শুক্রবার ২০ এপ্রিল, ২০১৮ , ৭ বৈশাখ, ১৪২৫, ৩ শাবান, ১৪৩৯

বায়তুল্লাহ্ কাদেরীর কবিতা: মিথ-দার্শনিকতা ও প্রযুক্তির সম্মিলন

নভেম্বর ২৭, ২০১৭ | ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

ইকবাল জাফর

সত্তরের দশকের বাংলা কবিতার খরা কাটিয়ে আশা জাগানিয়া নানা নিরীক্ষায় আশিতে এল একঝাঁক মুখ। তবে তাদের ওই যাত্রায় কেউ কেউ উত্তীর্ণ হতে পারলেন, কেউ কেউ না। যারা পারলেন না তাদের না পারার পেছনে ছিলÑ অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা, চমকের পিছে নিবিষ্টতাকে কোরবানি, দার্শনিকতার অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্রের অনুপস্থিতি এবং আত্ম-অতিক্রমের কঠিনতর পরীক্ষায় এগিয়ে না যেতে পারা। ফলে সেই একঝাঁকের কোনো কোনো মুখ ক্রমশ ম্লান হয়ে ওঠে।

অবশ্য আশি’র ওই সম্ভাবনায় সবাই প্রস্ফুটিত হতে না পারলেও, সেই ধারাবাহিকতা ম্লান হয়নি;  হারিয়ে যায়নি। কারণ,  নব্বইয়ে মূলত তা পরিণত ও বিকশিত হল। অর্থাৎ, নব্বইয়ের কবিদের শিকড় সন্ধানী অনুভবের মর্মমূলে সচেতন অবগাহন  আর বহুপ্রান্তময় যাত্রায় উজ্জ্বলতরভাবে উম্মোাচিত হল ওই আলোর দ্বার। ফলে নব্বইয়ের দশকে-ঘোড়াতে সওয়ার হতে দেখা গেল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলোকিত-মুখ। এই ধারায় চেতনার অদৃশ্য সূক্ষ্ম-সূতাই আত্মভাব সত্ত্বেও যারা এ দশকে ভাব-ভাষা ও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্রস্বর হয়ে উঠলেন, হয়ে উঠলেন বাংলা কাব্য সরোবরের দৃষ্টিগ্রাহ্য ফুল─বায়তুল্লাহ্ কাদেরী তাদের অন্যতম। লোকজ ভাষার সঙ্গে ধ্রুপদীর, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, লোকধর্মের সঙ্গে অস্তিত্বমান কালিক-ভাবনার আর মিথ ও দার্শনিকতার সঙ্গে প্রযুক্তি-বিজ্ঞানের সম্মিলনের নিবিষ্ট সাধনায় তিনি হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র, হয়ে উঠেছেন সুদূরের শিকড়ের রস ও বর্তমানের আলো-বাতাসে বিকশিত বৃক্ষ।

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য-তেই তিনি তার বোধ ও সৃষ্টিশীলতায় আলাদা হতে চেয়েছেন।  এ কাব্যগ্রন্থে তিনি অন্ত্যজ ও ধ্রুপদী জীবনকে একটি দার্শনিক ভীতের উপর দাঁড় করাতে চেয়েছেন, হয়েছেন এ দুটির সমন্বয়ে সচেষ্ট। ফলে এ গ্রন্থে প্রাকৃত স্তরের বাংলা ভাষার সঙ্গে ‘প্রচল ভাষা’র (চর্চিত?) পাশাপাশি অবস্থান চোখে পড়ে─

১.  “শুক পাখিরে বইলা দিবা

মহাবিজ্ঞ শুক

বনের মাঝে দেখবা ফিরে

বউলালটুকটুক”

[পাতা, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

২. “এখন নতুন আর কীবা কহিবাম,

সুন্দরসুগন্ধভাষে জাল ফেলে

শব্দখোর মোটকুরি শাদাপেটে আজীবন কেন্দ্রমুখী,

একটি হিন্তাল লাঠি এমন উদ্যত, নগ্ন, কীবা কহিবাম,”

[ তোমারে কহন্ত কত, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

৩. “এ কোন শহরে এসে থেমে গেলে কাউট্টাসহ, এ কোন্ শহর?

কন্ডে যাইয়ুম আঁই অবেলায়! কন্ডে যাইয়ুম?”

[দেহরজ্জু, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

৪. “ চেইত্যা গেলে মন বড়ো হাসে

বিলাই ফুডানি দেখায় ড্রেসিং রুমে আয়নায়,

আর মানুষের দরকষাকষি শেষে

এক পয়সার মন দুই পয়সায় মন রেখে জ্বলে, শুধু

রাতার চোখের মত লাল লাল গাড়ি চলে যায়।”

[গাড়ি, রেলগাড়ি-সন্ধ্যা, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

শীতাভ সনেটগুচ্ছ-এর তেরটি সনেটে বায়তুল্লাহ্্ কাদেরী শীতকে এখানে ঋতু হিসেবে নয়─আরও বিস্তৃত পটভূমিতে উপস্থাপন করেছেন। এখানে শীত কখনো সক্রেটিস বা বাল্মিকী, কখনো বাঁচবার মন্ত্র, কখনো তরুণ বাঙালি, কখনো গায়েবী শিক্ষক, কখনো পিতাহীন জাতির মত…। যেমন─

