শনিবার ১৮ আগস্ট, ২০১৮, ৩ ভাদ্র, ১৪২৫, ৬ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

প্রেম – বসন্তের যুগলবন্দী  

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮ | ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

জান্নাতুল মাওয়া।।

বসন্তের সাথে প্রেমের যোগসাজশটা দীর্ঘদিনের। যখন থেকে ফাল্গুনের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে বাঙালিরা ভালোবাসা দিবস উদযাপন করা শুরু করেছে তারও অনেক অনেক আগে থেকেই। ঠিকভাবে বলতে গেলে বসন্তের সাথে প্রেমের যোগাযোগ বেশ পুরনো; পৌরাণিক!

 

 

গ্রীক পুরাণে প্রেমের দেবতা যেমন কিউপিড তেমনি সনাতন পুরাণের প্রেমের দেবতা হল কামদেব আর এই কামদেবের বৈশিষ্ট্যগুলো হল-কোকিল, পারাবত, বসন্ত ঋতু এবং  মলয় বাতাস! কেন বসন্ত আর মলয় বাতাস কামদেবের বৈশিষ্ট্য তা যদিও ঠিকভাবে বোঝা যায় না। তবে শাহ আব্দুল করিম গেয়েছেন,  “বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে”।এর মানে কি এই যে বসন্তের বাতাসে বন্ধুর বাড়ি থেকে ফুলের গন্ধ ভেসে আসে বলে মন উচাটন করে? অথবা এই বাতাসেই এমন কোন উপাদান রয়েছে যাতে মনে প্রেম ভাব জেগে ওঠে। কোকিলের কুহু ডাকে মন উদাস হয়না এমন বাঙালি কি পাওয়া যাবে? সুতরাং গোটা বসন্ত ঋতুতেই প্রেমের দেবতার স্পর্শ লেগে থাকে; বাতাসে, কোকিলের ডাকে, ফুলের গন্ধে।

 

 

এই অঞ্চলের গীতি-কবিতা-পুরাণ ঘেটে দেখা যায় এখানকার  মানুষ শত শত বছর ধরে বসন্ত আর প্রেমের  যুগলবন্দী রচনা  করে এসেছে। বৈষ্ণব বিশ্বাস মতে, কোন এক ফাল্গুনী পূর্ণিমায় বৃন্দাবনে প্রেমিক কৃষ্ণ প্রেমিকা রাধা ও অন্যান্য গোপীদের সাথে রঙের খেলায় মেতেছিলেন।  এই দিনটিকে মনে করেই বৈষ্ণবরা ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোল উৎসব মানে বসন্ত উৎসব করে আর রঙের খেলায় মেতে উঠে। চতুর্থ শতকের বৈষ্ণব ধারার কবি কালিদাসের নায়িকারা বসন্ত বিলাপে মেতেছিল। ত্রয়োদশ শতকের মিথিলার কবি বিদ্যাপতি যিনি বসন্তকে ঋতুরাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন তাঁর কাব্যের নায়িকাও কোকিলের ডাক আর মলয় বাতাসে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠে।

 

 

চতুর্দশ শতকের কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ জুলেখা কাব্যেও বসন্তে জেগে ওঠা প্রেমানুভূতির বর্ণনা উঠে এসেছে। বসন্তের সাথে ভালোবাসার যোগসূত্র নিয়ে তরুণ কবি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাব্বী আহমেদ জানান, বসন্ত এবং ভালোবাসা দুটোই অনুভবের বিষয়। তাঁর মতে, “পাতা ঝরা শীতের শেষে যেমন বসন্ত এসে শূন্য হয়ে যাওয়া প্রকৃতিকে ফের পরিপূর্ণ করে তোলে ঠিক তেমনি জীবন যখন শুকিয়ে যায়, অবিরল হতাশা আর অনিশ্চয়তা এসে ঘিরে ধরে জীবনকে, তখন ভালোবাসাও হৃদয়-মনে প্রশান্তি আনে।  বসন্ত যেমন প্রকৃতিকে ভরিয়ে তোলে সৌন্দর্যে,  তেমনি ভালোবাসা হৃদয়কে ঋদ্ধ করে”।

 

 

ফাল্গুনের প্রথম দিনে খুব একটা চড়চড়ে গরম পড়েনা। শীত যাই যাই করেও দাওয়ায় বসে একটুখানি জিরোয় আর সেই সুযোগে এই দিনের রোদ মোটামুটি সহনীয় থাকে। আর থাকে ফুলের মেলা। শীতে ফোটা নানান বর্ণের ফুল বসন্তেও সৌরভ বিলায় সমানতালে। আবার বসন্তের আগুনরাঙ্গা পলাশও পয়লা ফাল্গুনের আগেই গাছে গাছে আগুন ছড়িয়ে দেয়!

