রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ফুটবল একাডেমি: টাকা জলে নাকি পরিকল্পনা?

ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯ | ৮:২৭ অপরাহ্ণ

জাহিদ-ই-হাসান, স্পোর্টস করেসপন্ডেন্ট।।
ঢাকা: জোরে-শোরেই চলছে ফুটবল একাডেমির কার্যক্রম। একদিকে ট্যালেন্ট হান্টে দেশজুড়ে ফুটবলারদের বাছাইপর্ব চলছে। অন্যদিকে এগিয়ে যাচ্ছে একাডেমি অবকাঠামো সংস্কার-নির্মাণ কাজও। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকেই বাছাইকৃত যুবাদের নিয়ে আক্ষরিক অর্থে দেশে ‘প্রথমবারের’ মতো কোনও একাডেমিতে ‘দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা’ চলছে।

তবে, প্রশ্ন জেগেছে একাডেমির পরিকল্পনা নিয়ে। একাডেমিতে যে বয়সের ফুটবলারদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয় সেই পথ ছেড়ে যুবদের নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একাডেমি নির্মাণ ও পরিচালনা ভবিষ্যতকে চিন্তা করে আদৌতে কার্যকরী ফল দিবে কিনা সে নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কেননা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৮ বয়সভিত্তিক ফুটবলারদের নিয়ে একাডেমিতে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সে অনুযায়ী দেশব্যাপী ট্যালেন্ট হান্ট কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাফুফে। তবে, এই পর্যায়ের ফুটবলারদের একাডেমিতে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একাডেমির যে ধারণা তাতে ছোট বয়সে অর্থাত ৬-৯ বছরের শিশু ফুটবলারদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই বয়সে ফুটবল কলাকৌশল বা ফুটবল পরিপক্কতা তৈরি হয় একটা ফুটবলারের। এরপর ধীরে ধীরে ১০-১৮ পর্যন্ত ফুটবলাররা বেড়ে উঠে একাডেমিতে। একটা বয়সের পর তারা বিভিন্ন ক্লাবে যোগদান করে তাদের পারফরমেন্সের উপর। দেশকেও নেতৃত্ব দিতে পারে। এমন চিন্তা থেকেই বিশ্বব্যাপী একাডেমির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে, ইউরোপজুড়ে দেশে তাদের ফুটবল সংস্থার পাশাপাশি ক্লাবগুলোরও একাডেমি আছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের চিত্র:
এ দেশের কোনও ক্লাবের সেই অর্থে একাডেমি নেই। বয়সভিত্তিক দল আছে কয়েকটি ক্লাবের। আর এর আগে ঢাক ঢোল পিটিয়ে ২০১১ সালে সিলেট নগরীর উপকণ্ঠে খাদিমনগরে সিলেট বিকেএসপি মাঠে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তত্ত্বাবধানে ৪০ জন ফুটবলারদের নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সিলেট ফুটবল একাডেমি। কিন্তু দায়িত্বশীলদের চরম ব্যর্থতা আর উদাসীনতার কারণেই কয়েকমাসেই ‘সিলেট ফুটবল একাডেমি’র সূর্য অস্ত যায়। আট বছর পর বাফুফের আরেকটি উদ্যোগের ভবিষ্যত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বাফুফের `দ্বিতীয়‘ ফুটবল একাডেমির আদ্যোপান্ত:
রাজধানীর বেরাইদের ফোর্টিজ স্পোর্টস গ্রাউন্ডে গড়ে উঠছে একাডেমি। খেলোয়াড় বাছাই থেকে একাডেমির নকশার কাজটি করবেন বাফুফের টেকনিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ডিরেক্টর পল স্মলি। একাডেমির ক্যাম্পে কোন খেলোয়াড়দের নেয়া হবে তার চিন্তাও স্মলির। কাজী সালাউদ্দিন জানান, ‘কোয়ালিটি প্লেয়ারদের নিয়ে এখানে ক্যাম্প হবে। পুরোটাই দেখবে ট্যাকনিক্যাল টিম। পল স্মলি দেখাশুনা করবেন। এর নকশার দায়িত্বও তার। আমরা শুধু বোঝাপড়ার কাজটা করবো। বিদেশি ১৪-১৫ জন টেকনিশিয়ানের সঙ্গে কাজ করবেন স্থানীয় টেকনিশিয়ানরা।’

একাডেমির অর্থায়নঃ
আপাতত নিজস্ব অর্থায়নে একাডেমি চালুসহ ফুটবল কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চান বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। পরিকল্পনা মোতাবেক দুই একবছর এভাবেই চালাতে চান। এ বিষয়ে তিনি জানান, ‘আমাদের ব্যক্তিগত ফান্ডিং দিয়ে এঁটা চালাবো। এক-দুই বছরের মধ্যে স্পন্সরও চলে আসবে। মেয়েদের জন্য যেভাবে এগিয়ে এসেছে পৃষ্ঠপোষকরা। যদি রানিং করে তাহলে কোনও সমস্যা থাকবে না।’

কারা জায়গা পাচ্ছেন এই একাডেমিতেঃ
ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গেছে আগেই। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকেই কাজ শেষ হবে বলে জানান বাফুফে বস। আবাসিক ক্যাম্প সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ফেব্রুয়ারিতে ফুটবল ক্যাম্প চালু হবে। ট্যাকনিক্যাল কমিটি দ্বারা দেশজুড়ে খেলোয়াড় বাছাই করা হচ্ছে। বাছাইকৃত ৬০ জন ফুটবলারকে একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করা হবে একাডেমিতে।

