মঙ্গলবার ২০শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

‘বিশেষ শিশুর’ দায় কি শুধু মায়ের?

নভেম্বর ৪, ২০১৮ | ৪:১৭ অপরাহ্ণ

পর্ব-৪।। 

জন্ম-মৃত্যু মানুষের জীবনে নির্ধারিত নয়। মানব জন্ম  স্বাভাবিক এবং সে বড় হয়ে উঠবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এটাই তো আমাদের চাওয়া। কিন্তু যখন কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে কিন্তু তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ও আচরণে অসংগতি বা অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় তখনই তাকে বলা হয় ‘বিশেষ শিশু’।

এই বিশেষ শিশুটি নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। সে বোঝে না তার পরিবেশ এবং পরিস্থিতি আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো। যার কারণে এই বিশেষ শিশুটি হয়ে ওঠে পরিবারের কাছে বাড়তি বোঝা। মা পারে না তার দায় এড়াতে। মা চেষ্টা করে যান তার সর্ব্বোচ্চ দিয়ে এই শিশুটিকে লালন করতে।

রেহনুমা (ছদ্মনাম) আমার কাছে এসেছিলেন তার পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। দীর্ঘদিনের দাম্পত্যের যন্ত্রণা আর টানতে না পারায় জর্জরিত। রেহনুমা বলছিল, ‘আপা, ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম সাফাতকে। খুব প্রেম ছিল আমাদের সম্পর্কে।’

সাফাত পাগল হয়েই বিয়ে করে সুন্দরী, চৌকষ আর স্পষ্টবাদী রেহনুমাকে। বিয়ের বছর দুয়েক পরেই জন্ম নেয় তাদের কন্যা শৈলী। প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও ধীরে ধীরে ‘বিশেষ শিশুর’ সব লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে শৈলীর আচরণে ও অবয়বে। কিন্তু রেহনুমা, সাফাত ভেঙ্গে পড়েনি। রেহনুমা বলেন, ‘আমরা দুজনে যখন বুঝলাম এবং বিশেষজ্ঞের সহায়তায় জানলাম শৈলী বিশেষ শিশু, আমরা মানসিকভাবে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছিলাম কিন্তু ভেঙ্গে পড়িনি। শৈলী ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে আমাকে শৈলীর সাথে ব্যবহারের কৌশল শিখতে হয়, কিভাবে তাকে লালনপালন করবো।’

এই শিশুটির সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব মা হিসেবে রেহনুমাকেই করতে হত। যার কারণে এক পর্যায়ে রেহনুমা তার চাকরি ছেড়ে দেয়। শৈলীকে যথেষ্ট সময় দিতে হয় রেহনুমার। যৌথ পরিবারে থাকার কারণে সংসারের বাকি দায়িত্বের পাশাপাশি শৈলীর প্রতি রেহনুমার দায়িত্বের জায়গাটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বহুগুণ।

রেহনুমা আবারো বলতে থাকে, ‘শৈলীকে বিশেষ স্কুলে ভর্তি করালাম। প্রথম প্রথম শৈলীর বাবাই স্কুলে আনা নেয়ার দায়িত্বটা পালন করতো। মনে হতো শৈলী তার প্রাণ। আমি খুব খুশি ছিলাম। আমার দায়িত্বের জায়গায় সে কিছুটা শেয়ার করছে। যার কারণে আমি কখনোই মন খারাপ করিনি। মনে হতো, মা বাবা হয়ে আমরা দুজনেই তো শৈলীকে বড় করছি, সময় দিচ্ছি।’

রেহনুমার সংসারে যথেষ্ট স্বচ্ছলতা ছিল বলেই সে জানায়। তাই সন্তানটিকে বড় করতে বা বাড়তি খরচ করতে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। বাসায় শিশুটিকে দেখাশুনা করবার জন্য একটি মেয়েকে রাখা হয়।

রেহনুমা আবারো বলে, ‘বিশেষ শিশু হবার কারণে শৈলীকে নিয়ে নিয়মিত কাউন্সিলরের কাছে যেতে হতো। আমি আত্মস্থ করতে থাকি শৈলীর সাথে আমার আচরণ এবং তার কৌশল। বিশেষজ্ঞের কাছে জেনে নিয়ে আমি নিজেকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করে ফেলি যেন আমার সন্তানের মানসিক বিকাশে কোন বাধা না আসে। এই নতুন শিক্ষা আমাকে সাহায্য করতে থাকে আমার সন্তানকে নতুন করে চিনতে। ওর ব্যবহার, মুড, অনুভূতি, এক্সপ্রেশন সবকিছুই নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করে যাই।’

শৈলী ভাল ছবি আঁকে। রেহনুমার উৎসাহে শিশুটি পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা আর টুকটাক ঘরের কাজ করতে পছন্দ করতে শুরু করে। ঘরময় শৈলীর পদচারণা। রেহনুমা অবাক চোখে দেখে মেয়ের বড় হয়ে ওঠা।

রেহনুমা বলে, ‘মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত। শৈলী বুঝতে চাইতো না সে বড় হয়েছে। মেয়েলী অনেক শারীরিক পরিবর্তন শৈলী মেনে নিতে পারতো না। আমি মা হয়ে কখনও বিরক্ত হইনি। যতটা সম্ভব তাকে শিখিয়েছি, বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’

শৈলী বড় হবার সাথে সাথে স্বামী সাফাতের মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পায় রেহনুমা। মেয়ের সাথে সেই স্নেহময় সম্পর্ক থেকে সে দূরে সরে যেতে থাকে। রেহনুমাকেও আগের মতো কাজে সাহায্য করে না। ব্যবসার অবনতি হতে থাকে। দিনের বেশিরভাগ সময় এবং রাতে দেরি করে ফেরা শুরু করে। রেহনুমার সাথে দুর্ব্যবহার করতে থাকে। মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব চলে আসে দুজনের।

রেহনুমা বলেন, ‘আমরা আলাদা ঘরে ঘুমাতে থাকি। খুব চেনা মানুষটা অচেনা হয়ে যায়। ঘরে এসেই অকথ্য ব্যবহার আর গালিগালাজ। শৈলী তার প্রিয় ও কাছের বাবাকে ভয় পেতে থাকে। যে বাবা ঘুম পাড়িয়ে না দিলে তার ঘুম আসতো না, সেই বাবাই তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমি হিমশিম খেতে থাকি। কি করবো?

শেষমেষ একটি চাকরি নেই, কিছুটা স্বস্তি মেলে।’

রেহনুমা চাকরি নেবার পর শৈলীও বুঝতে পারে মাকে কাজে যেতে হয়। বাসায় থাকা মেয়েটির সাথে শৈলী অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকে। আর সাফাতের অনিয়মিত বাসায় ফেরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যা রেহনুমা লক্ষ্য করতে থাকে।

রেহনুমা সংসার না করবার সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় সমাধান চান বলে জানান। এই অসম্মান আর স্বামীর সাথে দূরত্ব সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না। রেহনুমা লিখিতভাবে অভিযোগ করে। অভিযোগের পর কয়েকবারই দুজনকে নিয়ে মধ্যস্থতায় বসে। দু’একবার বসবার পর সাফাত আর সংসার চায় না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। এমনকি সে তার শিশু সন্তানটিরও কোন দায়দায়িত্ব নিতে রাজী নয়।

রেহনুমা অবিচল কঠোর কন্ঠে বলেন, ‘তাই হোক- সংসার নয়, ডিভোর্স।’ যদিও রেহনুমা ভালবাসার কষ্ট বুকে চেপেই কথাগুলো বলছিলো।

রেহনুমা মধ্যস্থতায় বসে সাফাতের কাছে শৈলীর পুরো ভরণপোষণ দাবি করে যা দিতে সাফাত আইনানুযায়ী বাধ্য। কিন্তু সাফাত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তার ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। তার পক্ষে এই মূহুর্তে এতো টাকা দেয়া সম্ভব না। সে শৈলীর জন্য যৎসামান্য টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। রেহনুমা তাতেই মেনে নেয়। তবে নির্ধারিত সময়ের পর সাফাত টাকা বাড়িয়ে দেবার প্রস্তাব দেয়। রেহনুমা মুক্তি চায়, আর ধিক্কার দেয় ঐ বাবাকে যে তার বিশেষ শিশুটির ভরণপোষণ দিতে অপারগ।

