শুক্রবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৬ আশ্বিন, ১৪২৫, ৯ মুহররম, ১৪৪০

বাড়ি পাচ্ছে পথের ‘সেই’ পরিবার

জুলাই ১১, ২০১৮ | ১০:৩৩ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: অবশেষে পথের ধারের সেই পরিবারটি পাচ্ছে ঘর। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন ঘরহারা পরিবারটির দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদেরকে কুড়িগ্রামের নিজ গ্রামে পুর্নবাসন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত দুই দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। ছবিতে দেখা যায়, রাস্তার ওপর অচেতন হয়ে পড়ে আছেন এক নারী। বোতল দিয়ে একটি শিশু তার মাথায় পানি ঢালছে। পাশেই বসে সেদিকে তাকিয়ে আছে আরেক শিশু।

ছবিটি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন পারবেস হাসান নামে এক তরুণ। যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের মতোই গত শনিবার মাগরিবের নামাযের আগে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখতে পাই রাস্তার পাশে বেহুঁশ হয়ে পরে আছেন মা ফরিদা বেগম। তার মাথায় পানি দিচ্ছে একটি শিশু, পাশেই বসা আরেকটি শিশু।’

এ দৃশ্য দেখে পারবেস এগিয়ে যান, খাবার এবং ওষুধ কিনে দেন ফরিদা বেগমকে। পরদিন তাকে চিকিৎসকও দেখানো হয় পাশের একটি হাসপাতালে। কিছুটা সুস্থ হয়ে ফরিদা বেগম ফিরে যান কলাবাগান ব্রিজের নিচে তাদের পলিথিনের ঘরে।

গতকাল ১০ জুলাই কলাবাগান ব্রিজের নিচে গিয়ে দেখা যায়, পলিথিন দিয়ে করা ঝুপড়ি ঘরে বসে রয়েছেন অসুস্থ ফরিদা। পাশেই ঘুমাচ্ছে তার সাড়ে তিন বছরের সন্তান ফরিদুল। কথা হয় পরিবারটির সঙ্গে। জানালেন, তিনবছর প্যারালাইসিসে ভুগেছেন ফরিদা। হাত-পায়ে জোর না থাকায় গৃহকর্মীর কাজ করার ক্ষমতাও নেই। স্বামী আনসার আলী হার্টের রোগী। দুই বছর আগে নদী ভাঙ্গার কারণে কুড়িগ্রামের বাড়ি ঘর ছাড়তে হয়েছে, থাকার জায়গা নেই। তাই ঢাকায় এসে কলাবাগান ব্রিজের নিচে এই পলিথিন দিয়ে ঘর বানিয়ে সংসার পেতেছেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ থাকাতে কখনও ফুল বিক্রি করে, আবার কখনও বা রাস্তায় বসে হাত পেতে সংসার চলছে তাদের।

আনসার আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘নদী তো বাড়িঘর সব নিয়ে গেল তার পেটে। নিজের জমিতে চাষ করে কোনরকমে একবেলা খাওয়া জুটতো। গ্রামের ভেতরের দিকে জায়গা কিনবার গেলি তো পয়সা দরকার। একটু জমি কিনতে গেল লাখ টাকার দরকার, কিনি কি দিয়ে। তাই ঢাকায় এসি এই রাস্তার ওপর থাকি। রান্না-বান্নার কোনও ব্যবস্থা নেই, চাইয়ে-চিন্তে খাইতাম।’

আনসার আলী বলেন, ‘কলাবাগান ক্লাবে কিছু কাজ করতাম, সেই কাজ বন্ধ থাকায় এখন মানুষের কাছে হাত পেতেই খেতে হয়।’ কিন্তু এভাবে পলিথিন দিয়ে ঘর বানিয়ে কিভাবে থাকেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শীত-বৃষ্টি কইয়া তো লাভ নাই। নানান মাইনষ্যে নানান কতা কয়। রাত জাগি-বইসা থাকি। একজন ঘুমাই আরেকজন বসি থাকি, বৃষ্টির সময়ে পানির ভেতরে বসি থাকি।’

সেদিন কী হয়েছিল জানতে চাইলে ফরিদা বেগম বলেন, ‘সেদিন ঘরে কোনও খাবারও ছিল না। ক্লাব থেকে যা খাবার দিছিলো, তাতে ছাওয়াল দুইটার খানাও হয় না। রাস্তায় না বসলি খাবু কী? তাই গিয়ে বসি ছিলাম। দশজনে দেখলি পাঁচজনি তো দিবে। কিন্তু তার আগে থেকেই জ্বর ছিল খুব, সেদিন আর রাস্তায় বসি থাকতি পারিনি, মাতায় ঘুইল্যা দিতিছিলো। তারপর গা কাপিয়ে জ্বর এসি গেল। পুলাপান সোবহানবাগ মসজিদ থিকি বোতল ভরি পানি এনি মাতায় দিছে। ‘মা তুই উঠেক মা, মা তুই সুস্থ হয়ি যা’, কেবল এই কতাগুলি শুনিছি।

‘কোনও রকমি টলতে টলতে এখানে আইছি, এরপরে আর কিছু মনি নিই আমার। তবে ওষুধ খাওয়ার পরি এখন কিছুটা সুস্থ হইছি। ফরিদা জানালেন, তার সঙ্গে থাকা দুই সন্তানের একজন সাড়ে তিন বছরের ফরিদুল। আরেকজন ১১ বছরের আকলিমা। তবে আকলিমা প্রতিবন্ধী। ফরিদার ভাষায়,‘পতিবন্দি, বাড়ে না’।

পারবেস হাসান বলেন, ‘গতকাল রাতে জেলা প্রসাশক সুলতানা পারভীনের সঙ্গে ফোনে আমার অনেকক্ষণ কথা হয়। তাকে আমি পরিবারটির সব ধরনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। তাদের জন্য কুড়িগ্রামে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা, সন্তানদের লেখাপড়া এবং তাদের কাজের একটি ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলি। তিনি সব শুনে আজ সকাল দশটার দিকে কলাবাগান ব্রিজের নিচে এসে ফরিদার পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করেন।’

এসময় তিনি সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। আগামীকাল সকালেই ফরিদা পরিবার নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাবেন তার নিজ গ্রামে।

পারবেস বলেন, ‘জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের মতো সবাই যদি এভাবে মানবিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতো, তাহলে এসব দরিদ্র পরিবারগুলো বেঁচে থাকতো পারতো। আমি জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম তার এ মানবিকতার জন্য। বাংলাদেশের অর্ধেক তরুণও যদি এমন সব কাজে এগিয়ে আসে তাহলে অনেক অসহায়, দুঃস্থ পরিবার উপকৃত হবে। এভাবে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতা।’

সারাবাংলা/জেএ/এমও

বাড়ি পাচ্ছে পথের ‘সেই’ পরিবার
বাড়ি পাচ্ছে পথের ‘সেই’ পরিবার