বুধবার ১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বর্ধিত বেতন অসামঞ্জস্যপূর্ণ, গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন চ্যালেঞ্জ

সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮ | ৫:৫৬ অপরাহ্ণ

।। এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন গার্মেন্টস মালিকরা। তারা বলছেন, নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দিতে গিয়ে ছোট পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টাকার অঙ্কে মজুরি বাড়লেও শ্রমিকের ‘প্রকৃত মজুরি’ বাড়েনি। প্রজ্ঞাপন জারির আগে সিদ্ধান্ত পুর্নবিবেচনা করা দরকার। তারা মনে করেন, শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি নয় হাজার টাকার কম হওয়া উচিৎ নয়।

পোশাক শ্রমিকদের বেতন ৫১ শতাংশ বাড়িয়ে নূন্যতম মজুরি ৮ হাজার টাকা করার ঘোষণা দেয় সরকার। বৃহস্পতিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, শ্রমিকের মূল বেতন ৪ হাজার ১০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ১ হাজার ৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৬শ’ টাকা, যাতায়ত ৬শ’ টাকা এবং বাকি টাকা খাদ্য ও অন্যান্য খাতে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোতে কাজে যোগ দিয়েই (এন্ট্রি লেভেলে) একজন শ্রমিক আগের তুলনায় ২ হাজার ৭শ’ টাকা বেশি পাবেন।

পোশাক শ্রমিক

বর্তমানে পোশাক শ্রমিকরা নূন্যতম বেতন পান ৫ হাজার ৩শ’ টাকা। এর আগে সর্বশেষ ২০১৩ সালে বেতন বেড়েছিল পোশাক শ্রমিকদের। আর বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। বোর্ড গতকাল (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ৫টি বৈঠক করে। গতকালের বৈঠক শেষে বোর্ড সদস্যরা সচিবালয়ে যান। সেখানেই শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু নতুন মজুরির ঘোষণা দেন।

বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন কিছু কিছু শ্রমিক নেতা এবং শ্রমিক। তবে অধিকাংশ শ্রমিক এবং শ্রমিক সংগঠন বলছে, ‘মন্দের ভালো’ সিদ্ধান্ত। ইতোমধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতিসহ বেশি কিছু শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

টঙ্গীর চেরাগআলীতে বিল্লা ফ্যাশনের অপারেটর মো. শফিক বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বেতন বাড়ানোর কথা বলে আসছি। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে, এতে খানিকটা অগ্রগতি হলো।

গাজীপুরের বাখরবাদ স্টাই লাইনের কোয়ালিটি ইনস্পেকটর মো. শফিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেতন বাড়ানোকে আমরা ভালোভাবে দেখছি। যারা ওয়ার্কার, দেরিতে হলেও তারা তাদের প্রাপ্য পাবে।’

পোশাক শ্রমিক

সরকার সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনগুলো নতুন কাঠামোকে স্বাগত জানালেও প্রত্যাখান করেছে বামপন্থী সংগঠনগুলো। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘নূন্যতম মজুরি ৮ হাজার টাকার সিদ্ধান্তকে আমরা প্রত্যাখান করেছি। মজুরির নতুন এই প্রস্তাব অমানবিক, অন্যায্য এবং প্রতারণামূলক। বর্তমান বাজার বিবেচনায় এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে সরকার মালিকদের পক্ষ নিয়েছে। আমরা ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছি।

মজুরি বোর্ডে থাকা শ্রমিক পক্ষের অস্থায়ী প্রতিনিধি বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘মজুরি বোর্ডে আমরা ১২ হাজার টাকার প্রস্তাব দিলেও মালিক পক্ষ ৭ হাজার টাকার উপরে উঠতে রাজি হয়নি। তা নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই অচলাবস্তা তৈরি হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ৮ হাজার টাকা করায় আমরা তা মেনে নিয়েছি। তবে বেতন আর একটু বেশি হলে আমরা খুশি হতাম।’