“ কেউ তো বোঝেনি তাকে। বলেছে সবাই, পিতাহীন

জাতির মত শীত, রক্তশূন্য দেয়ালে পড়েছে

তার স্মৃতি, ভাসমান লাশের মতন চিরদিন

সে বেহুলা-লখিন্দর সেজে, হায়, বৃথাই সরেছে

ঘাট থেকে ঘাটে, আসলে জানেনি কিছু এ রঙিন

বৃদ্ধ, ঘরশুদ্ধ পরিজন নিয়ে নিবিড়ে মরেছে। ”

[শীত: সাত, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

আর এ শীত যে ‘বড়ো হতোচ্ছাড়া’। তাই কবিকে নিয়তই নিজের সীমা আবিষ্কার করা লাগে─

“নিজেকে জানতে গিয়ে শীত এরকম তালগোল

পাকাবে জানলে আমি আর কোনোদিন দিই তাকে

বেপরোয়া হতে? দিই জীবনের সবুজ পাতাকে

এমন হলুদ করে দিতে?”

[শীত: সাত, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

তবু শীত এলে─

“কাগজ-কলম-বইপত্র, ছাইদানি, আলপিন,

আমার দখলে নেই, ভুলে গেছি প্রেয়সীর তিল

কোথায় কীভাবে ছিল; এখন এসেছে শীত ঘরে,

এখন মুগ্ধতা শুধু স্বপ্নবৎ নেচে যাবে, …”

[শীত: এক, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

কিন্তু থেমে থাকে না বৈষম্যের দাবা খেলা, ঘুঁটি চাল! ফলে প্রত্যয় সঞ্চিত হয়─

“ …                                 স্নায়ুঝড়ে

আমাদের স্মৃতিগুলি উড়ে যায়, রক্তাক্ত থিসিস

ভিজে যায় সময়ের নরম শিশিরে, তবু আজ

ম্যাচের কাঠিতে গুরু জ্বেলে দেবো তোমার মেজাজ।”

[শীত: ছয়, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

বায়তুল্লাহ্ তার কবিতায় বাঙালি সমাজ ও কালচেতনাকে লোকজ ফর্মে উপস্থাপনে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। দেহরজ্জু-তে দেখি ‘বিষম কুঁজো এক কালো’ কাউট্টা (কচ্ছপ) উঠে আসছে সর্বব্যাপী, প্রয়াসী হচ্ছে চৈতন্যকে গ্রাস করতে। আবার এ শ্রেণীবিভাজিত সমাজ-জীবনে চর্যার দুলিই (কচ্ছপ) যেন দেখি─

“ কাউট্টা দেখি

ধীরে ধীরে ধীরে চলছেই ধীরে

বাড়ির ভিতর থেকে বাড়ির

বাহিরে, আজীবন এক

কাউট্টা ধীর পদার্পণে চলেছে,

চলেছে বিষম কুঁজো এক কালো

কাউট্টা,

খাতার মলাটে ওঠে কাউট্টা

অবশেষে বইয়ের তাকে

কিংবা কখনো

একদল মেঘ পিঠে বয়ে নেয়

বুড়ো কাউট্টা, দেয় না তেমন

দুগ্ধ, দেয় না। কাউট্টার দুগ্ধে

ভরে না পাতিল।

 

এ কোন শহরে এসে থেমে গেলে কাউট্টাসহ, এ কোন্ শহর?”

[দেহরজ্জু, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

লক্ষ্যযোগ্য, কাউট্টার ধীর লয়ে যাওয়ার মাঝে হঠাৎ ‘এ কোন শহরে’র উল্লেখ এবং ডায়ালেক্টই বলছে─এটি বায়জীদ বোস্তামীর কচ্ছপের শহর, এটি চট্টগ্রাম। অর্থাৎ  চট্টগ্রামের বা বায়জীদ বোস্তামীর নাম উল্লেখ না করেও কচ্ছপের ঐতিহ্যের ইঙ্গিতে আমাদের ধর্মবোধ ও লোকবিশ্বাসের সূত্রমুখে কবি যথার্থই টোকা দেন। ফলে সমগ্র কবিতায় একটি দর্শনলব্ধ চেতনার প্রকাশে ‘কাউট্টা’ প্রতীকটি হয়ে ওঠে অভিনব।

বায়তুল্লাহ্ কাদেরীর কবিতায় লোকজীবন-লোকমিথের ব্যবহার পরিলক্ষিত। তার কবিতায় একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম মিথের সমন্বয় ঘটে এভাবে─

“এমনই বর্ষার তীর বিদ্ধ করে রাধিকা রঙের

আমার এ প্রিয় দুলদুল, কষ্টার্জিত নদী ঝরে

বিবশ আঙুলে, কোথা গো রঙিন কৃষ্ণ, চরাচরে

বুঝি তুমি ইস্্রাফিল, আমার বুকের কিয়ামত

ওঠাও বাঁশিতে? যেদিন বাতাসে শুধু মো’রমের

চাঁদ, জানবে আমার বাড়িতে সেদিন জিয়াফত।”

[বর্ষা: সাত, শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য]

 

মিথ, পুরাণ-উপনিষদ, লোকগাঁথা আর অন্ত্যজ জীবনের সঙ্গে ধ্রুপদী জীবন ও বর্তমান সময়কে সমন্বয় হিসাবে আসে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আর কবি প্রথম কাব্যগ্রন্থে যে মানব অস্তিত্বের টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করেছেন তারই মীমাংসা হয়ে এল যেন ত্রিণাচিকেতের নাচ কাব্যগ্রন্থ। কবি এ গ্রন্থের মাধ্যমে নিজেকে ভাঙতে চাইলেন শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য থেকে। এ গ্রন্থের উজ্জ্বলতম কবিতাটি হল ‘ত্রিণাচিকেতের নাচ’। এ কবিতা সর্ম্পকে আলোচক রাশেদ মিনহাজ লেখেন─

“গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘ত্রিণাচিকেতের নাচ’ একটি ঘূর্ণিনাচনের মধ্যে পাঠককে নিক্ষেপ করে। আঞ্চলিক গীতের ‘কমলায় নৃত্য করে থমকিয়া থমকিয়া’-কে শিরোনাম করে শুরু হয় নাচ, শব্দ এবং ধ্বনির─ সে নৃত্য এমন যে পাঠককে ঘোরাতে থাকে অনিবার্য দ্রুততায়, যতক্ষণ না নাচ থামে। কমলার নাচের সাথে ঘোরে জগৎসংসার, ‘বাতাসে উজাননদী স্রোতে-ভাঙা চাঁদ শীর্ণকায়/ ইচ্ছায়-আনন্দে-ধ্যানে ধান ভানে,’

শূন্যের পরেও সাতবার পাক খায় কমলায়

অতঃপর ঢলে পড়ে বিবাহিত নীলজোছনায়

চন্দনে-সুবাসে-স্তবে যে-পুরুষ সূর্ষের থালায়

ঈষৎ সহাস্যে মগ্ন রয়েছে নির্বাক নিরালায়

কমলা ঘিরেছে তারে পতঙ্গের অদ্ভুত কলায়

কমলায় থমকিয়া থমকিয়া নৃত্য করে যায়

উদ্বাহু কমলা আজ ওঠে-নামে নাচের বিভায়

যে-ত্রিণাচিকেত আচরিত ত্রস্ত গূঢ় তপস্যায়

আচ্ছন্ন পৃথিবী জুড়ে নেমে আসে দীপ্ততমোহায়

তারই কোনও রশ্মিময়ী অনিবার্য নিদ্রিত গুহায়

কমলা সুন্দরী মাছ নেচে-নেচে ক্ষয় হয়ে যায়…

কমলায় থমকিয়া থমকিয় নৃত্য করে যায়।

লক্ষণীয় যে, প্রতিটি পঙ্ক্তির শেষে ‘আয়’ এর আবর্তন একটি করে নতুন পাক─ লোকগায়নরীতির মধ্যে এ ধরনের আবর্তন কখনো কখনো নজরে পড়ে। কমলার নাচ নটরাজের প্রলয়নৃত্যের প্রতিরূপ নয়; এর শুরু ধীর ছন্দে, ক্রমে তা হয়ে ওঠে আত্মপরিক্রমণের ক্ষমাহীন চক্রব্যূহ, নিজেরই গড়া এবং নিজের চারদিকে। খুব আবছাভাবে মনে হয়, কমলা নারীজীবনের অনিবার্য দ্বৈততার বন্দিনী, তার অমিতসুন্দর নৃত্য তাকে বেঁধে রেখেছে অন্তহীন চাকায়, যার নিচে তার যৌবন ও সৌন্দর্যও শেষপর্যন্ত অসহায়ভাবে ‘নেচে-নেচে ক্ষয় হয়ে যায়’ : ‘এভাবেই অগ্নি-নৃত্য নিরবধি নাচে কমলায়/নাচের সংসারে এসে অন্তহীনা অতি অসহায়/কমলা সুন্দরীচন্দ্র ধরা পড়ে বাহুর ছলায়।’ ত্রিণাচিকেতের নাচ একটি নারীবাদী কবিতা; অস্তিত্ববাদী কবিতাও─ ভয়ঙ্কর সুন্দর একটি রূপকের প্রতিভাসে বিম্বিত অলাতচক্র যার মধ্যে পুড়ে  যায় সকল ইতি ও নেতি। শুধু জেগে থাকে অনিঃশেষ নাচ, শিরা ও শোণিতের সংক্ষোভ, পরিণতি ধ্বংস ও বিলয়। এক অর্থে কমলা মানব-আত্মার বিরতিহীন জীবনচক্রপরিভ্রমণেরও প্রতীক। ”

[একবিংশ, ভলিউম ২২, নভেম্বর ২০০৩]

এ গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা সিনীবালি সর্ম্পকে কবি’র ভাষ্য─

“‘সিনীবালি’ শব্দটি উপনিষদ-আহৃত শব্দ। বৃহদারণ্যকে বিবাহধর্ম পালন উদ্দেশে রতিকর্মেরত হবার প্রাক্কালে যে বিশিষ্ট আচার করার বিধান আছে তারই একটি শ্লোক। পুরুষ-নারী মিলিত হবার প্রাক্কালে সন্তান প-িত, খ্যাতিমান, সভাসদ, সুভাষ ও সর্ববেদ অধ্যয়নগুণসম্ভব এবং পূর্ণায়ু হবে এরূপ ইচ্ছা করলে, যে আচার ও শ্লোক সেটিই এ কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। বস্তুত আমার কবিতায় দিকনির্দেশহীন প্রেম এবং পরিণতি, সুপুত্রের (সুনাগরিক, শিল্পপুত্র) কামনায় শ্লোকটি উচ্চারিত হয়─ ‘অথৈনামভিপদ্যতেহমোহমস্মি সা ত্বং সা ত্বমস্যমোহহং সামাহমস্মি ঋত্বং দ্যৌরহং পৃথিবী ত্বং তাবেহি সংরভাবহৈ সহ রেতো দধাবহৈ পুংসে পুত্রায় বিত্তয় ইতি। (‘তারপর সে সেই নারীর নিকট গিয়ে বলবে─ ‘আমি অম, তুমি সা। তুমি সা আমি অম। আমি সাম, তুমি ঋক। আমি দ্যৌ, তুমি পৃথিবী। এস আমরা দুজনে চেষ্টা করি যেন আমাদের পুত্রসন্তান হয়।’)

[অমিতাক্ষর, বর্ষ : ৩, সংখ্যা : ২, নভেম্বর ২০০৪]

ফলে ‘ত্রিণাচিকেতের নাচ’ থেকে ‘সিনীবালি’ আরও বেশি পুরাণঘনিষ্ঠ ও দেহজ বলে প্রতিমান হয়─

“এখনই নাচবো আমি─এসো সিনীবালি, আমি অমা

তুমি সা, সা তুমি, আমি সাম, তুমি ঋক─সিনীবালি,

আমার নাচন ধরো ওষ্ঠে, ঊরুদ্বয়ে ধৃত করো

নৃত্যরত আমার আগুন, অরণিমন্থনে জেগে

উঠুক প্রাণের বীজ─এখনই নাচবো আমি, প্রাণে

ধরো এই নাচের নিয়ম, …”

[সিনীবালি: এক, ত্রিণাচিকেতের নাচ]

কিম্ভূত হবার কথা ছিল কবি’র তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। লোকজ ও ধ্রুপদী জীবন, মিথ-পুরাণের সঙ্গে প্রযুক্তি ও সমকালীন চেতনার মেলবন্ধনে তার যে কবিতা─ এ কাব্যগ্রন্থে এসে যেন তা সম্প্রসারিত হল এবং প্রযুক্ত হল রাজনৈতিক-রাষ্ট্রিক-বৈশ্বিক নানা প্রসঙ্গ। যেমন─

১.   “কে খেলা করবে এ লোডশেডিং-এ? মেয়র না কবি

প্রশ্ন প্রশ্ন আর প্রশ্ন হোটেল-কক্ষের আলো ঘুরে মরে যায়।”

[লোডশেডিং-কাল -২, কিম্ভূত হবার কথা ছিল ]

 

২.   “এ নয় বুশের পুত্তলিকা, ব্লেয়ার সাদ্দাম কোনো আরবীয়

শেখের তৈলাক্ত ভূরিভোজ নয় এটি। ”

[বোধি, কিম্ভূত হবার কথা ছিল ]

 

৩.   “ গেছি চলে অহরহ লোডশেডিঙে

ঘরের দেয়াল ছেড়ে আরেকটি দেয়ালে ছায়ায়-ছাগল বানিয়ে।”

[লোডশেডিং-কাল, কিম্ভূত হবার কথা ছিল ]

 

৪.   “আজকাল  আমি খুব একটা জলাশয় দেখি না

দেখি স্থির প্রতিকৃতি একগুচ্ছ শাদা বকের

পা-ডুবিয়ে আছে ঠা-া রসিকতায়…”

[পঞ্চায়েত, কিম্ভূত হবার কথা ছিল ]

 

৫.   “গুলুবাল বিশ্ব, ঝড় আর রোদে পাম্পে-পেট্রোলে তেলে-অর্থবাজারে

ভালবাসিবাইম কৈন্যা তে াআঁরে…..”

[গুলুবাল বিশ্ব, কিম্ভূত হবার কথা ছিল ]

 

স্পষ্টত কিম্ভূত হবার কথা ছিল কাব্যগ্রন্থে কবি রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ব্যঙ্গাত্মক মুড পরিগ্রহণ করেন। তিনি বিদ্রƒপের তীর ছোড়েন বিশ্বজুড়ে জেঁকে বসা অসঙ্গত-অন্যায্য অন্ধকারকে। এ গ্রন্থের কবিতার ভাষাও পূর্বের দু’টি থেকে প্রাঞ্জল।

কিম্ভূত হবার কথা ছিল কাব্যে যে ধারাটির সূচনা সে রূপান্তরিত ধারাটির চূড়ান্ত পরিণাম হিসেবে স্পেসজীবন ও মহাকাশ বিজ্ঞানের নানা সঙ্গ আত্তীকরণ করে এল প্রজন্ম লোহিত। আমরা যেন ঢু মারলাম বিকাশমান এক নবতর  সময়ে, সঙ্গে নিয়ে পুরানো পাপ¬─

“এসেছে প্রজন্ম-লোহিতের বীজ আলাদা আদম,

খেয়ে ফেলেছে গন্ধম

মানুষের তৈরি অভিলাষী বৃক্ষ থেকে

ছন্নছাড়া এসেছে সে এলিয়েবেলিয়ে

বাক্সপেটরা আর বোঝা নিয়ে এসে গেছে

শুধু পাপ শুধু পাপ শুধু পাপ আর মনস্তাফ ক্ষমা ও অনুশোচনা

আবারো এসেছে সঙ্গে

এ যে আলাতচক্রে নিজের ভিতরে গিয়ে সবুজে-রক্তিমে ঘোরা।”

[২, প্রজন্ম লোহিত]

গন্ধম ভক্ষণের পাপের পরিণামে যেমন এ মর্ত্যভূমিতে আসা, তেমনি চংক্রমণকৃত ভুলের কারণেই যেন পৃথিবী ছেড়ে মানুষের গ্রহান্তরে যাত্রা। আর রূপান্তরিত এই প্রজন্ম অনিবার্যভাবেই রক্তিম। ফলে সঙ্গত উৎসুকতা জেগে রয় লোহিত-প্রজন্মের জগৎ-জীবন-দর্শন প্রসঙ্গে। ফলে, মানুষের অস্তিত্ব অভীপ্সা ও মানিয়ে নেওয়ায় প্রবণতায় এ যাত্রাও পরিণত হয় মানবিকতায় আত্তীকৃত। মূলত প্রজন্ম লোহিতে এই বোধ ক্রিয়াশীল। আর মানুষের এই নবযাত্রা এরকমই গতিমান─

“নদী-সংলগ্নের কোনো জরায়ু-নির্মিত প্লাস্টিকের নকল ত্বকের অনুভূতি

লালটেকো মাথার গ্রহের মাথা

জিদানের মতো চাঁচাছোলা

গোঁয়ার্তুমিতে হঠাৎ গোত্তুমারা ওয়ার্ল্ড-কাপ মাথা নিয়ে

বেগমান গতিমান সাঁ-সাঁ-সাঁ

আমার ভাগ্যের দোষে

সাঁ-সাঁ-সাঁ

এই লাল গ্রহে নিবন্ধ দৃষ্টির একফাঁকে ভিনদেশী ইশ্কের চোখের জলের মতন

জমন্ত বরফ”

[১, প্রজন্ম লোহিত]

ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ‘এলিয়ন-সদৃশ মু-িত মাথা’র গোতার মত অকস্মাৎ গতিমান মাথা নিয়েই বুঝি মানুষের এই প্রবণতা? আর ‘লালটেকোমাথার গ্রহে’ কী আছে? সেখানেও কি মানুুুষের জন্য অপেক্ষা করছে একই রঙ্গমঞ্চ? অথবা তার পাপ, তার কর্মই কি তাকে বারংবার বিবর্তিত করে বৈচিত্র্য ও আস্বাদনমুখী নানা ছলনায়? নাকি এটিই মানুষের অনিবার্য নিয়তি─

“তাহলে ছিল কি জল? জলমগ ব্রহ্ম পুনর্বার লালউপনিষদের

চতুর চরিত্র?

পুনর্বার সিংহাসন-ত্যাগী পুরুষের বোধিদ্রুম? পুনর্বার

সোক্রাতিস, প্লাতো, আরিস্ততল, কি নিউটন-আইনিস্টাইন, হকিং

পুনর্বার লাল মুঘলে আযম?

পুনর্বার লালমাটিতে গান্ধী-মুজিবর?”

[১, প্রজন্ম লোহিত]

 

ধাতুজ এ যাত্রায় মানুষ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে তার মাটি ও নাড়ী থেকে। ফলে যন্ত্রতুল্য এ মানুষ মূলতই প্রবহমান বিদ্যুৎতুল্য─

“ধরতে গিয়ে তার রক্ত-ঝিরঝিরে চুল

বুঝেছি চুল নয়, বিজলিতার এক সেই─

শকড্ খেতে গিয়ে সেকি হুলস্থূল, হূল,

রাখতে হল হাত এ-যে পুনর্বার, গরলেই”

[১৪, প্রজন্ম লোহিত]

এবং─

“মানুষ মননে মৃত, ধাতবে জীবিত,

রোবট বোটের মাঝি নিঃসঙ্গ, খেয়ালি─”

[১৭, প্রজন্ম লোহিত]

 

কিন্তু এ মানুষ আবহমানকাল থেকে যা তার জিনগতভাবে অর্জন করে তাও বহন করে এনেছে এই গ্রন্থে।

ফলে─

“হৃদয়ে জমির যুদ্ধ, সঙ্গে ধর্ম, যদিও ধাতব,”

[১৬, প্রজন্ম লোহিত]

আর ‘তৃতীয়’ বিশ্বের দরিদ্রতম বসতির (কলোনি?) মাটিতে দাঁড়ানো কবি’র সত্তা নতুন গ্রহের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। প্রকাশ করে আবহমান মানব-প্রজন্মের যন্ত্রণা। এ ক্ষেত্রে কবি বায়তুল্লাহ্ কাদেরী মুসলিম ঐতিহ্যের মহররমের লোকায়ত প্রসঙ্গকে ব্যবহার করেছেন─

“একজন আমি

ক্রীতদাসে পরিপূর্ণ

ঘর

অসংখ্য রোদের মাথা ককেশীয় কর্কশের ছায়া,

কলোনির কলতলে কালো সৈনিকের নড়াচড়া

ঝিমধরা মাঝি ঝিরঝিরে পানি ভেঙে

উদাস নৌকোকে

বল্লরিত চুল্লি করে

ঢোকায় তামার বৈঠা, দেখা যায়

হোসেনের মো’রমি মোরগ আশুরার শোকে

কুরুত-কুরুত ডাক পারে,

… … … … … … … … … … …

মাটি গলে, গলে জল, টগবগ ফোটে উত্তাপের বাষ্প

তাজিয়াযাত্রায় এই শোকচিহ্ন, তলোয়ারে ব্যবচ্ছেদ”

[২৭, প্রজন্ম লোহিত]

 

মুসলিম ঐতিহ্য মতে শেষ বিচারের দিনে মৃত্যুকে দুম্বার আকৃতি দিয়ে পুলসিরাতে হত্যা করা হবে। আর মৃত্যুর এ হত্যার মাধ্যমে বেহেশত্বাসী মানুষ হয়ে উঠবে মৃত্যুহীন─

“একে চেনা যায়? এর নাম মৃত্যু, দুম্বাকৃতি,

নিয়ে আসা হয়েছে; ছুরিতে কতল হবে

পুলসিরাতে,

 

এর নাম মৃত্যু।

 

এখন সে পাশবিক নয়, শুধু জন্তু।

অপেক্ষা, অপেক্ষা আর অপেক্ষা,

কখন তার নাম ধরে

ডাকবে গ্রহের লাল-পাগড়ির জল্লাদ।

এ-পাগড়িটি দেখা গেছে পৃথিবীতে কম্যুনিস্টরা বিপ্লবে

অনর্থক ওড়াতেন,

তাহলে বিপ্লব এখানেও এসে গেছে? কমরেড আছে লাল

জনতার তাঁতানো উত্তাপে?

ব্যর্থ, নিঃসঙ্গ হতাশাগ্রস্তধ ও ঈশ্বরহীন !”

[২৮, প্রজন্ম লোহিত]

 

প্রজন্ম লোহিতের এ যাত্রা রয়েছে প্রবহমান মানবসত্তার সহস্রাক্ষ উন্মীলন, ফলে তা দর্শনরহিত নয়।

কবি বায়তুল্লাহ্’র পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের নাম আড়ম্বর। এ গ্রন্থ সর্ম্পকে কবি আমিনুর রহমান সুলতান বলেন─

“আবহমান মানব যা কিছু অর্জন করে তার কোন চিহ্নই থাকে না, একমাত্র ‘আড়ম্বর’টুকুই থাকে। কাল যেন মানব জীবনের সবটুকু গ্রাস করে। কবি বায়তুল্লাহ্ কাদেরী গ্রন্থের সব ক’টি কবিতায় একটি অখ- দর্শনলব্ধ চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তার দর্শনলব্ধ চেতনায় উঠে এসেছে যখন মা সন্তান সম্ভবা হয় তখন থেকেই শুরু হয় আবহমান মানবের ‘আড়ম্বর’। আর সে আড়ম্বর জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে নানামাত্রা পায়। আড়ম্বরের কায়াকৃতি একটি বাঁক, অন্যান্য বাঁকগুলো হচ্ছে ‘আগমচুম্বনে’, ‘হাতেখড়ি’, ‘অভিষেক’, ‘প্রজাচার’, ‘প্রজাপতি’, ‘নৃত্য’, ‘অনুগমন’। আড়ম্বর পরিলক্ষিত হয় কায়াকৃতিতে, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজনের আগমচুম্বনে, শৈশবের ‘হাতে খড়িতে’, ‘যৌবনে অভিষেক’-এর মধ্য দিয়ে যৌবনটাই যে আচারে পরিব্যপ্ত─ তা হোক লোকাচারে, লোকধর্মে, লোককল্যাণে যা ‘প্রজাচারে’-এর মধ্যে প্রবহমান প্রজাপতি প্রতীকে বিয়ের মধ্য দিয়ে ‘প্রজন্মান্তরের প্রতীক ‘নৃত্য’ এর মধ্য দিয়ে এবং অনুগমন অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষের বয়োবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে মৃত্যুর  পরিণতিতে। ”

[যুগান্তর, ০৩ এপ্রিল ২০০৯, আবহমান মানবচেতনায় কবির আড়ম্বর, আমিনুর রহমান সুলতান]

ভূমিষ্ট হবার পূর্বে মায়ের সন্তান-সম্ভাবনার আড়ম্বর কবি ‘সুপুষ্টধান্য’ প্রতীকে এভাবে উপস্থাপন করেন─

“এমন সুপুষ্ট ধান্যে পূর্ণমতি ধীরে ধীরে ধরে আছে ছায়া

দেহের বিকেল শুধু দূর হাঁসফাঁসে অসহায় সভারে তাকিয়ে থাকে

এই বুঝি পরিপূর্ণ টইটম্বুর পুষ্করণীজল উপচে-পড়া মাছ

আলগোছে আসবে বেরিয়ে

বোঝা যাচ্ছে আড়ম্বর … আড়ম্বর … আড়ম্বর …”

[ আড়ম্বর, আড়ম্বর]

 

পৃথিবীতে আগমন সম্ভাষণ─

“ দেখছি পিতার মতো অতি সপ্রতিভ, প্রজাপতিব্রতসারা

তৃপ্তিময় ময়ানের তুলো, হয়তো ‘জয়তু’ বলে

এখনই জানাবে সম্ভাষণ বৎসে,”

[ আগমচুম্বনে-১, আড়ম্বর]

 

এবং─

“এক ধরনের আড়ম্বর সম্ভবের চুলা জ্বালিয়ে দিয়েছে

ঘৃত.. মধু.. ধান.. দূর্বা..

অথবা আজান শুরু হল দক্ষিণের কোনো গৃহ থেকে…”

[ আগমচুম্বনে-১, আড়ম্বর]

মানবসভ্যতা নির্মাণ, বিকাশ ও উপভোগের চূড়ান্ত পরিণতির পেছনে ওতপ্রোত সত্তাটি তো মানবই। ফলে কবি উচ্চারণ করেন─

“একবার মাত্র পিতার তিয়াসে শিসাপোড়ানোর

গন্ধ উঠেছিল

আমি দূরে বাকবিহ্বল আহ্বানে ধ্বনিহীন মাতৃআড়ম্বরে

কেমন পেঁচিয়ে আছে। হাঁ, সম্রাট অশোক এসেছি…

অক্ষরে ভিক্ষুর প্রাণ, আমার খড়গে আড়ম্বরের সম্পূর্ণ

রক্তস্রোত”

[কায়াকৃতি-২, আড়ম্বর]

 

এভাবে নানা পঙ্ক্তিতে আড়ম্বর বিধৃত হয়─

১.   “যাবতীয় ব্রতাচারে ধনুর্বিদ্যা, অশ্ববিদ্যা শ্লোকপাঠ

একটি মাঠের মধ্য দিয়ে মই চড়িয়ে দেয়ার মতো রীতি

যেন পরিপূর্ণ আড়ম্বর …

এভাবে মুছে গেছে সাফল্যের গাঁথা।…”

[হাতেখড়ি-২, আড়ম্বর]

 

২.   “ আমি জানি না নিজের সঙ্গে মানুষের কখনি বা দেখা হয়ে থাকে

শুধু দেখা হবে এই অহেতুক আড়ম্বর জীবনব্যাপ্তিতে বারবার শুরু হয়

রাজা আসে, প্রস্তরের, লোহার, তামার রাজা লেপ্টে থাকে দিগি¦দিক

মাটির গর্তের নিচে। আড়ম্বরের বিবর্ণ গল্প থেকে

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গন্ধময় এপিসোড

কীরকম নির্বাণের মতো ঠাণ্ডা রূপসিনী।

মাটির ভিতরে সিক্ত ব্যক্তি হয়ে ওঠার সরল আড়ম্বর।”

[প্রজাচার, আড়ম্বর]

৩.   “বাহুর নির্জন মিতাচারে উষ্ণ হতে হতে আবারো নামছে

শূন্যতা, শ্যেনদৃষ্টির শকুনের কাছে এই ঘরজিম্মি রেখে

চলে যেতে ইচ্ছে করে বলে এরকম আড়ম্বরে আমাকেও

আলাদা করার কথা ভাবি।”

[প্রজাপতি-১, আড়ম্বর]

৪.“চমৎকার সেজেছে রজনী!

চমৎকার তার রূপ বিজলিখসা হাসি!

আতসবাজির ঝুরঝুরে ছিটকানো আলো

দ্রিদিম দ্রিদিম বাদ্য, অনবদ্য রমণীর মৃগনাভিঘ্রাণ

কী ঝাঁঝালো, ঝিঁঝিঁময় তীব্র একটানা আড়ম্বর”

[প্রজাচার-২, আড়ম্বর]

কবি’র পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে কবিকে সমাজ-দেশ ও রাজনৈতিক চেতনায় প্রগাঢ়ভাবে দগ্ধ হতে দেখি। আর সেই দগ্ধতার তাপে বায়তুল্লাহ্ কাদেরীর কবিতার শব্দগুলি কখনো ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে ওঠে, আবার কখনোবা ছোড়ে বোধের দায়গ্রস্ত অদৃশ্য তীর─

১.   “লাগাতার রাজাকার লাগাতার ধর্মান্ধতার লাগাতার ঘোরপ্যাচ.. লাগাতার

মার্কিন-ব্লেয়ার লাগাতার বেহায়ার মতো লাগাতার মুদ্রাদোষে একদম আউল

উঠেছি আমি,…”

[লাগাতার, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

২.   “পলিটিক্স শিখাতে এসেছে

এসেই ঝেড়েছে কিছু পলিটিক্স

নারীর মতন উঁচু-করে বাঁধা চুল

রমণীর মতো সম্ভ্রমে নিতম্ব

কিছুটা বিন্যস্ত

হিলের মতন চটজলদি গতিময়তা

ঘড়ির মতন চাকচিক্যে ত্রস্ত প্রগল্ভতা”

[পলিটিক্স, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৩.   “ এ বাজারদর নয়। তেল বেড়ে