বাছাইকৃত সব ফুটবলারদের বয়স ১৫-১৮। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগ দেয়া হবে বিদেশি টেকনিশিয়ান। যে বয়সে ফুটবলাররা পেশাদার ফুটবলে প্রবেশ করার সময় সেই বয়সে একাডেমিতে প্রশিক্ষণে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

একটি আদর্শ ফুটবল একাডেমি কেমন হওয়া উচিত?
একটা একাডেমিতে কেমন হওয়া উচিত সেই বিষয়ে জানান উয়েফার ‘এ’ লাইসেন্সপ্রাপ্ত জাতীয় দলের সাবেক কোচ মারুফুল হক, ‘একাডেমি অবশ্যই একেবারে ছোট বয়স থেকে একাডেমিতে ফুটবল শেখানো উচিত। ৮-৯ এর আগে হওয়া দরকার। ফিজিক্যাল স্কিল (শারীরিক দক্ষতা) শেখার গোল্ডেন বয়স হচ্ছে ৯-১২। এরপরে ফিজিক্যাল স্কিল পারমানেন্ট হয়না। এই বয়সের মধ্যে খেলোয়াড়দের ফুটবলের ট্যাকটিক্যাল ও ট্যাকলিক্যাল বিষয়গুলো তাদের শিখতে হয়।’

বাংলাদেশে ক্লাব বা জাতীয় পর্যায়েও কোনও একাডেমির অস্তিত্ব নেই। একাডেমির যে ধারণা সেটাও অনেকের কাছে অস্পষ্ট। ভবিষ্যতে মানের ফুটবলার তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের জায়গা একটি একাডেমি এমনটা বলেন তিনি, ‘আমাদের দেশে একাডেমির ধারণটাই নাই। একাডেমি শুধু যে ফুটবল শেখার জায়গা তাও না। তাদের ইডুকেশন, মেন্টাল স্কিল স্ট্রেন্থ বাড়ানোর বিষয়টা একাডেমি থেকেই আসে। আমাদের দেশে সপ্তাহে তিনদিন প্রাকটিস করানো হয় এটাকেই বলা হয় একাডেমি।’

দেশের সর্বোচ্চ লিগ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু বলেন, ‘বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের ভারত-নেপাল-ভুটানে যারা একাডেমি পরিচালনা করছে তাদের চিত্রই দেখুন। নারী-পুরুষ দুই পর্যায়ের ছোট বয়সের ফুটবলারদের নিয়ে সেখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কোচিং স্টাফরা যারা থাকবেন তারাও উচু মানের হতে হবে। যারা তৃণমূল থেকে ফুটবলারদের নিয়ে আসবে। ১৫-১৬ বয়সের ছেলেদের আপনি কি শেখাবেন? ওরাতো ইয়ুথ লেবেলের। শেখাতে হবে ছোট বয়সে।’

অবকাঠামো যেমন হওয়া উচিত:
একটি আদর্শ ফুটবল একাডেমির অন্তত যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হয় তাহলো- ফুটবলারদের থাকার জন্য আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন বেডরুম। ভিডিওসহ মাল্টিমিডিয়া ভিত্তিক প্রেজেন্টেশন দেয়া যায় এমন সম্মেলন কক্ষ। স্বাস্থ্যকর ডাইনিং সুবিধা (নিউট্রিশন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পরিকল্পনা মোতাবেক খাবারের মেন্যু নির্ধারণ), একটি সম্মেলন কক্ষ (ফুটবলারদের শেখানোর জন্য), একটি জিমনেসিয়াম বা ফিটনেস সেন্টার। অভিসার বা অন্য খেলাধুলার সরঞ্জামিসহ কক্ষ, সুইমিং পুল সুবিধা, একটি প্রশাসনিক ব্লক ও একটি ফ্লাডলাইট সুবিধাপ্রাপ্ত মাঠ।

কি পরিকল্পনা বাফুফের?
সিলেটের পর দ্বিতীয়বার একাডেমি করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। বাফুফে নির্বাচনের ঠিক দেড় বছর আগে এমন উদ্যোগ হাতে নেয়া থেকে শুরু করে একাডেমির অর্থায়ন নিয়ে জানালেন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ, ‘সিলেটে যে সমস্যা ছিল সেটা এবার হবে না। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে এটা চালাবো।’ একাডেমি সাধারণত শিশু বয়সে করা হয় কিন্তু বাফুফে বড়দের নিয়ে কেন? সোহাগ জানান, ‘আপাতত ১৫-১৮ বয়সীদের নিয়ে শুরু করছি। কয়েকবছরের মধ্যে শিশু বয়সেরও শুরু করবো। এবার বন্ধ হবে না আশা করি।’

অনেকের শঙ্কা, সিলেটের মতো অবস্থা হবে না তো এই ফুটবল একাডেমির? শঙ্কাটা অমূলক নয়। পরিকল্পনার দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠাটাও অযৌক্তিক কি? যেখানে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন নিজস্ব বড় একাডেমি আছে বিশের অধিক। মালদ্বীপের আছে পাঁচের অধিক, কয়েকলাখ মানুষের দেশ ভুটান ও নেপালেরও আছে একাধিক একাডেমি সেখানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়াই এ দেশে একাডেমি করা কতটা ফলপ্রসু হবে সেটাই প্রশ্নের বিষয়।

সারাবাংলা/জেএইচ

আরও পড়ুন

আলোর মুখ দেখছে ফুটবল একাডেমি

ফুটবল একাডেমি: টাকা জলে নাকি পরিকল্পনা?
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন