শনিবার ২৬ মে, ২০১৮ , ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১০ রমযান, ১৪৩৯

‘ভ্যাট আদায় করতে চাইলে বৈধ লেনদেন ব্যবস্থা প্রয়োজন’

মে ১৬, ২০১৮ | ৩:০৫ অপরাহ্ণ

।। এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: বৈধ লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের (ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউব) বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ভ্যাট আদায় করতে চাইলে প্রথমে বৈধ গেটওয়ে (লেনদেন ব্যবস্থা) প্রয়োজন। অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিস দেশেই থাকতে হবে। বর্তমানে এর কোনোটিই নেই।

সম্প্রতি এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনার কথা জানান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। পরে প্রতিষ্ঠানগুলোগুলোর অফিস দেশে না থাকায় আগের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর ভ্যাট বসানোর কথা জানান। তবে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি এখনও জানে না, ঠিক কী উপায়ে ভ্যাট আদায় করা হবে।

জানা গেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে কিনা, তা জানতে চেয়ে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) ভ্যাট শাখাকে চিঠি দেয় এনবিআর। পরে বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটতে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়ার কথা সারাবাংলাকে জানান এলটিইউ কমিশনার মো. মতিউর রহমান। এনবিআরের মূসক নীতি ও এলটিইউ (ভ্যাট) শাখায় কথা বলে জানা গেছে, করের আওতায় আনার কথা বা ভ্যাট কাটার নির্দেশনার মাধ্যমে মূলত প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাকে কর ও ভ্যাটের আওতায় আনার পথ খোঁজা হচ্ছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লেনদেন পদ্ধতি

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অধিকাংশ লেনদেনই আন্তর্জাতিক কার্ডে (পেপ্যাল, পেওনিয়ার) হয়। তবে দেশের কিছু ক্রেডিট কার্ডেও লেনদেন হয়ে থাকে। ফেসবুক বা গুগলে দেওয়া বিজ্ঞাপনের অর্থ আন্তর্জাতিক কার্ডে লেনদেন হওয়ায় এখন পর্যন্ত কারো কাছ থেকে ভ্যাট কাটা হয়নি বলেও জানা গেছে।

ইয়ুথ ফায়ার আইটি’র প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানিক চন্দ্র ধর সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনলাইনে লেনদেনের ক্ষেত্রে ডুয়েল কারেন্সি অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় যে ধরনের কার্ড রয়েছে, নানা শর্তের বেড়াজালে তা পাওয়া কঠিন। তবে অনলাইনেই কিছু আন্তর্জাতিক কার্ড (পেওনিয়ার, পেপ্যাল) পাওয়া যায়। এ কার্ডগুলোর লেনদেনের নীতি সম্পূর্ণই আন্তর্জাতিক। অধিকাংশ লেনদেনের ক্ষেত্রে আলাদা কোনো চার্জ বা ভ্যাট কাটা হয় না। আর এসব কার্ডের সঙ্গে দেশের ব্যাংকেরও কোনো সম্পর্ক নেই।’ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত ওবায়দুল ইসলাম রাব্বীও একই ধরনের তথ্য জানান।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফেসবুক বা গুগলকে সরাসরি ধরা যাচ্ছে না। তাই আমাদের এখানে যে মার্কেটিং এজেন্সি আছে, তাদের ধরা গেলে হয়তো কিছুটা ভ্যাট আসতে পারে।’ আর বেসিসের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারহানা এ রহমানের মতে, ‘বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর ভ্যাট বসানো তখনই সম্ভব হবে সরকার যখন লিগ্যাল পথে বিজ্ঞাপন দেওয়ার চ্যানেল তৈরি করে দেবে। এছাড়া ফেসবুক বা গুগল যদি বাংলাদেশে অফিস খোলে তাহলেও কর বসানো সম্ভব।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘সবার জন্যই সমানভাবে কর প্রযোজ্য, সেটা অ্যানালগ মাধ্যম হোক কিংবা ডিজিটাল। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতাকেই কর দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের কার্ডের মাধ্যমেও বিজ্ঞাপনের টাকা লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। বেসিসের কিছু কার্ড রয়েছে যার মাধ্যমে ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত লেনদেন করা সম্ভব। এছাড়া বেসিস সদস্যদের নিজস্ব কার্ডেও লেনদেন হয়ে থাকে।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে কর আরোপ করে সেই কর আদায় করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হবে। তারা যত ডিজিটাল হবে, তাদের জন্য এ পদ্ধতিতে কর আদায় করা তত সহজ হবে।’

এনবিআরের ভ্যাট নীতির সদস্য রেজাউল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফেসবুক ও গুগলের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কিভাবে কর বসানো যায় সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। বিষয়টি এখনও যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার পর্যায়ে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞাপনদাতা বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে মানুষ কী বলে তা জানার জন্যে। হয়তো আসছে বাজেটের প্রস্তাবে বিষয়টি থাকতে পারে। তবে আইসিটি মন্ত্রণালয় ও আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেই মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তবে এলটিইউ মূসক কমিশনার মো. মতিউর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক কার্ডগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই টাকা যায়। গুগল বা ফেসবুককে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক হয়ে টাকা গেলে আমরা তাতে ভ্যাট কাটার কথা বলেছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি বৈধ পথে লেনদেন না হয় সেটা মানি-লন্ডারিং হবে। আর মানি-লন্ডারিংয়ের টাকাটা তো আর আমরা ভ্যাটের আওতায় আনতে পারব না। আমরা বলেছি, যেটা বৈধ উপায়ে যাবে (ব্যাংকের মাধ্যমে), সেখানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাটার কথা বলেছি। নির্দেশনাটি চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর হয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহিন এম রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধের জন্য দেশে কোনো বৈধ উপায় নেই। এর ৯০ শতাংশ লেনদেনই হুন্ডি বা অবৈধ পথে হয়ে থাকে। ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন সেবার নামে বছরে ১২০০ থেকে ১৩০০ কোটি টাকা মানি-লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটাকে বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের কারো কোনো পদক্ষেপ নেই।’

তিনি বলেন, ‘ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, নেটফ্লিক্সে গত অর্থবছরে ১২০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এই অর্থটি অবশ্যই অনেক বড় অঙ্ক। এটি কোনোভাবেই ট্রাভেল কোটায় অর্থাৎ ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এখানে অবশ্যই হুন্ডি হচ্ছে। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী আছেন, যারা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ডলার পরিশোধ করে থাকে।’

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার ওপর কর বসা উচিত— এমন প্রশ্নের জবাবে এই আইনজীবী বলেন, ‘বিজ্ঞাপনদাতা নয়, কর আদায় করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। ভোক্তাকে ধরলে হবে না। আগে ধরতে হবে যারা টাকাটা নিচ্ছে। তাদের একটি অফিসও নেই। তাদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। দেশে কোনো এজেন্ট নেই। অথচ বছরে তারা হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। যখন সরকারের পক্ষ থেকে মানিল্ডারিং’র অভিযোগ আনা হবে, তখন তারা দেশে অফিস করতে বাধ্য হবে। আর তখনই বৈধ উপায়ে লেনদেন সম্ভব হবে।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/জেএএম

আরও পড়ুন-

ফেসবুক-গুগলের বিজ্ঞাপন থেকে ভ্যাট কাটার নির্দেশ

আরও পড়ুন