বুধবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ , ১২ বৈশাখ, ১৪২৫, ৮ শাবান, ১৪৩৯

ভয় দেখিয়ে লাভ নেই- এ লড়াই অনিবার্য! 

ডিসেম্বর ২৪, ২০১৭ | ১২:২৯ অপরাহ্ণ

 

পুরুষের এই সমাজে নারীর প্রতি বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন আর নির্যাতনের প্রতিবাদে কথা বললে বেশিরভাগ পুরুষ প্রতিক্রিয়া করে, প্রত্যেকেই মনে করে তার দিকেই বুঝি আঙ্গুল তুলেছি আমরা। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বললে পুরুষরা একাট্টা হয়ে দল পাকায়। এই দেশে নারী ধর্ষণ থেকে বাঁচার জন্য ধর্ষকের লিঙ্গ কেটে দিলে সব ‘পুরুষ’রা ব্যথা পায়। তো, সেই সমাজে বসে কিছু নারী নারীবাদের মতো আন্দোলন করে যাবে, নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াইটা ঘরে বাইরে চালিয়ে যাবে, পুরুষের বানানো প্রথা নিয়ম কানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাবে, নিজেরা সংগঠিত হবে, এর চাইতে ভয়ঙ্কর ঘটনা আর কি আছে? তাই পুরুষতন্ত্র খড়গ হাতে নেয়। এই মেয়েদের থামাতে হবে।

এই এক ইস্যুতে আস্তিক-নাস্তিক, হুজুর-বেহুজুর, হেফাজত-আওয়ামীলীগ-বিএনপি, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত-মূর্খ-জ্ঞানী-সাহেব-মোসাহেব সবাই একজোট। সবাই মিলে ঠিক করেন নারীবাদের লড়াইটাকে বিতর্কিত করতে হবে, প্রোপাগান্ডা চালাতে হবে। তারা করে কি, নারীবাদ নিয়ে বস্তাপচা পুরোনো বিতর্কগুলো আবার নতুন বোতলে হাজির করে। এই যেমন, নারীবাদীরা যৌন স্বাধীনতা চায়, ডিভোর্স প্রমোট করে, বাচ্চা নিতে চায়না, পুরুষবিদ্বেষী, ঝগড়াটে, মেয়েলি(?) কাজ ঘৃণা করে, পুরুষ হতে চায়, নারীবাদ আসলে পুরুষতন্ত্রেরই আরেক রূপ(!!), নারীবাদীরা আমেরিকার দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব করার জন্য পুরুষরা তো আছেনই, সাথে তারা তৈরি করেন একদল সুবিধাভোগী নারীগোষ্ঠী যারা তাদের এসব প্রচারনাকে এস্টাবলিস্ট করে, পুরুষতন্ত্রের পা ধোয়া পানি খেয়ে ‘জয় বাবা পুরুষতন্ত্র’ বলে নারীবাদীদের গুষ্ঠি উদ্ধার করেন।

তবে এই কৌশলগুলো বেশী পুরোনো হয়ে যাওয়ার কারনে আজকাল মেয়েরা এসব তেমন পাত্তা দেয়না। সুতরাং তাদের কৌশল পালটাতে হয়। এখন তারা করে কি, গান্ধা গান্ধা অনলাইন পোর্টাল খুলে নারীবাদী লেখকদের লেখা চুরি করে, শিরোনাম পালটে দিয়ে বিতর্কিত করে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরী করে। অতঃপর ‘সমগ্র পুরুষতন্ত্র দশটন’ হয়ে লুঙ্গি কাছা খুলে বসে পড়ে নারীবাদীদের চরিত্র হনন করতে। তারপর ভরপেট খেয়ে, ভাতঘুম দিয়ে নারীবাদী লেখকদের ফেসবুক একাউন্ট ঘেটে ঘেটে কে কতটুকু স্বল্প পোশাক পরলো, কে কখন সিগারেট খেল, কে ঢাকা ক্লাবে গিয়ে মদ খেলো, কে কার সিগনেচার কোথায় ট্যাটু করলো, কে কার সাথে প্রেম করলো, কে কোন সাইজের টিপ পরলো, কার গায়ে মেদ আছে, কে বিগত যৌবনা, ইত্যাদি গবেষণা করে ছবি সংগ্রহ করে ভাইরাল করে দেয়।

কিন্তু নারীবাদ চর্চা যারা করে তাদের নার্ভ অন্যদের চাইতে আলাদা বলেই তাদের এসব কৌশলও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনা। তারা জানেন না, এই পুরুষতন্ত্রের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে, পুরুষের বানানো বিশ্বাস, সংস্কার, চর্চা আর নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করার ঝুঁকিটা আমরা জেনে বুঝেই নিয়েছি। নারীবাদ চর্চার এই পথ ফুল বিছানো নয়, এই পথ বন্ধুর, বেদনার, কাঁটা ছড়ানো মেনেই পথে নেমেছি। কারন, আমরা জানি দিনের শেষে এই পথই আমাদের মুক্তির পথ। অনেক দম থাকলে, অনেক ত্যাজ থাকলেই কেবল মুক্তির এই পথে হাঁটা যায়। সেই দম, সেই উদ্যম, সেই মনোবল এখন আপনাদের ওই বস্তাপচা ছাতাপড়া অস্ত্র আর চরিত্রহননের ভয় দেখিয়ে দিয়ে ভেঙ্গে দিবেন ? ফুঃ!

এই যে, একাট্টা হওয়া পুরুষরা শোনেন, যতই পেছনে ছুরি মারেন না কেন, আমাদের এই লড়াই কিন্তু খুব নিভৃতে আপনাদের ঘরের ভেতরে ভেতরেও শুরু হয়ে গেছে। পুরুষাধিপত্যের ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে অনিবার্যভাবেই সবার আগে নিজেদের বাবা ভাই বন্ধু স্বামী পুত্রদের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে হয়, বিচ্ছিন্ন হতে হয়, সেটা জেনেও এখন মেয়েরা একান্ত সম্পর্কগুলোর ভেতরেই পুরুষের শ্রেষ্টত্ব এবং আধিপত্যের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। নিজেদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচরনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে করে নারীবাদের যন্ত্রণাময় পথে হাঁটতে শিখে গেছে। এই বিরোধ মিমাংসা থেকেই একদিন নারীর সঙ্গে পুরুষের, নারীর সঙ্গে নারীর নতুন বোঝাপড়া ও সমঝোতার পথ তৈরি হবে মনে রাখবেন।

হ্যাঁ, আমরা সংখ্যায় অল্প। মুক্তির লড়াই অল্প ক’জনই করে। কিন্তু আত্মিক শক্তিতে আমরা শত, হাজার, লক্ষ। কারন,  নারীবাদ আমাদের কাছে শুধু একটি আন্দোলনই নয়, বরং এটি আমাদের এমন এক আত্মিক যোগাযোগ যার মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বনারীদের আত্মত্যাগ, আর্তচিৎকার আর বলিদানকে বোঝার মাধ্যমে হাতে হাত ধরে দাঁড়ানোর বিশ্বাস দিয়েছে। যে চোরাবালিতে আমরা কেউ গলা, কেউ হাঁটু, কেউ কোমর পর্যন্ত ডুবে আছি, তাকে অনুভব করতে পেরেছি বিশ্বের সব বঞ্চিত নারীর অনুভূতিতে। এটি আমাদের কাছে এমন একটি রাজনৈতিক চর্চা, যা পুরুষতন্ত্রের তৈরি সমস্ত পক্ষপাতমুলক নিয়মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে এবং ধর্ম বর্ণ শ্রেণি নির্বিশেষে সকল নারী পুরুষকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম করে।

নারীবাদ মানে আমাদের মায়েদের উদায়স্ত বিনাশ্রম মজুরী, বোনদের দাসজীবনের আর্তি, জীবন্ত কবর দেয়া কন্যাদের, সহমরনের চিতায় পোড়ানো নারীদের, সতিচ্ছদ আর ভঙ্গাঙ্কুর কাটা কিশোরীদের আর্তচিতকারের ইতিহাস। নারীবাদ মানে ধর্ষিত মেয়েদের চিৎকার, এসিডে ঝলসে যাওয়া মুখগুলোর আমৃত্যু যন্ত্রণার ভাষা। ধর্ষনের ভয়ে নিরন্তর গুটিয়ে থাকা আমাদের কন্যাদের জীবনের দাম, সন্তান জন্মের ভয়ে গর্ভপাত করতে বাধ্য হওয়া মায়ের নিরব কান্নার দহন, গর্ভজাত সন্তানের অধিকার বঞ্চিত মায়ের অসম্মান আর বঞ্চনাকে ভাষা দিতেই আমরা নারীবাদের গান গাই। নারীবাদের চর্চা করি বলেই আমরা গার্মেন্টস চাতাল ইটখোলায় কাজ করা নারীশ্রমিকের সমান মজুরির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াই, যৌনপল্লিতে যৌন সেবা দিতে বাধ্য হওয়া মেয়েটির জীবনের, পূজা নামের শিশুকন্যার ছিন্নভিন্ন যোনীর হিস্যা বুঝে নেই আমরা।

অধিকার আদায়ের এই লড়াই নিরাপদে স্নান করার চৌবাচ্চা যে নয়, মুক্তি মানে যে উত্তাল সমুদ্র তা আমাদের চাইতে ভালো আর কে জানে? প্রতিনিয়ত কুমির হাঙ্গরের সাথে লড়ে সে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়। সেই ঝুঁকি নিয়েই আমরা বর্জন করেছি নিয়ন্ত্রণ, অপমান, বঞ্চনা আর আপোসের মোহঘুম। তাই নিজেদের খনন করে আমরা দেখতে পাই কী অপরিসীম ক্ষমতা ও শক্তি ঘুমিয়ে আছে আমাদের আত্মায়। সেই শক্তিতেই প্রবল তাচ্ছিল্যে, অবজ্ঞায়, উন্নাসিকতায় আপনাদের ওই আধিপত্যবাদী পুরুষতন্ত্রের ফাঁপা সাম্রাজ্যবাদ লন্ডভন্ড করে দিতে আমরা প্রস্তুত। আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।

যে কোন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ নিশ্চিত করতে হয়। তাই নারীর অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ের নিশ্চিত প্রতিপক্ষ হিসেবে আপনারা দাঁড়িয়ে গেছেন আমাদের সামনে, এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই। তাই আমরা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবখানেই পুরুষতন্ত্রের নীল নকশায় তৈরি লৈঙ্গিক রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করি। আমরা প্রশ্ন তুলি করি সেসব প্রথা নিয়ম কানুন, আইন, ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র নিয়ে যা পুরুষতন্ত্রের ক্ষমতা আর আধিপত্যের জমিনকে পোক্ত করে। আমরা লিখে যাই, একই কথা বারবার বলে যাই, পুণঃ পুণঃ আঘাত করি পুরুষতন্ত্রের অচলায়তনে। কারন, অধিকারবোধ বা চেতনার জাগরন সীমান্ত পেরোনোর মতো সহজ নয়। নারী যতদিন নিজের কথা নিজে না লিখবে, নিজের প্রথা নিজে না তৈরি করবে ততোদিন সে জাগরন আসবেনা। শর্টকাট চোরাপথ দিয়ে কখনো মুক্তি আসেনা।

এটা সমুখ সমর। অবধারিতভাবেই লড়াইয়ের এই পথ কন্টকময়, কলঙ্কিত এবং বন্ধুর। তবু, দিনশেষে আমরা জানি একদিন এই বিশ্ব বদলাবে। এই বদল ঘটাবে আমাদের সন্তানরাই। লিঙ্গ রাজনীতির চোরাগলি পেরিয়ে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে মানুষ হয়ে আলোর মহাসড়কে আসবে আমাদের পুত্র কন্যারা। হাজার বছরের লিঙ্গ রাজনীতির মসনদ গুঁড়িয়ে দিয়ে একদিন মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠবে এই বিশ্বে। সেদিনের জন্য আমাদের আজকের এই লড়াইটা অনিবার্য। আমরা জানি, নতুন প্রাণের আবির্ভাবের জন্য পুরোনো বীজকে ভাঙ্গতে হয়।

বেদনা ছাড়া সন্তান প্রসব হয়না, এ কথা জেনেই আমরা পরিবর্তনের এই যন্ত্রণাকে স্বীকার করে নিয়েছি। নতুন দিনের জন্য এই বেদনাকে আমরা বারবারই আলিঙ্গন করতে চাই।

 

[রোকেয়া সরণি কলামে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত]

 

সারাবাংলা/এসএস

 

Tags:

আরও পড়ুন