সরকারের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছেন মজুরি বোর্ডে থাকা স্থায়ী প্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগপন্থী শ্রমিক নেতা ফজলুল হক মন্টু। সারাবাংলাকে এই শ্রমিক নেতা বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোয় আমরা খুব খুশি। পোশাক শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। মজুরি বোর্ড যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পরেনি, প্রধানমন্ত্রী নতুন বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, এবার মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিহাস হয়েছে। ৫১ শতাংশ মজুরি বেড়েছে। এটা রেকর্ড। আর যারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করে সভা-সমাবেশ করছে, তাদের সঙ্গে কিন্তু শ্রমিক নেই। প্রকৃত শ্রমিকেরা বেতন বাড়ায় খুবই খুশি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন বেতন কাঠামোতে ধনী ও গরিব শ্রেণির বৈষম্য আরও বাড়বে। প্রজ্ঞাপন জারির আগে বিষয়টি আরও বিবেচনা করা দরকার।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, টাকার অঙ্কে মজুরি বাড়লেও পোশাক শ্রমিকদের ‘প্রকৃত মজুরি’ বাড়েনি। ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছরের মূল্যস্ফীতির সমন্বয় করলেই তা ৭ হাজার ৯৯৯ টাকা দাঁড়ায়। ফলে সত্যিকার অর্থে মজুরি আগের মতোই রয়ে গেছে।

শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৯ হাজার টাকার উপরে হওয়া উচিৎ- মন্তব্য করে ড. নাজনীন আরও বলেন, যদি মাথাপিছু আয় বিবেচেনা করে মজুরি বাড়নো হয়, এই সময়ে (২০১৩-১৮) বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩১ শতাংশ। যদি তারা সেটা দেন, তাহলে শ্রমিকদের বেতন হবে ৯ হাজার ৭শ’ টাকা। আবার একটি পরিবারকে যদি দারিদ্র্য সীমার উপরে বাস করতে হয়- যে পরিবারে চারজন সদস্য আছে এবং একজন আয় করেন তাহলে সেই ব্যক্তির নূন্যতম আয় হতে হবে ৯ হাজার টাকা। নতুন মজুরি দেশে ধনী ও গরিবের বৈষম্য আরও বাড়াবে বলে মত দেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সারাবাংলাকে বলেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যদি প্রবৃদ্ধিও বিবেচনা করা হতো, তাহলে এই মজুরি দাঁড়াতো ৯ হাজার ৫শ’ টাকা। ঘোষিত মজুরি নূন্যতম মজুরির মাত্রাগুলোকে পূরণ করছে না। যে মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে তা দিয়ে শ্রমিকদের নূন্যতম প্রয়োজনগুলো মেটানো সম্ভব না। ফলে এখানে সবার স্বাভাবিক প্রত্যাশাও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

নূন্যতম মজুরি ১০ হাজার টাকা করার আহ্বান জানিয়ে সিপিডির এই গবেষক আরও বলেন, যেহেতু এটা এখনো প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে, ভবিষ্যতে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং হবে, পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, বাস্তবায়ন করা হবে ডিসেম্বর মাসে- সুতরাং অতীতের মতো এখানেও সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, সরকারে পক্ষ থেকে সংস্কারের মাধ্যমে এটা যেন নূন্যতম ১০ হাজার টাকা করা হয়।

নতুন মজুরি কাঠামো বস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মন্তব্য করে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে পোশাকের মূল্য দিন দিন কমছে। বেতন বাড়ছে। প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে আমরা বেতন বাড়িয়ে যাচ্ছি। মূল্য না বাড়লে এই টাকা কোথায় থেকে আসবে। এখন তো আমি ভয় পাচ্ছি এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বায়ার, শ্রমিক, সরকার এবং সবাই মিলে যদি এগিয়ে না আসে তাহলে আমাদের এই শিল্প ধরে রাখা কষ্টকর হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার অনেক বেশি বেতন বেড়েছে। বেতন বেড়েছে ২ হাজার ৭শ’ টাকা। ৫১ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি বাড়িয়েছি। তারপরও যারা নানা কথা বলেন তারা বাস্তবতা বিবর্জিত। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আমরা ৮ হাজার টাকা বেতন দিতে সম্মত হয়েছি। যদিও এটা আমাদের জন্য বোঝা- তারপরেও তার (প্রধানমন্ত্রীর) ওপর কথা থাকতে পারে না।

সারাবাংলা/এটি

বর্ধিত বেতন অসামঞ্জস্যপূর্ণ, গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন চ্যালেঞ্জ
বর্ধিত বেতন অসামঞ্জস্যপূর্ণ, গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন চ্যালেঞ্জ
বর্ধিত বেতন অসামঞ্জস্যপূর্ণ, গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন চ্যালেঞ্জ