 

 

বসন্তের যে বাসন্তী রঙ অর্থাৎ কমলা এবং উজ্জ্বল হলুদ- এই রঙগুলো হৃদয়াবেগ এবং কামনার সাথে সম্পৃক্ত।  কমলা  রঙ নৈকট্য ও উষ্ণতার প্রতীক। তাই পয়লা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবের সাথে সাথেই বাঙালি মেতে উঠতে পারে ভালোবাসার উৎসবে!

তবে শখের চিত্রশিল্পী জাকিয়া ইয়াসমিন শাম্মা বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসার উৎসব আলাদাভাবে পালন করতে আগ্রহী। তিনি মনে করেন এ দুটো দিন উদযাপনের মাত্রায় ভিন্নতা আছে। তাঁর মতে, “পয়লা ফাল্গুন সবার মনে রঙ, আনন্দ আর শুদ্ধতা আনার একটা উপলক্ষ।  এদিন প্রকৃতির সাজে সবাইকে সাজিয়ে শুদ্ধতা ছড়িয়ে দেয়া যায় সবার মাঝে। অন্যদিকে ভালোবাসা দিবস শুধুমাত্র প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমকে উদযাপনের দিন। এর মাঝে অন্যদের কোন স্থান নেই”। এদিকে ফ্যাশন হাউজ বিশ্বরঙ এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জানালেন, “বসন্তকে উপলক্ষ্য করেই ক্রেতারা বেশি ভিড় করেন তাঁর ফ্যাশন হাউজে। ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে এখনো সেভাবে কেনাকাটার রেওয়াজ চালু হয়নি”। আর তাই ফ্যাশন হাউজগুলোও বসন্তের বিশেষ কালেকশন বাজারে ইতিমধ্যেই নিয়ে এসেছে। বসন্তের কেনাকাটাকে সামনে রেখে অনেক অনলাইন বিক্রেতা মেলারও আয়োজন করেছেন। সেই তুলনায় ভালোবাসা দিবস উদযাপনের বিষয়টি এখনো রেস্তোরাগুলোর বিশেষ ডিনার অফারেই সীমাবদ্ধ। এই অঞ্চলে ভালোবাসা দিবস এখনো বসন্তের মত সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি।

 

 

রবিঠাকুর  বলে গিয়েছেন, “মধুর বসন্ত এসেছে, মধুর মিলন ঘটাতে”।

তো কবিগুরুর টিপস অনুযায়ী বসন্তের প্রথম দিনে গেরুয়া কিংবা বাসন্তী বসন আর পলাশ ফুলের গয়নায় সেজে যদি কাউকে বলি, ‘ভালোবাসি’; ফিরিয়ে দেয়াটা কিন্তু দারুণ কঠিন হয়ে যাবে! আর ফিরিয়ে দিলই বা! এই গানেই তো আবার কবি লিখেছেন, বসন্ত “পুরান বিরহ হানিছে”।

বসন্তে তো মনে শুধু প্রেম হানা দেয়না, বিরহও উঁকি ঝুঁকি দেয়। এই যে শীতের পোশাকগুলো এখনো তুলে রাখা যাচ্ছেনা, রাত হলেই হিম পড়ে। দুপুরের খাবারের পরে এখনো এককাপ আগুন গরম চা খেতে ইচ্ছা করে। গরম পানিতে চাপাতার সুগন্ধী বুকভরে টানতে গিয়ে হুট করেই কোথা থেকে কোকিল ডেকে ওঠে!

 

 

এইসব ভরদুপুর, কোকিলের ডাক, পলাশ ফুল, গেরুয়া বসন আর চাপাতার সুগন্ধী সব মিলিয়ে জোরে শ্বাস নিতে গেলে বুকের কোন শুকনো ক্ষতে কি তখন টান পড়ে? বসন্তের কোকিলকে তাই ক্কারী আমির উদ্দিন  খুব মিনতি করে বলে গিয়েছেন “কুহু সুরে মনের আগুন আর জ্বালাইয়োনা”। বিরহও তো ভালোবাসার একটা অতি আবশ্যক রুপ! বিরহ ছাড়া ভালোবাসার  ক্ষীর জমবে কী করে? আমিরুদ্দিন তো সেই কোকিলকেই আবার আকুতি করে বলছেন, “কুকিল আমার উপায় বল, প্রাণ বন্ধুয়ার খবর জানলে আমায় নিয়া চল, আমি যার নামে পাগল”।

 

সব মিলিয়ে যুগ যুগ ধরে বসন্ত আর প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এই বাংলায়! কেবল বসন্ত এলেই কোকিল কুহু সুরে ডেকে উঠে। আর তাই প্রেমে বিরহে রঙে রৌদ্রে উজ্জ্বল সার্বজনীন বসন্ত উৎসবই বাঙ্গালির প্রকৃত ভালোবাসার দিন।

 

ছবি- ফারহানা ফারা

মডেল- সাইদা আহামেদ, হাসান তারেক চৌধুরী

 

সারাবাংলা/এসএস

 

 

 

 

Tags: , , ,

প্রেম – বসন্তের যুগলবন্দী  
প্রেম – বসন্তের যুগলবন্দী