বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৪ আশ্বিন, ১৪২৫, ৭ মুহররম, ১৪৪০

মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ ভাস্কর শিল্পী শামীমের সঙ্গে কথপোকথন

এপ্রিল ১৪, ২০১৮ | ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

।।হাসান আজাদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।
ভার্স্কয শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম। বয়স ৫৭। যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। আজ থেকে ৩৩ বছর আগে যশোরে প্রথমবারের মত দেশে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন হয়। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এই ভার্স্কয শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম। তার এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এবং শিল্পী এস এম সুলতান। সুলতান ছিলেন তাঁর  দীক্ষাগুরু। এই দুজনেরই ইচ্ছা ছিল শিল্পকে দেশময় ছড়িয়ে দেয়া। সেই চিন্তা থেকে ঢাকা চারুকলা ইনষ্টিটিউটের ছাত্র হয়েও নিজের শিল্প চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে, প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে ফিরে যান জন্মস্থান যশোরে। গড়ে তোলের চারুপীঠ নামে সংগঠন।
ওই সময় কেমন করে মঙ্গল শোভাযাত্রা’র আয়োজন শুরু হয়েছিল, পেছনের অনুপ্রেরণা, কাজের মাধ্যমসহ নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলাপ করেন এই গুনী শিল্পী। শুরু তাই নয়, ১৯৯০ সালে ময়মসসিংহের ছেলে বিপুল শাহ্,লিংকন এবং বরিশালের আমিনুল হাসান ও সুভ্রতদের উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন নিজ নিজ জেলায় ফিরে গিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত করতে।

মাহবুব জামাল শামীমের সঙ্গে সারাবাংলা.নেট’র কথা হয় তার রাজধানীর ধানমণ্ডির লেকের পাড়ে বসে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সারাবাংলার স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট হাসান আজাদ। বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো।

সারাবাংলা: একজন শিল্পী হয়ে ওঠার ইতিহাসটাই প্রথম জানতে চাই।
মাহবুব জামাল শামীম: আমি শৈশবে আমাদের দেশের বড় শিল্পী এস এম সুলতানের ছাত্র ছিলাম। উনি ছবি আঁকার সাথে সাথে দেশবোধ,ঐতিহ্যবোধ আর দেশ গড়ার মন্ত্রণায় আমাদের উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন। তাতে উদ্ভুদ্ধ হয়েই আমি চারুকলা ইনিষ্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলাম। তবে আবার ফিরে যেতে হবে নিজ জেলায়, একটা প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, এরকম নিয়ত নিয়েই ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৭৯ সালে…।
সারাবাংলা: তখনতো এটি ঢাকা আর্ট কলেজ ছিল…
মাহবুব জামাল শামীম : হ্যাঁ, ১৯৭৯ সালে তখন ঢাকা আর্ট কলেজ ছিল। জয়নুল আবেদীনের সেই আর্ট কলেজ। আমি সেই আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে এল।  এখানে এসে জয়নুল আবেদীনের প্রতিষ্ঠানে পড়ছি… সে ভাবনা থেকে দেশ গড়ায় উদ্বুদ্ধ হই। এর মানে শিল্পকে শুধু শিল্প চর্চায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় পরিণত করতেও সচেষ্ট ছিলাম। শিল্পাচার্যের চিন্তার সংস্পর্শে এসেই আমাদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে যখনই ব্যাচেলার ডিগ্রি শেষ হলো তোড়জোর শুরু করলাম জন্মভুমে ফিরে যাবার। একটাই কারণ, ততদিনে রাজধানী কেন্দ্রিক শিল্প চর্চা বেড়েই চলছিলো। সকল শিল্প আন্দোলনও ছিলো রাজধানী কেন্দ্রিক। আমরা সব মানুষের জীবনে শিল্প চর্চা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। দেশের সব কয়টা জেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়াই হলো আমাদের প্রত্যয়। ফিরে যাব সে চিন্তা আগেই ছিল। আর চারুকলায় পড়তে পড়তে সে চিন্তা আরও জোরালো হল। ম্যচিরিউটি আসলো। চিন্তা করলাম রাজধানীতে শিল্প চর্চা হচ্ছে- আর বিপরীতে সমস্ত দেশ শিল্পের বাইরে রয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনও রাজধানীর বাইরে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছিলেন। তিনিও ঠিক করেছিলেন ময়মনসিংহে চলে যাবেন। ওই সময় তিনিও বলেছিলেন, এবার সমস্ত দেশ শিল্পের আওতায় আসুক, সমস্ত জীবন শিল্পের আওতায় আসুক। শিল্প চর্চার আওতায় আসুক। আর এস এম সুলতান তো নড়াইলেই বসেছিলেন। আমার গুরু। তিনিও আহবান করছিলেন, ফিরে আসো, ফিরে আসো। এই ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি, জয়নুল আবেদীন তো এক প্রজন্ম পারবেন না। আরেক প্রজন্ম আমরা সেই কাজটাই ঝাপিয়ে পড়ি। বেশ কঠিন কাজটা, সমস্ত দেশ, সমস্ত জাতি, সমস্ত জীবনকে শিল্পচর্চা ভেতরে নিয়ে আসা সহজ কথা না।
সারাবাংলা: আশির দশকের শুরুতে অনেকেই শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতেও আগ্রহী হয়ে উঠে। দেশের অনেক স্থানে শিল্প সংস্কৃতি চর্চার জন্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছিল।
মাহবুব জামাল শামীম : ওই সময় আমরা আমাদের প্রজন্ম সমস্ত দেশে প্রতিষ্ঠানটা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবখানে তো আবার আমরা পারবো না। এজন্য আমরা একটা জেলা বেছে নিলাম। সেটি যশোর জেলা। আমরা চারুপীঠ প্রতিষ্ঠা করলাম। সেটা ১৯৮৫ সাল। আমি কেবল বিএফএ পাশ করেছি। এর পরপরই চলে গেলাম। তখন এরশাদ সরকারে নানা কারণেই ইউনির্ভাসিটি গুলো বন্ধ থাকতো। সে অন্য ইতিহাস। তো যশোর আমার জন্মভুমি। ভেবেছিলাম এই কাজে যশোরে অনেক সহযোগিতা পাব। এখানে কালচারাল অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ছিল। অনেক সহজে কাজ করতে পারবো। এই কারণে আসলে যশোরে ফিরে যাওয়া। প্রতিষ্ঠানের মত বড় কাজ করতে গেলে এখানে কর্মসুচি কি হবে, বাস্তব কর্মসুচি।
সারাবাংলা : ওই সময়তো রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প চর্চার অনুকুলে ছিল না, তারপরেও শুরু করলেন কিভাবে?
মাহবুব জামাল শামীম : এটা ঠিক রাজনীতি ওই সময় আমাদের পেছনে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে অন্ধকার থেকেই আলোর যাত্রা শুরু হয়। অন্ধকার সময় হলেও আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে এনেছিল।  জানেনইতো আমাদের সমাজ শিল্পবিমুখ। আমাদের দেশের মুসলমান বাঙালীরা শিল্পের সবকিছু দিয়ে ফেলেছে হিন্দুদের। আর মুসলমানরা সব শিল্প চর্চায় বিমুখ হয়ে পড়েছিল। এরকম একটা অবস্থা। শিল্পবিমুখ একটা জাতি। নাচতে পারি নাই, প্রাণ খুলে হাসতে পারি নাই। গাইতে পারি নাই। ভিজ্যুয়াল আর্টের সব বিষয়গুলো বারণের ভিতরে ছিল। তখন কত না কঠিন সময়। বৈরি সমাজে শিল্প চর্চা কিভাবে সম্ভব?
সারাবাংলা : তো শুরু প্রক্রিয়াটা কি ছিল?
মাহবুব জামাল শামীম : তখনই আমরা বুঝতে পারলাম যে, শিল্প চর্চার উর্বর ক্ষেত্র শিশুরা হতে পারে। এ নিয়ে একটা ঠিক সিদ্ধান্ত হয়ত আমরা নিয়েছিলাম। সঠিক কর্মসুচি। শুরুতেই আমরা শিশুদের জন্য বড় কলেবরে, শিল্প চর্চার সকল মাধ্যম রেখে উন্মুক্ত একটা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলাম। নাম বিদ্যাপীঠ। এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় না, বেতন দিতে হয় না, রঙ, কাঁদামাটি সবকিছু ফ্রি পেত। তাই শিশুরা এই খেলাঘরে আসতে, আঁকাগড়ার খেলা ঘর, শুধু ছবি আঁকা না, সমস্ত ক্রিয়েটিভ মাধ্যমে কাজ করার সুবিধা রাখা হয়েছিল। এখানে একটা কনজারভেটিভ, ধার্মিকের সন্তান যেমন পালিয়ে খেলাঘরে আসতে পারছে। কারণ ভর্তির জন্য টাকা  লাগছে না। বস্তির ছেলেটাও পারছে, মেয়েটাও পারছে। রুটির দোকানে একটা মেয়ে কাজ করতো। মেয়েটা ভারি ক্রিয়েটিভ ছিল। ভীষণ ক্রিয়েটিভ। ও এই খেলা ঘরে অংশ নিতে পারলো। পারলো জেলা প্রশাসকের ছেলে। সবাই আসতে পারতো। এরকমই একটি স্কুল আমরা প্রতিষ্ঠা করলাম। প্রাণদীপ্ত সেই সব শিশুদের নিয়ে আমাদের দ্বিতীয় কর্মসুচি আমরা হাতে নিলাম।
তখন গুনহীন, শিল্পবার্জিত এক জড়তায় বন্দি আমাদের সমাজটা। আমরা বলি জড়তায় বন্দি স্বাধীনতা, স্বাধীন হয়েও আমাদের স্বাধীনতা বন্দি হচ্ছে। সব মেলা, সব পার্বন,পুতুল সব ঐতিহ্য একেবারে হিন্দুদের দিয়ে নিঃস্ব এক জাতি আমরা মুসলমানরা। আমরা তো জীবনে সব শিল্পকে চাই। শিল্প মানেই কেবল চারুকলাকে না, দৃশ্যমান শিল্পের সমস্ত আঙ্গিকগুলো যেমন চাই, চাই নৃত্য, চাই গীত আর বাঙালি ঐতিহ্যের সবকিছু ফিরে পেতে চাই। কিন্তু ফিরে পাবার পথ কি? এই পথের জন্য আমরা নির্ধারন করলাম, আমরা উৎসব করবো। মঙ্গল শোভাযাত্রার উৎসব করবো।
সারাবাংলা: শুরুটা কি মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা ছিল ? নাকি নানা উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা?
মাহাবুব জামাল শামীম : ১৯৮৫ সালের এপ্রিলে, পহেলা বৈশাখতো ১৪ এপ্রিল হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে আমরা রির্হাসেল প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। এটা শুরু হয় যশোরের শহরে। আমাদের শিশুদের নিয়ে করা স্কুল তখন বিরাট কলেবরে চলছে। স্কুল ভরে গিয়েছে শিশুতে। শত শত শিশু। তো ওই সালেই নিকটে চলে আসলো একুশে ফেব্রুয়ারি। তাদের নিতে হবে প্রভাতফেরিতে। কিন্তু আমরাতো শোক মিছিল করতে গেলাম না, বিজয় মিছিল করতে গেলাম! আমাদের ছোট শামীম বলে একটা শিশু ছিল। ও ভারী গুনী। ফুল প্রজাপতি, পাখি সাংঘাতিক বানাতে পারতো। আমরা বড়রাও বাংলা অক্ষরগুলো থ্রিডাইমেশন করে সবকিছু সাজিয়ে দিলাম ওদেরকে। ওরা সাংঘাতিক সাজগোজ নিয়ে যেন বিজয় মিছিল করে শোভাযাত্রায় গেল, মানে প্রভাতফেরি করলো। প্রভাতফেরিতো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, সাদা পায়ে শুভ্র শোক মিছিল। আর সেখানে শিশুরা বিজয়ের বেশে গেল। সবাই মুগ্ধ হয়ে বলল, হ্যাঁ গেলে এমনই ভাবে যেতে হয়। সবাই খুব উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রভাতফেরিতে থেকে ফিরে এসে ওরা বেশ আনন্দিত। ফিরে এসে বলতে লাগলো এবারতো পহেলা বৈশাখ। নতুন একটা প্রতিষ্ঠান শুরু হয়েছে তো। প্রথম প্রোগ্রাম হল একুশে ফেব্রুয়ারি। সেখান থেকে ফিরে এসেই উজ্জীবিত সব।
সারাবাংলা: এভাবেই মঙ্গল শোভাযাত্রা’র শুরু …
মাহাবুব জামাল শামীম : আমাদের একজন শিল্পী কিরন্ময় চন্দ্র, ও এসে বলল শামীম ভাই বৈশাখ তো সমাগত। কিভাবে উৎসবটা করা যায়। তখনই আমরা বললাম যে, একটা বণার্ঢ্য শোভাযাত্রা করবো। আমরা বাঙালি জাতির কৃষ্টির সমস্ত মোটিভ দিয়ে আর সব শিল্প দিয়ে এই উৎসবটা সাজাবো। এই সিদ্ধান্তের পরপরই কাজে বসে যাওয়া হল। কিরন্ময় ওখানের যত আর্টিস্ট ছিল সবাইকে নিয়ে, ছাত্রদের নিয়ে বসে পড়লাম নানান উপকরণ তৈরি করতে। আর মুকুট বানাতে। আমাদের প্রথম থিমটা ছিল মুকুট। মুকুটটা কি, মুকুট পড়লে সবাই রাজা হয়ে যায়, রাণী হয়ে যাই, রাজকুমার হয়ে যাই, রাজকুমারী হয়ে যাই। তাই এই উৎসবকে এভাবে সাজানোর কথা ভাবলাম সমস্ত কিছু নিয়ে। এতকাল ধরে অনুষ্ঠান ছিল গুটি কয়েকজন মঞ্চে গান করবেন, নাচ করবেন। আর আমরা সবাই শ্রোতা দর্শক। আমরা ঠিক করলাম আমাদের উৎসবে সবাই রাজা। সবাই একমঞ্চে যেন অভিনেতা। অন্য উৎসবের সঙ্গে এই উৎসবের সঙ্গে পার্থক্য এটা। কারণ সবাই নৃত্য করতে থাকবে। সবাই পোষাক শিল্পে সজ্জিত হবে। নানান উৎসব উপকরণ তৈরি করবে। আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সমস্ত মোটিভ ফিরিয়ে আনার কাজ করবে। এটা সবার বিষয় হবে। কারণ আমরা আমাদের জীবনে সমস্ত শিল্প চর্চা ফিরিয়ে আনতে চাই। সেই পথই খুঁজছিলাম। তার জন্য একটা কর্মসুচি। একটা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসুচি। যেটা প্রতীকি অর্থে এক প্রতিষ্ঠান করলেও সারাদেশের জন্য ছিল। তখন কিরন্ময় চন্দ্র তার দলবল নিয়ে বসে গেল। সেই ছোট শামীম বলছি। অনেক গুনি একজন শিশু। সেও কাজ শুরু করে দিল। আর আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম সামগ্রিক রুপ দেয়ার কাজে। সামগ্রিক মানে সব শিল্পকে মেলাতে হবে। এই উৎসবের একটা লক্ষ্য অর্জনের জন্য, তখনই আমি আনলাম গ্রাম থেকে ঢাক ঢোল সানাই। এসব এনে তিনশ শিশুকে আমি দাঁড়া করালাম উৎসব নৃত্য প্রশিক্ষণে। আমি আসলে চারুকলাতে পড়তে এসে উৎসবের মন শুরু হয়েছিল। এটা আসলে আমার ভেতর হয়েছিল সেই ১৯৮০ সাল থেকেই। তো এই কারণে চারুকলাতে পড়াকালীন আমি নাচের জন্য ভর্তি হয়ে গেলাম বাফা (বুলবুল লতিতকলা একাডেমি)। নাচ শিখতে। আমি শিল্পী সুলতানের ছাত্র। আমারতো চিত্রকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল ভাস্কর সব পারে। বড় বড় কাঠামো তৈরি করতে পারে। তাই আমি ভার্স্কয শিল্পে পড়ালেখা করলাম। আমি ভার্স্কযে পড়লাম, বাফাতে নাচ শিখলাম। শিল্পকে অর্জন করার কাজ আমার মধ্যে শুরু হয়ে গেছিল। আর কিরন্ময় আমার সাথে ছিল। তিনি অদ্ভুত ডিজাইনার। আমাকে চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। আমার সাথে হাজার হাজার মানুষ প্রতিষ্ঠাতা। আমি প্রধান উদ্যোক্ত আর কি। কিরন্ময়, মোখলেসুর রহমান, শিশির ভট্টাচার্য সহ আরও অনেকেই প্রতিষ্ঠাতা। যশোরের অনেক মানুষ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল।
সারাবাংলা : বিদ্যাপীঠই মঙ্গল শোভাযাত্রা করার ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে?
মাহবুব জামাল শামীম : সেটাতো অবশ্যই। এই অবস্থায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার জন্য ঢাকা ঢোল নিয়ে শিশুরা উৎসব নাচ প্র্যাকটিস করছে। আর কিরন্ময় কসটিউম পরিকল্পনা করছে। কেমন পোশাক হবে, কেমন সাজসজ্জা হবে। আর  উৎসব উপকরণতো সবই চলছে। রাজসিক মুকুট বানানোর কাজতো চলছেই। অনেককিছু তৈরি চলছে। বৈশাখের আগে দুই মাস আমরা নিজেদের রাঙিয়ে নিলাম, সুরে মিলিয়ে নিলাম। তিনশ’ শিশুকে আর একশ’ তরুণকে মিলিয়ে নিয়ে ১৯৮৫ সাল বাংলা ১৩৯২ সালের পহেলা বৈশাখ ভোর ছয়টায় বের হওয়া হবে। তার মানে আলো ফুটতে না ফুটতে সবাই হাজির। পলাশ মসখন্দ ঘেরা একটা প্রাচীন বিল্ডিংয়ে প্রাঙ্গনে রঙিন শিশুরা নানা ধরনের দৃশ্যমান কালারফুল জিনিস নিয়ে হাজির হল। যেই ঢাক ঢোল সানাই বেজে উঠলো, মুসলমানদের আঙ্গিনায়, কারণ আমাদের সঙ্গে হিন্দু ছিল অল্প সংখ্যক। আসলেতো মুসলমানের অঞ্চল। তো ঢাক ঢোল বেজে উঠলো, শিশু তরুণরা যে দুই মাস ধরে সুরে তৈরি হল, তারা যখন নেচে উঠলো এমন এক দৃশ্যের অবতরণা হল। এটা কোন স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। একেবারে যেন বেহেস্ত থেকে বর্ষণ নামল। থামছিল না। শিশির সিক্ত যশোরের রাস্তা দিয়ে যখন বের হয়ে গেল শোভাযাত্রা। শহরের পুর্ব থেকে পশ্চিমে সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করে এসে চারুপীঠে থেমে যাবে। কিন্তু থামলো না। এবার শোভাযাত্রা উত্তর থেকে দক্ষিণে যাবে। এত সুন্দর হল সেই শোভাযাত্রা যে আমরা আয়োজকরা খুন হয়ে গেলাম। ভাললাগায়, মুগ্ধতায়। আমাদের অংশগ্রহণকারীরাও খুন হয়ে গেল মুগ্ধতায়। আমরা সমস্ত শহর প্রদক্ষীণ করেছিলাম তো, ওই সময় যে সমস্ত সংগঠনগুলো পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠান করেছিল, যারাই দেখেছিল তারা ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে শোভাযাত্রা শেষে চারুপীঠে এসে হাজির হয়েছিল। তারা ক্ষুদ্ধ হয়েছিল এই কারণে যে, এত সুন্দর প্রোগ্রাম আমাদের কেন জানানো হল না। আমরা কি জানতাম যে, এত সুন্দর একটা অনুষ্ঠান হয়। আগেতো করিনি, দেখিনি। আমরা চিরকাল দাস হয়ে গেলাম এই উৎসবের। আনন্দ আর খুশির এক পথ পাওয়া গেল। ওইদিনই আমরা বুঝে গিয়েছি, উৎসবটা দেখেই মনে হয়েছে এটা একদিন বিশ্ব উৎসবে পরিণত হবে। কারণ শোভাযাত্রা থামছিল না, উত্তর দক্ষিণ পুর্ব পশ্চিম সবদিকে যখিন শোভা যাত্রা চলে গেছে, তখনই আমরা ভেবেছি এটার সার্বজনীনতা পেয়েছে। এভাবেই শুরু।
সারাবাংলা : শোনা যায়, আপনি ব্যক্তিগত ভাবে অনেককেই এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন…
মাহবুব জামাল শামীম : সে সময় যশোর কালচারাল ইনস্টিটিউট নামে একটা বিশাল প্রতিষ্ঠান আছে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। সব সংগঠনের মা। সেখানে যশোরবাসী মিলিত হল। সব সংগঠনের লোকজন আসল। সবাই বলল , এই উৎসব আমরা সবাই করবো। এরপরে চারুপীঠের নামে ওই একবারই মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছিল। তারপরে যশোর বর্ষবরণ পর্যদের ব্যানারেই এই উৎসব হয়। তখন সারাদেশে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাটাই প্রথম। এছাড়া ওই সময় ছায়ানট পহেলা বৈশাখে গানের অনুষ্ঠান করতো। এটা আমাদের অনেক আগে থেকেই শুরু। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা উৎসবটা শুরুতে যশোরের একটা সামাজিক উৎসব ছিল। তারপরে আরও কয়েক বছর পর এটা রাজধানী ঢাকাসহ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

সারাবাংলা/এমএম

মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ ভাস্কর শিল্পী শামীমের সঙ্গে কথপোকথন
মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ ভাস্কর শিল্পী শামীমের সঙ্গে কথপোকথন