মঙ্গলবার ২২ মে, ২০১৮ , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ৫ রমযান, ১৪৩৯

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ সংযুক্তি

মে ১০, ২০১৮ | ৮:২৪ অপরাহ্ণ

।। সুশান্ত দাস গুপ্ত।।

আমাদের প্রজন্মের বাংলাদেশের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’শ্রেষ্ঠ সংযুক্তি। আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা আর গৌরবগাঁথা দেখেনি। জন্মভূমি বাংলাদেশের মহাকাশের হিস্যা হওয়ার ঘটনাটি গত কয়েকদিন ধরেই সারাদেশে মুখে মুখে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে সবাই লেখালেখি করছে। সবারই জানার আগ্রহ দেশের গৌরবের এই স্যাটেলাইট নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা) সংজ্ঞা অনুযায়ী স্যাটেলাইট হলো এক ধরনের গ্রহ, উপগ্রহ বা কোন মেশিন যা কোনো তারকা, গ্রহ কিংবা উপগ্রহের কক্ষপথ বরাবর পরিক্রম করে। সহজ করে বলতে গেলে আমাদের পৃথিবীও এক ধরনের স্যাটেলাইট যা সূর্যকে (তারকা) এর কক্ষপথ বরাবর পরিক্রম করে।  একইভাবে চাঁদও এক ধরনের স্যাটেলাইট যা পৃথিবীর কক্ষপথে বরাবর পরিক্রম করে।  পৃথিবী ও চাঁদ আসলে প্রাকৃতিক স্যাটেলাইট।

এছাড়াও পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে হাজারো কৃত্রিম স্যাটেলাইট। এই স্যাটেলাইট হলো এক ধরনের মেশিন যা মহাকাশে চালু হয় এবং মহাকাশের অন্য অংশ বা পৃথিবীর কক্ষপথ বরাবর পরিভ্রমণ করতে থাকে। সহজ ভাষায় স্যাটেলাইট হলো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় মহাকাশে উৎক্ষেপিত এক ধরনের উপগ্রহ।

মহাকাশে স্যাটেলাইটগুলো যে ডিম্বাকার পথে ঘুরতে থাকে সেই পথকে বলা হয় অরবিট বা কক্ষপথ। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা অনুসারে এই অরবিটকে তিনভাগে ভাগ করা যায়।  ১. নিম্ন কক্ষপথ, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১ হাজার ২৪০ মাইল বা দুই হাজার কিলোমিটার।  ২. মধ্য কক্ষপথ, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা দুই হাজার কি.মি থেকে ৩৫ হাজার ৭৮৬ কি.মি পর্যন্ত। ৩. উচ্চ কক্ষপথ, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৩৫ হাজার ৭৮৬ কি.মি. থেকে অসীম দূরত্ব পর্যন্ত।

উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথের দূরত্বের উপর নির্ভর করে চার ধরনের হতে পারে।  আর্থ অর্বিটস, সান-সিঙ্ক্রোনাস অর্বিটস, জিও-সিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইটস এবং জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইটস।

ল-আর্থ অর্বিটসগুলো আসলে সামরিক রেখাঙ্কন স্যাটেলাইট যা পৃথিবী ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৬০ কি.মি ওপর থেকে যুদ্ধে ব্যবহৃত ট্যাঙ্ক পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারে। এগুলো খুব দ্রুত পৃথিবীর কক্ষপথে পরিক্রম করে। প্রতি ৯০ মিনিটে এরা পৃথিবী পরিক্রম করতে পারে।

আবহাওয়া উপগ্রহগুলো প্রায়ই সান-সিঙ্ক্রোনাস বা হেলিও-সিনক্রোনাস কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। এরা প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বার পৃথিবী পরিক্রম করে থাকে।

জিও-সিঙ্ক্রোনাস বা ভূ-তাত্ত্বিক উপগ্রহগুলো এমনভাবে কক্ষপথে স্থাপন করা হয় যাতে এদের ঘূর্ণনের সময়কাল সূর্যের কক্ষপথে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে মিলিত হয়। তারা পৃথিবীর কক্ষপথ বরাবর একটি ঘূর্ণন শেষ করতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তারা স্থির স্থানাঙ্কের উপর আটটি প্যাটার্নে পৃথিবীর দিকে অগ্রসর হয়, ধীরে ধীরে চলতে থাকে।

বেশিরভাগ যোগাযোগ উপগ্রহ প্রকৃতপক্ষে জিও-স্টেশনারি উপগ্রহ বা ভূগর্ভস্থ উপগ্রহ। ভূ-তাত্ত্বিক উপগ্রহগুলোর মতো ভূগর্ভস্থ উপগ্রহগুলো ঘূর্ণন সম্পন্ন করার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নেয়। ভূ-তাত্ত্বিক উপগ্রহগুলো সরাসরি নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপর অবস্থিত এবং তাদের পথ পৃথিবীর নিরক্ষীয় সমতলটি অনুসরণ করে। ফলস্বরূপ, ভূতাত্ত্বিক উপগ্রহগুলো দিনে উত্তর বা দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয় না এবং পৃথিবীর ভূ-তাত্ত্বিকের উপরে এক স্থানের স্থায়ীভাবে স্থিরীকৃত অবস্থান রেখে ঘুরে চলে। জিও-সিঙ্ক্রোনাস এবং জিও স্টেশনারি উপগ্রহগুলো সাধারণত গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে  ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত (কেন্দ্র থেকে ৪২ হাজার কিলোমিটার)।

জিও-সিঙ্ক্রোনাস/ জিও-স্ট্যাশনারি স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে এমনভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে যাতে এর গতির বহির্মুখী শক্তি স্যাটেলাইটকে বাইরের দিকে গতি দেয় কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। উভয় শক্তি স্যাটেলাইটকে ভারসাম্য দেয় এবং স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিন করতে থাকে।  যেহেতু মহাকাশে বায়ুর অস্তিত্ব নেই, তাই এটি বাধাহীনভাবে পরিভ্রমণ করে। স্যাটেলাইট বৃত্তাকার পরিভ্রমণ করে না, এর গতিপথ ডিম্বাকার কারণ পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকার।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এক ধরনের জিওস্টেশনারি উপগ্রহ বা ভূগর্ভস্থ উপগ্রহ যা বাংলাদেশের জন্য প্রথম এবং বিশ্বের ৫৭’তম উপগ্রহ। বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ হিসবে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চ প্যাড থেকে স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় (বাংলাদেশ সময় ১১ মে, রাত ৩টা) মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে।

একটি স্পেসএক্স ফ্যালকন-৯ রকেট বাংলাদেশের জন্য ৩.৫ মেট্রিক টন বঙ্গবন্ধু-১ যোগাযোগ উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করবে, যা আমাদের দেশ দ্বারা পরিচালিত প্রথম জিও স্টেশনারি যোগাযোগ উপগ্রহ হয়ে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত হবে। ২০১৫ সালের শেষের দিকে থাইলস অ্যালেনিয়া থেকে এই বঙ্গবন্ধু-১ যোগাযোগ উপগ্রহটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বিডি -১ বাংলাদেশের ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব থেকে ১৪ সি-ব্যান্ড এবং ২৬ কিউ-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডারগুলির মধ্যে একটি প্লে-লোড ব্যবহার করে কাজ করবে যাতে করে বাংলাদেশ তার টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করবে।  এই প্রথমবারের মতো স্পেসএক্স ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ৫ সংস্করণটি চালু করছে। এটি আগের ব্লক ৪ প্রজন্মের একটি আপডেট, টেকসই এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য।

 বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর উৎক্ষেপণ স্থান

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে যেসব সুফল ভোগ করবে বাংলাদেশ

১. স্যাটেলাইটের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সাশ্রয়। এখন দেশে প্রায় ৩০টি স্যাটেলাইট চ্যানেল সম্প্রচারে আছে। এসব চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ জন্য প্রতি মাসে একটি চ্যানেলের ভাড়া বাবদ গুনতে হয় তিন থেকে ছয় হাজার মার্কিন ডলার। সব মিলিয়ে স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বছরে চ্যানেলগুলোর খরচ হয় ২০ লাখ ডলার বা প্রায় ১৭ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে এই স্যাটেলাইট ভাড়া কমবে। আবার দেশের টাকা দেশেই থেকে যাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ট্রানসপন্ডার বা সক্ষমতা অন্য দেশের কাছে ভাড়া দিয়েও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ থাকবে। এই স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রানসপন্ডারের মধ্যে ২০টি ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে বলে সরকার থেকে বলা হচ্ছে। এরইমধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে এই স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার বিক্রির জন্য সরকারের গঠন করা বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি (বিসিএসবি) লিমিটেড কাজ শুরু করেছে।

২. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। স্যাটেলাইটের আরেকটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য হবে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি কিইউ-ব্যান্ড ও ১৪টি সি-ব্যান্ড। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার থেকে ৪০ মেগাহার্টজ হারে তরঙ্গ বরাদ্দ (ফ্রিকোয়েন্সি) সরবরাহ পাওয়া সম্ভব। এ হিসাবে ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো ১ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজ। কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এই ১ হাজার পুরোটা ব্যবহার করা যাবে না। তবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ মেগাহার্টজ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। দেশের ৭৫০ ইউনিয়নে এখন ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটের সংযোগ নেই। ইন্টারনেট বঞ্চিত এমন এলাকার মধ্যে রয়েছে পার্বত্য ও হাওর অঞ্চল। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি সরকার এই খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয় ইন্টারনেট সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

৩. দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই স্যাটেলাইট। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো সম্ভব। ঝড় বা বড় ধরনের দুর্যোগে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতেও কার্যকর হবে এ স্যাটেলাইট। এ ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেক সময় অচল হয়ে পড়ে। তখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে। সুবিধা বঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলি মেডিসিন ও দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।

৪. বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্জন করবে বাংলাদেশ তা হলো বঙ্গবন্ধু-১-এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অভিজাত দেশের ক্লাবে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে।

 

সুশান্ত দাস গুপ্ত, প্রকৌশলী ও রাজনীতিবিদ

সারাবাংলা/ এসবি

 

আরও পড়ুন