেল এবং সে প্রশ্নটা নিলো। সবাইকে থামিয়ে প্রশ্ন কর্তাকে বললেন, “ওহ আপনি জানেন না আমার যে সন্তান নেই? যাক, আমার কোনো সন্তান নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত না। তবে আমি যত বাচ্চার জন্য কাজ করি তারা সবাই আমার সন্তান। তাহলে আপনি বলতে পারেন আমার অনেক সন্তান। অনেকগুলো।”

হলরুম জুড়ে এতক্ষণ যে গুঞ্জন চলছিল, “ইশ খুব লম্বা না, খুব সাধারণ দেখতে তো, একদম নায়িকাদের মতো না…”, নিমিষেই বন্ধ হয়ে গেলো। হলে উপস্থিত সবাই তখন জেনে গিয়েছে শুধু রূপটাই প্রিয়াঙ্কার রূপকথার গল্পটা তৈরি করেনি। শোনার আছে অনেক গল্প।

ক্যামেরার খচ খচ শব্দ ও কিছুতেই ক্লান্ত না হওয়া ফ্ল্যাশের মধ্যে শুরু হলো প্রিয়াঙ্কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমি বাচ্চাদের সঙ্গে অনেক সময় ছিলাম খেলেছি, নেচেছি, ওদের সঙ্গে ক্লাস করেছি। আমি খুব অবাক হয়েছি ওদের আঁকার খাতা দেখে। বাচ্চারা আঁকছিল, আমি একটা শিশু, ছয় কি সাত বছর বয়স, নাম মনসুর আলি। ওর খাতা দেখতে চাইলাম, ওর খাতার শুরুতে একটা ফুটবল মাঠের ছবি। সেখানে অন্য কিছু খেলাই হচ্ছে। গোলা বারুদের মধ্যে কিছু মানুষ পড়ে আছে, হাত পা বিচ্ছিন্ন অন্য কোথাও আঁকা। আমি আস্তে আস্তে পাতা উল্টালাম, শেষ পর্যন্ত এসে দেখলাম মনসুর নদীর ছবি এঁকেছে, সবুজের ছবি এঁকেছে, ফুলের ছবি এঁকেছে, ভালোবাসার ছবি এঁকেছে।

“এগুলোই বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা, রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার পর যে শিশুটি সেই বিভীষিকা তার কল্পনায় বয়ে বেড়াচ্ছিল তা এখন যত্নে অনেকটাই উপশম হয়েছে”, বলেন তিনি।

প্রিয়াঙ্কা আরও বলেন, আমি ওদের উজ্জ্বল চোখগুলো সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের পরিদর্শনে বাংলাদেশ সফর আমার জীবন বদলানোর এক সফর ছিল।

বর্ষায় বাচ্চাগুলোর অবস্থা কী হবে, নিজেদের বাচ্চাদের জন্য কি আমরা এরকম উদাসীন থাকতে পারতাম? পৃথিবীর প্রতিটি শিশুই আমাদের শিশু। কারণ ওদের যদি আমরা ভালোবাসা না দেই, সঠিক পথ না দেখাই তাহলে পৃথিবীতে হানাহানি আরও বাড়বে বই কমবে না। ইতিহাস কি আমাদের তখন ক্ষমা করবে? প্রশ্ন রাখেন প্রিয়াঙ্কা।

প্রিয়াঙ্কা শেষ করতেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমেই ইউনিসেফের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় প্রিয়াঙ্কা শুধু শিশুদের বিষয়ে জবাব দিবেন, এর বাইরে তিনি কোনো বিষয়ে জবাব দিবেন না। কিন্তু সাংবাদিকদের পেশাটাই যে প্রশ্নের, দিন শেষে তাদেরও পাঠকদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন তুললেন, একজন ভারতীয় হিসেবে প্রিয়াঙ্কা কি তার প্রধানমন্ত্রীকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দিবে। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে মৃদু আপত্তি স্বত্বেও প্রশ্নটা নেন প্রিয়াঙ্কা। জবাব দেন, রাজনৈতিক আলাপ করার জন্য আমি খুব ছোট একটা মানুষ। আমি শুধু জানি বাচ্চাগুলোর পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। এরপর স্বভাবসুলভ চপলতার সঙ্গে বলেন, “ যেদিন আমি প্রধানমন্ত্রী হবো, দেখো আমি এদের কী করি।”

একের পর এক আসতে থাকে সাংবাদিকদের গুগলি শট। দক্ষ ব্যাটসম্যানের মতো প্রতি বলেই ছক্কা মারতে থাকেন প্রিয়াঙ্কা। এরপর সারাবাংলার স্পেশাল করেসপন্ডেট এমএকে জিলানী উঠেন। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে প্রশ্ন করেন,
“আচ্ছা প্রিয়াঙ্কা তুমি বাচ্চাদের জন্য এত কাজ করো, আমি তো তোমাকে শিশুদের প্রধানমন্ত্রী বলতে পারি।”

প্রিয়াঙ্কা তো প্রিয়াঙ্কা হল ভর্তি সবাই খুশিতে ডগমগ করে উঠে। কিন্তু প্রশ্নের বাণ তাক করা ছিল অন্য দিক থেকে।

এমএকে জিলানী আবার বলেন, “তাহলে শিশুদের প্রধানমন্ত্রী কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করছে না?”

হলের সাংবাদিক ফেটে পরেন হাসিতে, এমনকি প্রিয়াঙ্কাও। তিনি বুদ্ধির তারিফ করতেও ভুলেন না এই সাংবাদিকের। প্রিয়াঙ্কা জবাব দেন, আজকে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। উনি আমাকে অনেকগুলো বই উপহার দিয়েছেন, উনার বাবাকে নিয়ে লেখা। বইয়ের উপরে একটা কার্ড ছিল, শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

প্রিয়াঙ্কার জবাব ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে পারছে না শ্রোতারা। তারা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে, কীভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এগুবে প্রসঙ্গ। সে সব পথ একদম এড়িয়ে প্রিয়াঙ্কা বলেন, “যেদিন আমার এমন একটা কার্ড হবে, যেখানে লেখা থাকবে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, প্রধানমন্ত্রী, ভারত। সেইদিনই তোমার প্রশ্নের জবাব আমি দিবো।”

এভাবেই প্রাঞ্জল আলোচনায় এগিয়ে যায় সম্মেলন। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন প্রিয়াঙ্কা এখন পর্যন্ত কত শিশুর জন্য কাজ করেছে। প্রিয়াঙ্কা নিজের কাজের বর্ণনা দিয়ে বলেন, তুমি কয়জন শিশুকে সাহায্য করেছ? অপ্রস্তুত সাংবাদিক জবাব দেন, একজন। প্রিয়াঙ্কা বলেন, একজনও অনেক। একদম কাউকে সাহায্য না করার চেয়ে একজন অনেক।

কেউ প্রশ্ন করেন, প্রিয়াঙ্কার কবে সন্তান হচ্ছে, প্রিয়াঙ্কা উল্টো প্রশ্ন করেন, তোমার কি মনে হয় না তুমি তোমার নিজের সন্তানদের জন্য করছ, আমি এইসব বাচ্চাদের জন্য, তাহলে তারা কীভাবে আমার সন্তান না?

এভাবেই লা মেরিডিয়ানে শেষ হয় প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সংবাদ সম্মেলন অথবা বলা যায়, দ্যা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া শো।

অনুষ্ঠান শেষে প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিত্বে দারুন মুগ্ধ সাংবাদিকরা। যারা আগে তার সম্পর্কে জানত না তারাও নতুন করে ভক্ত হয়ে ফেরে।

নিচে নেমেও মুগ্ধতা কাটে না কারও। সবার মুখে মুখে এক কথা, বুদ্ধিমান বটে প্রিয়াঙ্কা!

সারাবাংলা/এমএ/জেএএম

প্রিয়াঙ্কার দ্যুতিতে বর্ণোজ্জ্বল এক সংবাদ সম্মেলন
প্রিয়াঙ্কার দ্যুতিতে বর্ণোজ্জ্বল এক সংবাদ সম্মেলন