রবিবার ২১শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৬ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

বিয়ের বয়স- কে ঠিক করে, কেন ঠিক করে?

ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭ | ৫:৫২ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল মাওয়া –

রক্ষণশীল সমাজগুলোতে বিয়ের বয়স বলে একটা শব্দবন্ধ বেশ প্রচলিত। বিশেষত বিবাহিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়, প্রতিবেশীদের কাছে খুবই প্রিয় এবং সমাদৃত এই শব্দবন্ধটি। সুযোগ পেলেই এরা মোটামুটি পঁচিশ ঊর্ধ্ব  অবিবাহিত নারী এবং পঁয়ত্রিশ ঊর্ধ্ব  অবিবাহিত পুরুষ দেখলেই কোন রকম ব্যাক্তিগত ভদ্রতাবোধের সীমারেখা না মেনেই তাদের বিবাহবিষয়ক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে উদগ্রীব  হয়ে পড়েন। ক্ষেত্রবিশেষে মন মত উত্তর না পেলে কপালে তিনটি ভাঁজ  ফুটিয়ে বলেন, “দেইখো আবার, বিয়ের বয়স না পার হয়ে যায়”।

এই  বিয়ের বয়সটা যে কী মহার্ঘ্য বস্তু তা জানতে আমরা পুরো বিষয়টির আরো একটু গভীরে যাবো।  তার আগে এই বিয়ের বয়সজনিত জটিলতায় নাস্তানাবুদ হওয়া কয়েকজনের গল্প বলে নিই।

প্রথমজনের নাম জেরিন। দেশের একটি অন্যতম নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশুনা শেষ করে এখন সরকারি চাকরিতে ভালো পদে আছেন। সবসময় পড়াশুনা এবং নিয়মকানুনের বেড়াজালে বন্দী থাকার পর এখন একটু  নিজের মত করে ঘুরেফিরে জীবনটাকে উপভোগ করতে চান। এখনই বিয়ের মত কোনরকম কমিটমেন্টে যেতে তিনি মোটেও আগ্রহী না। তবে তাঁর এই অনাগ্রহ নিয়ে তাঁর বাবা মায়ের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাঁরা  দিনমান চিন্তা করেন, মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলে মেয়েকে কীভাবে পাত্রস্থ করবেন! বাড়িতে কোন আত্মীয় আসলেই তাকে ধরেন মেয়েকে বোঝাতে। পাড়া প্রতিবেশীরা মেয়ের ‘বিয়ে হচ্ছেনা’ কেন এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন।

মনিরা নামের আরেকটি মেয়ে, কাজ করেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল হলেও সমাজের চোখে তিনি ব্যর্থ, কারন তার ‘বিয়ে হয়না’, বিয়ের  বয়স পার হয়ে গিয়েছে অথচ ‘বিয়ে হয়নি’ বলে তাঁর পরিবারের সকলের দুশ্চিন্তার সীমা নেই। বাস্তবতা হল, অনেক পাত্রকে তিনি পছন্দ করেননি, আবার তাকেও অনেকে অপছন্দ করেছেন। অর্থাৎ ব্যাটে বলে মেলেনি বলে এখনো সময় নিচ্ছেন। কিন্তু সকলেই ধরে নিয়েছে যে তাঁর ‘বিয়ে হয়না’।

এই বিয়ের বয়স পার হওয়াদের দলে আরেকজন হলেন রিটন। তিনি একজন গবেষক, বয়স আটত্রিশ।  তাকেও আত্মীয় বন্ধুরা প্রায়ই বিয়ে করতে তাগাদা দেয়। ‘কেন বিয়ে করছো না’ জাতীয় প্রশ্নে তিনি জেরবার। তবে তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘বিয়ে হয়না’র বদলে ‘বিয়ে করেনা’ জাতীয় সমস্যা হওয়াতে এবং পুরুষ হবার কারণে তাঁর মা বাবার ব্লাড প্রেশার এখনো খুব বেড়ে যায়নি।

ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? বিয়ের বয়স বিষয়টি ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্যে প্রযোজ্য হলেও মেয়েদের বেলায় ব্যাপারটা একটু বেশিই চাপের। কারন মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে গেলে সমাজ অবিবাহিত মেয়েটির কপালে ‘বিয়ে হয়না’ লেখা একটি অদৃশ্য মোহর এঁটে দেবে।  যত বয়স বাড়বে ততই তাঁর বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে বলেই মনে করা হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়? এই প্রশ্নের মূল অনেক গভীরে। বিয়ে প্রথাটির সাথে জড়িয়ে আছে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ। এইসব সমীকরণকে ছাপিয়ে এখনো পর্যন্ত খুব কম মানুষই বিয়েকে দুইজন মানুষের মধ্যকার ভালোবাসার সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করেন। যার জন্যে বিয়ের বয়স এখনও এত বেশি গুরুত্ব বহন করে চলেছে।

একসময় ধর্মই ঠিক করে দিয়েছে ছেলে মেয়েদের বিয়ের বয়স। হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ মনুসংহিতায়  বিশেষত মেয়েদের বিয়ের বয়সের ব্যাপারটায় বেশ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে মেয়েদের ঋতুমতী হবার আগেই বিয়ে দিয়ে দেবার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে এর পরে কোন মেয়ের বিয়ে হলে পিতামাতার নরকে যেতে হবে। আট বছরের মেয়েকে বিয়ে দেয়াকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এর ব্যখ্যা হিসেবে অনেকে বলেন বাবার বাড়িতে বেশিদিন কন্যা থাকলে সে বাবার বাড়ির রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং পরে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর শেকড়টি ঠিকমত বসতে চায়না। তাই যত কম বয়সে সম্ভব কন্যাটিকে বাবার বাড়ি থেকে উৎখাত করাই কর্তব্য। অর্থাৎ এক্ষেত্রে দুইজন মানুষের নতুন সংসার তৈরি করার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে একটি পরিবারের মেয়েকে আরেক পরিবারে স্থানান্তর করার বিষয়টি।  ইসলাম ধর্মেও বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে প্রায় একই মত অবলম্বন করা হয়। এতে  ছেলে মেয়ে উভয়েরই প্রাপ্তবয়স্ক হবার সাথে সাথেই বিয়ে দেবার জন্যে বাবা মায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী পুরুষের যৌন সম্পর্কের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এরপর রাষ্ট্রব্যবস্থা সুসংগঠিত হবার পরে আইন করে ছেলে মেয়েদের বিয়ের বয়স ঠিক করে দেয়া হয়। অর্থাৎ সমস্ত ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। আর প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়েদের বিয়ের বয়সটাকে একদম আঁটসাঁট করে ধরে বেঁধে দেয়ার চেষ্টায় থাকে সমাজ।

কেন বিয়ের জন্যে বয়স এত গুরুত্বপূর্ণ এ নিয়ে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ও লেখক জোবাইদা নাসরিন।  তিনি বলেন, আমাদের দেশে বিয়ের সম্পর্কে মানবিক লেনদেনের গুরুত্ব কম। এখানে বিয়েটা একটা বৈধ যৌনতার লাইসেন্স এবং মা হবার উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তাই সমাজ বিভিন্ন ধরণের মাপকাঠি দিয়ে ঠিক করে দেয় বিয়ের বয়স। যেহেতু বিয়েকে বংশবিস্তারের উপায় বলে মনে করা হয়, তাই মনে করা হয় একটি কমবয়েসী মেয়ের শরীরই মা হবার জন্যে বেশি উপযুক্ত। যদিও পুরুষের স্বাস্থ্যও বংশবিস্তারে অন্যতম গুরুত্ব  বহন করে, সেটিকে অবশ্য তেমন ধর্তব্যে আনা হয়না। এছাড়াও আমাদের সমাজে সাধারণভাবেই একটি কথা চলে,  সেটি হল ‘কুড়িতে বুড়ি’। অর্থাৎ প্রচলিত সামাজিক ধারণা হল মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায়, মানে যৌন আবেদন হারিয়ে ফেলে। তাই মেয়েদের ‘বিয়ের বয়স’ খুব দ্রুত পার হয়ে যায়!

 

 

তবে যদি শুধু বংশবিস্তারই প্রধান চিন্তার বিষয় হয়, সেক্ষেত্রে পঁচিশ বছর বয়সে তো মা হবার কোন জটিলতা নেই। তাহলে কেন মাস্টার্স পাশ করে ফেললেই সে মেয়েটির পাত্রের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরে ডঃ জুবাইদা জানান, শুধু বংশবিস্তারই না বিয়ের সাথে জড়িয়ে আছে রাজনীতি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে শরীরে, সামর্থ্যে, মনে ও মতাদর্শে তার চেয়ে তুলনামূলক কম বয়েসী মেয়ের চেয়ে শক্তিশালী হবে। এতে তাকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতন করা যায়না বলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চায় কমবয়সী মেয়েকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করতে। অপেক্ষাকৃত কমবয়েসী মেয়েরাই দেখা যায় যৌন এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। সত্যিকার অর্থেই এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রভাবকের কাজ করে থাকে। বেশিরভাগ পাত্রপক্ষীয়রা চায় বউয়ের বয়স হবে কম। তুলনামূলক কমবয়েসী বউ ঘরে আনতে পারাটা অনেকের কাছে সামাজিকভাবে গর্বের বিষয়। এতে বউটিকে যথাযথভাবে আড়মোড়া ভেঙ্গে শাসন করা যায় বলে পাত্রপক্ষের আনন্দের সীমা থাকেনা। আর এইসব ধ্যান ধারণার জন্যেই তুলনামূলক বেশি বয়েসী স্বেচ্ছায় অবিবাহিত থাকা মেয়ের কপালেও ‘বিয়ে হয়না’র তিলক দিয়ে দেয়া হয়।

তাহলে এসব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠেও বিয়ের প্রকৃত বয়স কী হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে জোবাইদা নাসরিন বলেন, “আমি বিয়েকে দেখি দুইজন মানুষের মানবিক সম্পর্ক হিসেবে। বিয়ের সম্পর্ককে কে কীভাবে দেখবে তার উপর নির্ভর করে একজন মানুষ কখন বিয়ে করবে”।

বিয়ের বয়স বলে সামাজিক ভাবে যে শব্দবন্ধটির প্রচলন হয়েছে এটি আসলে মানবিক সম্পর্ককে এড়িয়ে সামাজিক ও বৈষয়িক কিছু প্রপঞ্চের গোড়ায় পানি ঢালে। যার ফলে ব্যাক্তি মানুষের ইচ্ছার মূল্য সেখানে থাকেই না বলতে গেলে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যার ভুক্তভোগী হতে হয় নারীকে।

বিয়েকে যদি সত্যিকার অর্থে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানবমানবীর প্রেমের পূর্ণতা হিসেবে ধরা হয় তাহলে একে বয়সের ফ্রেমে কিছুতেই বেঁধে রাখা যাবেনা।

অলঙ্করণ- আবু হাসান

ছবি- ইন্টারনেট

সারাবাংলা/ জেএম/ এসএস

 

Tags:

বিয়ের বয়স- কে ঠিক করে, কেন ঠিক করে?
বিয়ের বয়স- কে ঠিক করে, কেন ঠিক করে?
বিয়ের বয়স- কে ঠিক করে, কেন ঠিক করে?