ডলারে ডলারে

পৌঁছে গেছে, পদদলিত ডলারে

পৌঁছেছে পাছার পায়ুতেল, আমেরিকা চায়

ইরানে  সেঁধিয়ে যেতে ভেতরের তেলে”

[দিঘি থেকে তোলা-জলে, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৪.   “একটি যন্ত্রের জন্য মোরগ জবাই দিয়ে দেখি

ওটির করোটি ঠিক মানুষের মতো”

[কাপালিক, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৫.   “মমতাজ ‘মরার কোকিলা’ গা’য়া দিল টান টান করে

মমতাজের তাজ ‘ফাইট্টা যায়’ র‌্যাবের গাড়ির ধাবমান

গতির চিতায়… গল্প জমছে না.. ”

[গলধঃকরণ চলুক, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

আরও কিছু চুম্বক পঙ্ক্তি─

১.   “কতগুলো চোখ ছিল

তোমার নিজের ভিতরে একান্ত ডুবে? কত চোখে

কেঁদেছিলে আরাধনার বালিশ থেকে নেমে

অলস বালিশে?”

[চোখ-২, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

২.   “আমাকে যতক্ষণ দেখতে পারা যায়, দেখে নেই।

দেখে নেই যতটুকু দেখা যায়

আমাকে আমার মতো।”

[কী আছে সিন্দুকে, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৩.   “ঐ তো দেখা যায় ধী-রে সোলেমান বাদশার মতই লাঠি ধরে আছে..

আমি বাতাসের জীবের প্রাণের থেকে আরেকটি উত্তাপের মত

আয়োজন শুনে থমকে দাঁড়াতে চাই

উঠোনটি কার?”

[সূর্যস্নান, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৪.   “আপাতত সিংহাসনে ওঠা চাই

যদিও নামার ব্যাপারটা এ-মুহূর্তে

সিংহাসনারোহণের চেয়ে গূঢ় সিদ্ধান্তসাপেক্ষ”

[ সিদ্ধান্তসাপেক্ষ, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

 

৫.   “নিশ্চয় আমার মনে আছে আমি এক আলাভোলা

জীবনের টানে ছুটে এসেছি এখানে, আমাদের

গাঁয়েরই ছেলের মতে অতিচেনা পরিচিত মুখে

দাঁড়িয়েছি দরোজায়,”

[ আমাকে আমার  মনে আছে, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে]

কবি বায়তুল্লাহ্ কাদেরী তার কবিতায় বহু লোকজ শব্দ বা আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। অবশ্য তাকে অত্যধিক হারে প্রচলিত বা অপ্রচলিত সংস্কৃত ও ইংলিশ শব্দও ব্যবহার করতে দেখা যায়। ধরে নিচ্ছি, পুরাণ-উপনিষদের নানা মিথ ব্যবহারের লক্ষ্যে তার এত সংস্কৃত শব্দের আমদানি ঘটানো লেগেছে। তবে তিনি পশ্চিমবঙ্গীয় ঢঙ্গের আঞ্চলিক ক্রিয়া (রাবীন্দ্রিক?)─করেছিনু, খেয়েছিনু জাতীয় কিছু শব্দকে ও সংযুক্ত করেছেন তার কাব্যে; এবং তার কাব্যে ইংলিশ শব্দ ব্যবহারের আধিক্যও স্পষ্ট─অজানা যুক্তিতে। [কবি এই শব্দগুলির কীভাবে উত্তরাধিকারী হলেন তা আমার বোধগম্য নয়।] এ ছাড়া ভাবের ডানার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চলাটা সবক্ষেত্রেই সমগতির হল কি-না¬, কল্পনার উল্লম্ফনটা ক্ষেত্রবিশেষে একটু বেশিই হল কিনা, অথবা সমকালীন প্রসঙ্গের আধিক্য কবিতার মেজাজে নাড়া দিল কিনা─ এই রকম কিছু কৌতূহল থেকে যায়…। এতে তার কবিতায় বিঘœ ঘটানোর মতো কোনো  প্রভাব পড়ল কিনা,  পড়লে তার পরিমাণও বা কি─সে সিদ্ধান্তে আসতে হলে কবি বায়তুল্লাহ্ ও তার কবিতা সম্পর্কে আরও বেশি জানা-বোঝা প্রয়োজন। অথবা প্রয়োজন সময়ের হাতে এ বিচার ছেড়ে দেওয়া। ফলে এ বিষয়ে ইতি বা নেতি কোনো প্রকার মন্তব্য থেকে দূরে থাকাটাই সুবিবেচ্য মনে করেছি।

বলা প্রয়োজন, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী একটি  সুদীর্ঘ সময় ধরে নিবিষ্ট ধ্যানে কাজ করে চলেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থতেই তিনি তার মেধা-মননের স্বাক্ষর রেখেছেন। তারপর বারংবার তার প্রচেষ্টা নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া, নিজেকে ভাঙ্গা। সেই যাত্রাকে কণ্ঠকমুক্ত রাখতে এই রাজধানীতে অবস্থান করেও নিজেকে একপ্রকার আড়াল করে চলেছেন। ফলে তার বিষয়ে আমরা আশাবাদী─ভবিষ্যতে তার আরো শিল্পনিষ্ঠ বলিষ্ঠ উপস্থিতি আমাদের প্রত্যাশাকে ফলবান করবে।

আরও পড়ুন