রেহনুমা যখন আমার সংস্থায় আসে, সেসময় রেহনুমা তার শ্বশুরের পরিবারেই ছিলেন। কারণ সে মুহূর্তে শৈলীকে নিয়ে তার আলাদা বসবাস করার মতো কোন সুযোগ ছিল না। সাফাত তখন নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলাদা বসবাস করছিলেন। সাফাতের পরিবার কখনই চায়নি সাফাত, রেহনুমার সম্পর্ক ভেঙ্গে যাক। তারা চেয়েছে সাফাতের পরিবর্তন হোক। সাফাত ফিরে আসুক শৈলী, রেহনুমার কাছে। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রেহনুমা তার সন্তানটিকে নিয়ে আলাদা বসবাস করবেন বলে সংস্থার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন। সাফাত রেহনুমাকে তালাক নোটিশ দেবার পরই রেহনুমা তার পরিবারের সহায়তায় শৈলীকে নিয়ে চলে যান আলাদা বাসায়। ফেলে যান দীর্ঘ ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি। শৈলীকে তার বাবা মাঝে মাঝে দেখবেন বলে সংস্থার মাধ্যমে আশ্বস্ত করেন।

মুসলিম আইনানুযায়ী, বাবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক। আর মা হচ্ছেন সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক। বাবা মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানের তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা মা হারাবেন না। কিন্তু সাফাত, রেহনুমা দম্পতির তালাক হয়ে যাওয়ার পর সাফাত বাবা হিসেবে শৈলীর অভিভাবকত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেননি। বরং আদালতের মাধ্যমে রেহনুমাকে আইনগত অভিভাবকত্ব প্রদানের বিষয়ে কোন কুন্ঠাবোধ করেননি। রেহনুমা তার এই ইচ্ছের কথা জানালে সাফাতকে প্রস্তাব দেয়া হয়। সে এই প্রস্তাবে রাজী হন এবং পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ায় সে তার সম্মতিসূচক প্রস্তাবনা জানাবেন বলে সংস্থাকে অবহিত করেন। রেহনুমা সন্তানকে নিয়ে বিদেশ গেলেও তার কোন আপত্তি থাকবেনা বলে জানান।

সাফাত যেন এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তার কন্যা তার কাছে বোঝার মতো আর সংসার যেন নরক। এমন বহিঃপ্রকাশ ছিল সাফাতের আচরণে এবং কর্মে।

একজন বিশেষ শিশুর মা হয়ে রেহনুমা আজও লড়াই করে চলছে। বিশেষ শিশুদের সমাজের মূলস্রোতে আসার পথে অনেক প্রতিকূলতার শিকার হতে হয়। এইসব শিশুদের পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। কিভাবে নিজের সামর্থ্য আর মেধাকে কাজে লাগিয়ে তারা সমাজে চলতে পারে। এই সন্তানটিকে বাঁচিয়ে রাখবার সমস্ত উপকরণ আর তার ভাললাগার জায়গাগুলো খুঁজতে বাবা মা উভয়েরই প্রয়োজন। কিন্তু বিশেষ শিশুটির বাবা মায়ের বিচ্ছেদ শিশুটিকে একাকীত্বের বোঝা নিয়েই বড় হতে হয়। মা জানেনা তার অবর্তমানে এই শিশুটির দায়ভার কে নেবে?

শুধুমাত্র আইন দিয়ে নয়, বাবা মা উভয়েরই মানবিকতা দিয়ে ভাবতে হবে। এই বিশেষ শিশুটির কষ্ট যন্ত্রণা না বাড়িয়ে দুজনে হাতে হাত মিলিয়ে তাকে সমাজের ও পরিবারের সদস্যদের কাছে গলগ্রহ থেকে মুক্তি দেয়া। তবেই না শিশুটি বাঁচবে আলোতে আর আনন্দে।

 

সারাবাংলা/ এসএস

‘বিশেষ শিশুর’ দায় কি শুধু মায়ের?
‘বিশেষ শিশুর’ দায় কি শুধু মায়ের?
‘বিশেষ শিশুর’ দায় কি শুধু মায়ের?