রবিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং , ১২ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

বাসন্তী রং আর নতুন বইয়ে মুখর হওয়ার দিন

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৯ | ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

।। হাসনাত শাহীন।।

ঢাকা: একুশের স্মৃতিবিজড়িত বাঙালির প্রাণের আবেগ জড়ানো ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অমর একুশের শহিদদের স্মরণে ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই গ্রন্থমেলা হয়ে উঠেছে আপমর বাঙালির প্রাণের বইমেলা। যে মেলার সঙ্গে ২০১৪ সালে যুক্ত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার-চেতনা। যার ফলে বাঙালির সাংস্কৃতিক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে উত্তরোত্তর শাণিত ও সমৃদ্ধি করে আসা এবারের এ প্রাণের মেলা অতিবাহিত করলো তার ১২তম দিন।

মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় গ্রন্থমেলার নীতিমালা অনুসারে মেলার প্রবেশ পথ খুলে দিলে শুরু হয় মেলার এ ১২তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা। শুরুতেই মেলার প্রবেশ পথে হালকা জটলা থাকলেও তা মেলা জমিয়ে তোলার মতো ছিল না। যে কারণে প্রাণের মেলার প্রথম ঘণ্টাও কেটেছে প্রাণহীন। মেলার সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিকেলের দিকে বাড়তে থাকে বইপ্রেমী আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণীত আগমন। যে ভিড় রাত ৯টা পর্যন্ত সময়সীমা’র এ দিনের মেলায় বয়ে আনতে পারেনি অন্যান্য দিনের মতো প্রাণ-উচ্ছ্বাস। অন্যান্য যে কোন বারের বইমেলার চেয়ে এবারের অনেক সু-শৃঙ্খল, বিস্তৃত পরিসরে নান্দনিক স্টল-প্যাভিলিয়ন বিন্যাসের এদিনের মেলা ছিল নিষ্প্রাণ-নিষ্প্রভ। বই বিকিকিনিও আশাহত করার মতো।

আশাহত করার এমন দিন সম্পর্কে জানতে চাইলে মেলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশকরা শোনাচ্ছেন আশার কথা। তারা বলছেন-সম্মুখে; বাসন্তী রঙ আর নতুন বইয়ে মুখর হওয়ার দিন। রাত পোহালেই কাল পহেলা ফাল্গুন। বসন্তের প্রথম দিন। যে দিনের জন্য আমরা অপেক্ষা আছি। কেননা, বসন্ত বরণের এই দিনে বাসন্তি রঙে সেজে ঘর থেকে আপমর বাঙালি। আর, বইমেলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই তাদের অধিকাংশই চলে আসবে বইমেলা’র কিনারায়। মেলার দ্বার খুললেই মেলাপ্রাঙ্গণে উপচে পড়বে ভিড়।

হ্যাঁ, তাই তো। আজকের রাত পোহালেই তো বুধবার; শুরু হবে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ছয়ঋতুর শেষ ঋতু ঋতুর রাজা ‘বসন্ত’। অর্থাৎ ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত; সব বাঙালি আর তরুণ-তরুণীদের প্রাণের ১লা ফাল্গুন। যার সঙ্গে শুরু হবে এবারের মেলার ১৩তম দিন।

বিজ্ঞাপন

‘বসন্ত’-ভালোবাসা প্রকাশের অন্যন্য এক ঋতু। ক’দিন ধরেই বাতাসে ভাসছিল তার আগমনী বার্তা। বৃক্ষের ধূসর বর্ণহীন পাতা ঝরে পড়ছে। গাছের শাখা ঢেকে যাচ্ছে কচি নতুন পাতায়। যা জানিয়ে দিচ্ছে বছর ঘুরে ফের চলে এলো শিমুল-পলাশ ফোটার মাস। যে মাস সবকিছু নতুন করে, নতুন উদ্যমে শুরু করার মাস। তার ছোঁয়া শুধু প্রকৃতিতেই নয়; মানুষের পোশাক-আশাকেও হবে দৃশ্যমান।

বিগত কয়েক দিন ধরেই বইমেলায় বাসন্তী রঙের পোশাক আর মাথায় ফুলের টোপর পরে আসছেন তরুণীরা, পুরুষদের বসনেও ছিল ফাগুনের ছোঁয়া। আর এসব নানা কারণে বুধবার মেলাপ্রাঙ্গণ এবং বইমেলাকে ঘিরে থাকা বাসন্তী সাজে তরুণ-তরুণীদের চপল উপস্থিতি যেমন বাড়বে; বাড়বে, দখিনা বাতাস গায়ে মেখে প্রকাশনায়-প্রকাশনায় বই কেনার আনন্দ-ধুম।

বুধবার সকাল ৭টায় চারুকলার বকুলতলায় বসন্ত উৎসবের মধ্য দিয়ে শুরু হবে রাজধানীর সকাল। সেখানে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি মিলিত হবে নানাবয়সী মানুষ। রঙের আলপনায় ভরে যাবে শাহবাগ থেকে চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর। সেখান থেকেই সকলে প্রিয়জনের হাত ধরে মেলায় ছুটে আসবেন। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন কত হাজার বই! যে কারণে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় পহেলা ফাল্গুনে-সকল বয়সী বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের জন্য গ্রন্থমেলার প্রবেশদ্বার খুলবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা পর্যন্ত। যেমনটি হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভালোবাসা দিবসের দিনেও। এ দুইদিনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন প্রকাশকরা। তারা বলছেন, বসন্তের প্রথম দিন আর ভালোবাসার দিন-দু’দিনেই প্রচুর পাঠক আসেন মেলায়। বসন্তের বাসন্তী রং আর নতুন বইয়ের বর্ণিলআভায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ; সেটির সঙ্গে বিক্রিও মন্দ হয় না। সব মিলিয়ে ফাগুণের ছোঁয়া লাগার প্রত্যাশায় মঙ্গলবার রাত নয়টায় নিজেদের স্টল ও প্যাভিলিয়নের ঝাঁপি বন্ধ করেছেন প্রকাশকরা।

প্রকাশকরা জানিয়েছেন, পহেলা ফাল্গুনের এই দিনে যেমন দর্শনার্থী আসবেন তেমনি আসবেন বইপাগল মানুষও। মেলাকেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি শেষে সবাই নিজের জন্য নিয়ে নেবেন প্রিয় লেখকের পছন্দের বইটি। এ ছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার হচ্ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই শুধু নিজের জন্যই নয়, অনেকেই প্রিয় লেখকের বইটি কিনে দেবেন একান্ত প্রিয়জন, প্রিয় বন্ধু কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের হাতে।

অপরদিকে, প্রকাশকদের মতোই আশা করছে গ্রন্থমেলায় আয়োজক, মেলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন শৃঙ্খলাবাহিনী। তারা বলছে-কাল মেলা প্রাঙ্গণের পাশাপাশি এর আশেপাশে ব্যাপক ভিড় হবে। এ জন্যে মেলার স্বার্থে এবং মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কাল আমাদের সবরকম প্রস্তুতিও আছে। উল্লেখ্য এবারের টানা বেশ কয়েক বছরের মতো মেলার নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের টিম।

মঙ্গলবারের মেলার নতুন বই: সোমবার এবারের ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র ১১তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৪৯টি। এর মধ্যে গল্প গ্রন্থ ২৭টি, উপন্যাস ২৫টি, প্রবন্ধ ৬টি, কবিতা ৪৪টি, গবেষণা বিষয়ক গ্রন্থ ২টি, ছড়া ৪টি, শিশুসাহিত্য ১টি, জীবনী গ্রন্থ ৪টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ৪টি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই ৬টি, ভ্রমণ বিষয়ক বই ৫টি, ইতিহাস বিষয়ক বই ১টি, রাজনীতি বিষয়ক বই ৪টি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বই ১টি, অনুবাদ গ্রন্থ ১টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য বিষয়ে বই এসেছে ১৩টি। এর মধ্যে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়েছে আসিফুর রহমানের শিশুতোষ গ্রন্থ ‘তুফান রাজ্য ছাড়া’, উৎস প্রকাশন থেকে এসেছে আলিফ উদ্দিনের কবিতার বই ‘ছায়াবৃক্ষ’, প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য এনেছে অতনু চক্রবর্ত্তী’র বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘মেঘে ঢাকা তারা বিস্মৃতির মেঘে ডেকে যাওয়া বাঙ্গালি বিজ্ঞানী’, অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে আনিসুল হকে গল্পগ্রন্থ ‘গল্প সমগ্র’, রোদেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে বাদশাাহ্ সৈকাতের উপন্যাস ‘পলায়ন’, কথাপ্রকাশ এনেছে শাহাবুদ্দীন নাগরী’র নিবন্ধগ্রন্থ ‘নোট বুকের গদ্য’, আদর্শ প্রকাশ করেছে সঞ্জয় মুখার্জী’র বিজ্ঞান বিষয়ক বই ‘গল্পে গল্পে অনুজীব আবিষ্কার’ এবং প্রকাশনা সংস্থা ম্যাগনাম ওপাস থেকে প্রকাশিত হয়েছে অনন্যা রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘একদিন আমি কোথাও নেই’।

মেলার মূঞ্চের আয়োজন: এদিনের গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘কবি-অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হাসান হাফিজ। আলোচনায় অংশ নেন-শফিউল আলম, রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং মোহাম্মদ আবদুল হাই। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ।

প্রাবন্ধিক বলেন, মনস্বী, বহুমাত্রিক একজন লেখক ছিলেন মনিরউদ্দীন ইউসুফ। সাধারণ কোনো লেখক নন, সাধকই বলতে পারি তাকে। আমৃত্যু ব্রতী ছিলেন জ্ঞান ও সাহিত্য সাধনায়। সুদীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সৃজনকর্মে গভীর অভিনিবেশ, নিষ্ঠা ও মৌলিকত্বের পরিচয় রেখে গেছেন। বর্তমানকালে আমাদের দেশে তার মতো এরকম নিবেদিতপ্রাণ, অনুকরণীয় সাহিত্য ব্যক্তিত্বের বড্ড অভাব।

সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বলেন, মনিরউদ্দীন ইউসুফ একজন বিস্মৃত মনীষা। বাংলা একাডেমি তার অনুবাদে ছয় খ-ে শাহনামা প্রকাশ করছে যা দেশে ও বিদেশে বিপুলভাবে আদৃত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে তাকে নিয়ে এ স্মরণ-আয়োজন মূলত তার অসামান্য কৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শন।

আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি জাহিদুল হক এবং জাহিদ হায়দার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন নাজমুল আহসান এবং জিনিয়া ফেরদৌস। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, বিশ্বজিৎ রায়, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা, রাজিয়া সুলতানা, নাজমুল আহসান তুহিন, উম্মে রুমা ট্রফি এবং সঞ্জয় কুমার দাস। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন গৌতম মজুমদার (তবলা), ইফতেখার হোসেন সোহেল (কী-বোর্ড), রিচার্ড কিশোর (গীটার) এবং বিশ্বজিৎ সেন (মন্দিরা)।
লেখক বলছি…’ মঞ্চের আয়োজন : মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘লেখক বলছি…’ মঞ্চে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন-আখতারুজ্জামান আজাদ, মোহিত কামাল, বেগম আকতার কামাল, হামিম কামাল এবং নাসরিন সিমি।

গ্রন্থমেলার বুধবারের অনুষ্ঠান: আজ ১ ফাল্গুন গ্রন্থমেলার ১৩তম দিন। এদিনের বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘কবি রফিক আজাদ : শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এবং সন্ধ্যায় একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সারাবাংলা/একে

Tags: , ,

বাসন্তী রং আর নতুন বইয়ে মুখর হওয়ার দিন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন