মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

‘ভালো মেয়ে, খারাপ মেয়ে বলার পুলিশ কে?’

অক্টোবর ২৩, ২০১৮ | ৭:২৫ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডন্ট ।।

ঢাকা: পুলিশ চেকপোস্টে ব্যাগ চেক করা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ওই পুলিশ চেকপোস্টে সিএনজি থামানো হলেও ভেতরে থাকা নারীর সঙ্গের ব্যাগটি চেক করেনি পুলিশ। বরং ছয় মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সিএনজি থামানো একাধিক পুলিশ সদস্য সিএনজির ওই নারীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করছেন। এ ঘটনার ধারণ করা ভিডিওতে ওই নারী বারবার তার মুখে আলো না ফেলতে অনুরোধ করলেও তাতে কান দেননি কেউ। বরং ওই নারী ও তার পরিবারকে নিয়েও অশোভন শব্দ ব্যবহার করে গেছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনার ধারণ করা ওই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

নারী অধিকার ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এমন আচরণ সমাজের চিরায়ত চিত্রের প্রতিচ্ছবি। তারা বলছেন, নারীকে শোষণ করার মানসিকতাই পুলিশকে এ কাজে প্ররোচিত করেছে। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের তেমন কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয় না বলেও তারা এ কাজে উৎসাহ পেয়ে থাকতে পারে। কেউ অন্যায় করলে তাকে আইনের আওতায় না এনে এভাবে ভিডিও করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে— তারা সে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা আরও বলেছেন, কে ভালো মেয়ে, কে খারাপ মেয়ে— সেটা বলার পুলিশ কে?

সোমবার (২২ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাকিব রাজ নামে এক পুলিশ সদস্যের ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি একটি গ্রুপে শেয়ার করা হয়। সেখানে রাকিব রাজ ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘দেখুন একজন অসভ্য মেয়ের কারসাজি। আজ রাত (২২ অক্টোবর) ২টায় পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশ চেক করতে চাইলে সে পুলিশের সাথে এইরকম ব্যবহার করে।’ তিনি ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিতেও আহ্বান জানান সবার কাছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে বইছে নিন্দার ঝড়। পুলিশ চেকপোস্টে ব্যাগ চেক না করে একজন নারীকে অত্যন্ত আপত্তিজনক, অসম্মানজনক ও অশ্লীল কথা বলার প্রতিবাদ দেখা যায় সেখানে। যদিও আজ সোমবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর থেকে ‘রাকিব রাজ’ নামের আইডিটি ডিঅ্যাকটিভেট হয়ে আছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা সিএনজিতে থাকা নারীকে বেয়াদব, ভদ্র ঘরের মেয়ে নয়— এ ধরনের আপত্তিকর কথা বলছেন। তার মুখে আলো ফেলে ‘আমি আপনাকে দেখব’ বলেও মন্তব্য করেন তারা। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হবে— এমন হুমকি দিয়ে বলা হয়, কাল কী হয় দেখেন। শেষে যখন ওই নারীকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন সিএনজিচালককে বলা হয়, ওরে রাস্তায় নামায়ে দিয়েন।

এ ঘটনা বিকৃত মানসিকতার উদাহরণ ছাড়া আর কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক। তিনি বলেন, এটা সমাজের সহজাত প্রবৃত্তিরই একটি অংশ। পুলিশ তো আলাদা কিছু নয়। সমাজে মেয়েদের যে দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গী পুলিশও ধারণ করছে।

সব পুরুষই এমন নয় উল্লেখ করে অধ্যাপক তানিয়া বলেন, যারা এ ধরনের মানসিকতা ধারণ করেন, তাদের আলাদা কোনো পরিচয় বা পদ-পদবী নেই। কোনো দায়িত্বশীল পদে থাকলেও তাদের সেই মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গীর কোনো পরিবর্তন হয় না। যে পুলিশ হয়েছে, তার দায়িত্ব-কর্তব্য তো অন্যদের চেয়ে আলাদা হওয়ার কথা। এই বোধই হয়তো তাদের মধ্যে কাজ করে না।

শব্দের ব্যবহার অনেক সময়ই দৃশ্যমান হয়রানির চেয়েও অনেক বেশি ক্রিমিনাল অফেন্স, আমাদের সমাজে সেই বিষয়টি এখনও স্বীকৃত নয় বলে জানান অধ্যাপক তানিয়া। তিনি বলেন, গায়ের জোরে কেউ কাউকে থাপ্পড় মারলে তাকে আমরা লোকেট করি। কিন্তু কথা দিয়ে একজন মানুষকে তারচেয়েও বেশি আঘাত করা হলো, কিংবা নির্যাতন করা হলো— সে বিষয়গুলো আমাদের সমাজে এখনও অনুচ্চারিত। কিন্তু এ বিষয় নিয়েও আওয়াজ তোলা জরুরি।

একইসঙ্গে পুলিশের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, রাতে কাজ করা মেয়েরা ‘ভালো না’— সমাজের এই বেঁধে দেওয়া ধারণা পুলিশ সদস্যদেরকে আরও সাহস দিয়েছে, যেটা তার এখতিয়ার বহির্ভূত। যেসব পুলিশ সদস্যকে চেকপোস্টের ডিউটি দেওয়া হয়, তাদের কি প্রশিক্ষণে এসব শেখানো হয়েছিল? একজন নারী ভালো না খারাপ— সেটা বলার পুলিশ কে? ঘটনাস্থলে যে যে দায়িত্বরত ছিল, তাদের প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

জানতে চাইলে উন্নয়নকর্মী ফারহানা হাফিজ সারাবাংলাকে বলেন, পুলিশ এটা সবসময় করে। আমরা কিছু ডক্যুমেন্টারিও করেছিলাম এ নিয়ে। রাতের বেলায় চেকপোস্টগুলোতে সিরিউরিটি চেকিংয়ের নামে হ্যারাস করা নতুন নয়। কিন্তু পরে অভিযোগ করে দেখা গেছে, পুলিশ বলেছে, সে সময় সেই নামে সেখানে কোনো পুলিশ ছিল না। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

‘এটা তাদের আস্ফালন ও হঠকারিতা। তারা ধরেই নেয়, এ ধরনের কাজ করে পার পেয়ে যাবে এবং এ শক্তিই তাদের এ ধরনের কাজ করতে শক্তি জোগায়। কারণ কোথাও বিচার নেই। তাদের সামনে এ ধরনের কোনো উদাহরণ নেই যে মেয়েদের সঙ্গে এ ধরনের কার করে কেউ শাস্তি পেয়েছে,’— বলেন তিনি।

পুলিশ মানেই ক্ষমতা— এ ধরনের একটি মনোভাবও আমাদের কাজ করে উল্লেখ করে ফারহানা হাফিজ আরও বলেন, এ মনোভাবের কারণেই তারা যেকোনো কিছু করার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করে। তার নারীকে শাসন করে অভ্যস্ত, চোখ রাঙিয়ে অভ্যস্ত— এ মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ এ ভিডিও।

চিকিৎসক ও শিল্পী গুলজার হোসেন উজ্জ্বল ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এভাবে ভিডিও করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? পুলিশের আচরণ পুরোই অপেশাদার। মাঝ রাতে কোনো মেয়ে বাইরে থাকতে পারবে না— এমন কোনো আইন কি বাংলাদেশে আছে? ‘তাকে অপমান করার অধিকার কি পুলিশ রাখে?’—    প্রশ্ন রাখেন তিনি।

নারী বা পুরুষ— কাউকেই এভাবে হেনস্থা করার অধিকার পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নেই উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান সারাবাংলাকে বলেন, রাতের বেলা একজন নারী বাইরে রয়েছেন মানেই তিনি খারাপ। এমন একটি নেতিবাচক মনোভাব আমাদের সমাজে যেন প্রোথিত হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, একজন নারী রাতে কী করছেন, সেটা দেখা তো পুলিশের কাজ না। যিনি যাচ্ছেন, নিরাপদে যাচ্ছেন কিনা— সেটাই বরং পুলিশের ভূমিকা হওয়ার কথা। পথচারী একজন কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, কিভাবে যাচ্ছেন— সেটা তো তার দেখার বিষয় না। তার দেখার বিষয়, ওই ব্যক্তি কোনো অপরাধমূলক কাজ করছেন কি না, সেটা দেখা তার দায়িত্ব। সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ অবশ্যই তল্লাশি করতে পারে। কিন্তু ভিডিও ধারণ করা, সামাজিকভাবে হেনস্থা করা— এটা করার কোনো অধিকার তার নেই।

রাতেও নারীরা কাজের সূত্রে বাইরে থাকতে পারেন উল্লেখ করে রাশেদা রওনক বলেন, একজন নারী হয়তো চিকিৎসক বা সেবিকা। কেউ হয়তো রোগীকে দেখার জন্য হাসপাতালে যেতে পারেন বা জরুরি চিকিৎসা নিয়ে নিজেও ফিরতে পারেন হাসপাতাল থেকে। তো এসব প্রয়োজন বা কাজকে যদি একজন নারীর পরিবার তার দায়িত্ব মনে করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন সেটাকে অন্যভাবে দেখবেন? আর কোনো নারী হয়তো প্রচলিত অর্থে অবাঞ্ছিত পেশাতেও নিয়োজিত থাকতে পারেন, সে কারণেও তাকে রাতে বাইরে বের হতে পারে। কিন্তু সেটাও তো তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ। তার জন্য তাকে হেনস্থা করার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক স্পষ্টভাবে বলেন, নারী হোক বা পুরুষ— কাউকে অযথা হেনস্থা করা কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার অধিকার কারও নেই। আর পুলিশ তো একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তো সেটা কোনোভাবেই করতে পারেন না।

জানতে চাইলে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলরুবা সারমিন সারাবাংলাকে বলেন, সিএনজি থামিয়ে একজন নারী রাত আড়াইটায় কোথায় যাচ্ছেন বা ভালো মেয়েরা এত রাতে বের হয় না— এসব কথা পুলিশ সদস্যরা যে বলেছেন, সেগুলো অত্যন্ত আপত্তিকর ও অসম্মানজনক। পুলিশকে জনগণের বন্ধু ও সেবক বলা হয়। সেই পুলিশ কেমন করে একজন নাগরিককে এসব কথা বলতে পারে? কে ভালো মেয়ে, কে খারাপ মেয়ে— সেটা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের কে দিয়েছে? তাদের এ শক্তি কোথা থেকে এলো— সেটাও দেখা দরকার।

মানবাধিকারকর্মী দিলরুবা আরও বলেন, পুলিশ যেহেতু রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনী, তাই আমি বলব— এই নারীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আঘাত করা হয়েছে। তাহলে এই পুলিশ বাহিনীকে গ্রেফতার কে করবে, কোন আইনে মামলা হবে, মামলার বাদী কে হবে— এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। যেখানে তাদের হাতে জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব, সেখানে তারা মানুষকে হয়রানি করে সে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুকে!

‘রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি এর কোনো প্রতিকার না হয়, তাহলে দেশের প্রতিটি মানুষই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে বলেই আমরা বলব। দ্রুততম সময়ে এসব পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করে এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যেন আর কখনও কোনো নারীকে এভাবে অসম্মানের শিকার না হতে হয়,’— বলেন দিলরুবা।

এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না— জানতে চেয়ে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এডিসি মো. নাজমুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

সেখানে এডিসি নাজমুল লিখেছেন, পুলিশের চেকপোস্টে গভীর রাতে একজন নারীর সঙ্গে কিছু পুলিশ সদস্যের ভিডিওসহ কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে একটি পেশাদার সেবাদাতা সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ উদ্বিগ্ন (কনর্সাড)। এ নিয়ে অনলাইনে ঘৃণাবোধ না ছড়ানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।

নিরপেক্ষ ও সঠিক অনুসন্ধানসাপেক্ষে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে এডিসি নাজমুল সবাইকে পুলিশের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

সারাবাংলা/জেএ/টিআর

Tags: ,

‘ভালো মেয়ে, খারাপ মেয়ে বলার পুলিশ কে?’
‘ভালো মেয়ে, খারাপ মেয়ে বলার পুলিশ কে?’
‘ভালো মেয়ে, খারাপ মেয়ে বলার পুলিশ কে?’