রবিবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৮ আশ্বিন, ১৪২৫, ১২ মুহররম, ১৪৪০

ভরা মৌসুমেও পড়েনি ইলিশের দাম

সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ

।। এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: ভরা মৌসুমেও গত কয়েক বছরের তুলনায় বাজারে এবার ইলিশের সরবরাহ কিছুটা কম। মৌসুম শেষের দিকে হলেও নগরীর অলি-গলিতে ‘পদ্মার ইলিশ’ ফেরিওয়ালাদের কণ্ঠে এমন হাকডাক গেল বছরের তুলনায় কম। কিছু মোড়ে মোড়ে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেলেও সংখ্যায় তা গত বছরে চেয়ে এখনও কম। আর সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দামও কিছুটা বেশি।

পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, আবহাওয়া অনকূলে না থাকায় মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। ঘন ঘন ‘সতর্ক সংকেত’ পড়ায় ফিশিং বোটগুলো পাঁচ দিনের বেশি সময় থাকত পারছে না সাগরে। ফলে নগরীতে এবার ইলিশের সরবরাহ গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম। তবে মৌসুমের শেষ দিকে এসে জেলের জালে ধরা পড়তে শুরু করেছে ইলিশ। তাতে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে হালিতে ইলিশের দাম কমেছে অন্তত ৪০০ টাকা। ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এখন মিলছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পিসে।

এদিক, জাটকা নিধন প্রতিরোধে আগামী ৭ অক্টোবর থেকে সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন বন্ধ থাকবে ইলিশ ধরা। সাগর থেকে তখন তীরে ঘেঁষবে সব ফিশিং বোট। আর তখন সরবরাহ বাড়ায় মাছের দামও কমবে বলে বিক্রোতাদের ভাষ্য।

মঙ্গলবার (১১ সেপ্টেম্বর) কারওয়ান বাজারের ইলিশের আড়তে সবচেয়ে বড় দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৫০০ টাকা কেজিতে। ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ১১০০ টাকা কেজি ও ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১০০০ থেকে ১০৫০ টাকা কেজিতে। আর ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম পড়ছে হালিতে ৩২০০ থেকে ৩৩০০ টাকা; ৮০০ গ্রামের হালি ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা; ৭০০ গ্রামের ২০০০ টাকা ও ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি ১১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এর আগে, গত শুক্রবার একই বাজারে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছিল ১৮০০ টাকা কেজিতে। ওই দিন ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৪০০ টাকা কেজি ও ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা কেজিতে। সেদিন ৯০০ গ্রাম ওজেনর ইলিশের দাম পড়ে হালিতে ৩৬০০ থেকে ৪০০০ টাকা, ৮০০ গ্রামের হালি ছিল ৩২০০ টাকা, ৭০০ গ্রামের ২৬০০ টাকা, ৬০০ গ্রাম ওজনের ২০০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ সপ্তাহ খানেকরও কম সময়ের ব্যবধানে হালিতে ইলিশের দাম কমেছে অন্তত ৪০০ টাকা।

এদিকে, মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ বাড়ায় কিছুটা কমেছে ইলিশের দাম। ৮০০ ও ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এখন পিস প্রতি ১০০ টাকা কমে পাওয়া যাচ্ছে। তবে বড় ইলিশের দাম এখনও আগের মতোই। এক কেজি ওজনের ইলিশ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

নব্বইয়ের দশক থেকে কারওয়ান বাজারে মাছ বিক্রি করেন খুচরা বিক্রেতা মো. মাছুদ রানা। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর মাছ একটু কম। হালিতেও ইলিশ দুয়েকশ টাকা বেশি। তবে গত কয়েকদিনের চেয়ে এখন ইলিশের দাম কমেছে।’

আরেক খুচরা বিক্রেতা ছালাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের চেয়ে ইলিশের দাম একটু কমেছে, কিন্তু অন্যান্য বছরের চেয়ে এখনও বেশি। কারণ অন্যান্য বছর যে রকম ইলিশ ধরা পড়ে, এ বছর এখনও সেভাবে ধরা পড়েনি। তবে সামনের দিকে দাম আরেকটু কমবে। অভিযানের আগে (৭ অক্টোবর, ইলিশ ধরা বন্ধ হওয়ার আগে) বাজারে ইলিশ বেশি আসবে। তখন মাছের দাম একটু কমতে পারে।’

রাজধানীর মহাখালী, ফার্মগেট ও শান্তিনগরের খুচরা বাজারগুলোতেও দাম প্রায় অভিন্ন।

কারওয়ান বাজারে ইলিশের আড়তদার আছেন অন্তত ৫০ জন। গাজী হিরু অ্যান্ড ফিরোজ ব্রাদার্সের পরিচালক গাজী আল মামুন তাদের একজন। ইলিশের এই পাইকারি বিক্রেতা শুক্রবার (৭ সেপ্টেম্বর) সারাবাংলাকে বলেছিলেন, ‘ভরা মৌসুমে এবার ইলিশ কম আসছে। সাগরে গত বছরের চেয়ে মাছ ধরা পড়ছে অর্ধেকের মতো। তাই ইলিশের দামও গত বছরের দেড়গুণ।’ তবে মঙ্গলবার সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিনের চেয়ে এখন ইলিশের সরবরাহ বেশি। তাই মাছের দামও কমেছে।’

ইলিশের আরেক বড় পাইকারি বিক্রেতা মো. ইশতাক বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘আবহাওয়া খারাপের কারণে এ বছর ইলিশ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। জেলেরা ৩-৪ দিন পরই সাগর থেকে ফিরে আসছেন। ছোট নৌকায় হয়তো কিছুটা সংগ্রহ হচ্ছে। তবে ফিশার বুটের মাধ্যমে তেমন ইলিশ ধরা যাচ্ছে না। যেখানে ঘাটে আগে ১০০ মন ইলিশ পাওয়া যেত, সেখানে ৫০ মন পাওয়া যাচ্ছে। এতে মাছের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। দাম বেশি থাকার কারণ হিসেবে কোনো কোনো বিক্রেতা অবশ্য ‘ইলিশ রফতানির’ অজুহাতও দেখালেন। তবে এ তথ্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছে মৎস অধিদফতর। আর খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ইলিশের দাম আগের চেয়ে এখন অনেক কম।

ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজারে ইলিশ কিনতে এসেছিলেন মো. সোহেল। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে ইলিশের দাম এবার অনেক বেশি। যে ইলিশ ৫০০ টাকায় কেনা যেত, সে ইলিশের দাম এখন ৬০০ টাকা। একই রকম তথ্য জানিয়ে মহাখালীর বউ বাজারে বাজার ইলিশ কিনতে আসা অনিকা দাস বলেন, ‘বছরে একবার তো ইলিশ খাওয়াই লাগে। তাই এক হালি (৮০০ গ্রাম) ইলিশ  কিনতেই ৩ হাজার টাকা চলে গেল।’

এদিকে, প্রতিবছরই দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে বিস্তৃত হয়েছে। পদ্মার শাখানদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড় ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও গত বছর ইলিশ পাওয়া গেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার টন। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিন লাখ ৯৫ হাজার টন ইলিশের উৎপাদন হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে চার লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক স্পর্শ করে বলে মৎস অধিদফতরের দাবি। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ টন ইলিশের উৎপাদন প্রত্যাশা করেছিল মৎস অধিদফতর। আর মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সর্বশেষ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন।

মৎস্য অধিদফতরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা শাখার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (রিজার্ভ) এ বি এম জাহিদ হাবিব সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর ইলিশ কম ধরা পড়ছে তা ঠিক। তবে ইলিশের উৎপাদন কম হবে না। শুধু আগস্টেই ৩৩ হাজার টন ইলিশ ধরা পড়েছে। বছরটিতে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হাবিব আরও  বলেন, ‘দাম বেশি থাকার কারণ হলো সিন্ডিকেট। ইলিশ নিয়ে সব সময় একটি সিন্ডিকেট কাজ করে।’

মাছের বাজার ব্যবস্থাপনা দেখার দায়িত্বে থাকা মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক  (মার্কেটিং) মো. আব্দুল হালিম সরকার এ বিষয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশের সরবরাহ কিছুটা কম। সাগরে মাছ কম ধরা পড়ছে। তবে কোথাও স্টক হয়ে যাচ্ছে— আমাদের কাছে এমন তথ্য নেই।’

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে আব্দুল হালিম বলেন, ‘বাজারে সিন্ডিকেটের কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। তবে চোরাই পথে সবসময় ইলিশ পাচায় হয়। এ বছরও হয়তো পাচার হচ্ছে।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

ভরা মৌসুমেও পড়েনি ইলিশের দাম
ভরা মৌসুমেও পড়েনি ইলিশের দাম