মঙ্গলবার ২০শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

মোবাইল ফোনে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি

অক্টোবর ১৩, ২০১৮ | ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর।।

ঢাকা: বিয়ের অনুষ্ঠানে মোবাইল দিয়ে ঝটপট ছবি আমরা সবাই তুলি। কিন্তু তাই বলে একদম পেশাদার ফটোগ্রাফি তাও শুধু মোবাইল দিয়ে? শুনতে যতই আজব শোনাক না, এ কাজটা করে দেখিয়েছেন দেশের একজন তরুণ ওয়েডিং ফটোগ্রাফার, নাম মোহাম্মদ আমিনুর রহমান; বন্ধুরা তাকে ডাকেন আমিন নামে।

আমিনের বয়স সবে ৩০ হলো। তবে ওয়েডিং ফটোগ্রাফির অভিজ্ঞতা তার প্রায় ১০ বছর। পেশা হিসেবে এটা গ্রহণ করেছে তাও আটবছর।

সত্যি বলতে আমিনের বয়স যখন ২২ বছর ছিল; আর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ পাশ করার পরে বন্ধুরা হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছিল। আমিন দাঁতে দাঁত চেপে ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

বন্ধু সাদিয়া আফরিন অরণিকে নিয়ে একটা কোম্পানিও খুলে ফেলেন, যারা বিয়ের অনুষ্ঠানের সব ধরনের কাজ করে দেন, একদম ইয়াসরাজ ফিল্পসের ‘ব্যান্ড বাজা বারাতি’ সিনেমার মতো ব্যাপার-স্যাপার। শুধু উদ্যোক্তা হিসেবে আমিন-অরণির পরিচয় থেমে থাকেনি। সত্যিই তাই, আমিন আর অরণি পরে বিয়েই করে ফেলেন।

সংসারের সঙ্গে ধুমধামে দৌড়ে চলে তাদের কোম্পানি চেকমেট ইভেন্টস; যেখানে ছবি তোলার সব দায়দায়িত্ব আমিনের আর ব্যবসা সংক্রান্ত বাকি খুঁটিনাটি দেখভালের দায়িত্ব অরণির।

এভাবে চলছিল বেশ। তখনই ওদের বন্ধুরাও সবাই বিয়ে করছিল। খুব দ্রুতই বাজার ধরে ফেলেন অরণি-আমিন। গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি না খোঁজার জন্য যারা ওদের বোকা ভাবছিল, তারাই রাতারাতি বোকা বনে যায় ওদের সাফল্য দেখে।

কিন্তু থেমে থাকার মানুষ নন ওরা দুইজন। এ বিষয়ে অরণি সারাবাংলাকে বলে, ‘আমরা যদি একটা বাজার চিন্তা করি সেখানে ক্রেতাদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলায়। সবাই আগের চেয়ে ভালো কিছু চায়। বাংলাদেশে বিয়ের বাজারটা এখন অনেকটাই স্থিতিশীল এখানে এখন অনেক কোম্পানি। ফলে ক্রেতা আনতে গবেষণাটা খুব জরুরি।’

চেকমেট এখন মোটামুটি বড় একটা কোম্পানি। প্রায় ২৫/৩০ জনের মতো একটা টিমও আছে তাদের। শুধু বিয়ের আসর না, অন্য সব করপোরেট ইভেন্টও করে তারা। নানা রকমের ক্যামেরা, লেন্স তো আছেই তাদের। একটা ড্রোন ক্যামেরা পর্যন্ত আছে। এ সব রেখে কেন তারা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় বিয়ের অনুষ্ঠান কাভার করতে গেলে, এই প্রশ্নটাই আসে সবার মাথায়।

আমিন হেসে জবাব দেন, আসলে আমাদের প্রথম কাজটা বিয়ের অনুষ্ঠান না, ওটা ছিল একটা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। আর সত্যি বলতে এটা ভীষণভাবে একটা এক্সপেরিমেন্ট ছিল। আমি খুব ভাগ্যবান যে ক্লায়েন্ট আমার এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন।

আমিনের মতে, বিয়ের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এক লহমায় হয়ে যায়। তার ভাষায়, বিয়ে একটা দারুণ আবেগঘন ঘটনা। প্রতিটা মানুষের আবেগ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। মূহূর্তে ঘটনা প্রবাহ বদলায়। এই কেউ আবেগে কেঁদে দিচ্ছে তখুনি হয়ত তার ওপর অর্পিত কোনো দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে, এরকম চকিত মুহূর্তগুলো বুঝে ক্যামেরা বের করে, সঠিক লেন্স বের করে তাক করতে করতে ঘটনাপ্রবাহ বদলে যায়। আবার মোবাইল একটা বিল্ট ইন ডিভাইস, এখানে ছবি তোলা অন্য যেকোনো ডিভাইসের চেয়ে সহজ, মোবাইল বহন করা সহজ।

সবচেয়ে জরুরি কথা, যার ছবি তোলা হচ্ছে সে সচেতন হওয়ার সুযোগ পান না, ফলে যেই মুহূর্তটা পাওয়া যায় তা একদম নিখাদ, সহজ ভাষায় আমরা যাকে ক্যান্ডিড বলে থাকি।

তাই বলে মোবাইল দিয়ে পেশাদারি ছবি তোলা? এ বুদ্ধি এলো কোথা থেকে?

আমিন স্বীকার করে নেন বুদ্ধিটা একদম তার নিজের না। ২০১৬ সালে ইসরালি একজন ফটোগ্রাফার তার ফোন দিয়ে এ রকম একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিগুলো দেখে আমিনেরও মনে হয়, দেখিই না চেষ্টা করে।

বাধ সাধে পেশাদারিত্ব। পয়সা দিয়ে ছবি তুলিয়ে নেবে যে গ্রাহক, সে কেন এই ধরনের কাজের অংশীদার হবে? বিশেষ করে বিয়ে তো আর বারবার আসবে না। যদি ছবি নষ্ট হয়ে যায়! তারপর? সারাজীবন এটা নিয়ে কাঁদবে? তবে আমিনের ভাগ্য বলতে হয়। একজন ক্লায়েন্ট সত্যি এই প্রস্তাব লুফে নেন। তাদের অনুমতি নিয়েই বিশাল বিশাল লেন্সের সব ক্যামেরা ফেলে আমিন সত্যিই তার আইফোন-এক্স নিয়ে নেমে পড়েন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে।

আমিন জানান, মাঠে নামার পরে শখ আর দক্ষতা মধ্যে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতাও এসে দাঁড়ায়, যেমন আইফোনের ফোকাল লেন্থ ক্যামেরার থেকে আলাদা। আর মোবাইলে আলাদা করে ফ্ল্যাশ ব্যবহার করা যায় না।

বিয়ের মতো অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার সুবিধার জন্য আলোর তারতম্য রাখা হয়। আর অধিকাংশ অনুষ্ঠান হয় রাতে। এই সীমাবদ্ধতা তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, বলেন আমিন।

তাও ভাগ্য সহায় ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফির পুরো দলটাই ছিল চেকমেট ইভেন্টস। ফলে প্রতিজন সদস্যের কাজের ধরন আমিন জানতেন। তাই তাদের নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে কাজ সেরে ফেলেন আমিন। এতে আলাদা করে কাউকে সচেতন করার প্রয়োজনও পড়েনি আমিনের।

এরপর শুরু হয় ছবি প্রসেসিংয়ের কাজ। আমিন বলেন, একই ডিভাইসে ছবি তুলে সেখানেই তা এডিট করা দারুণ আরামের ব্যাপার। এতে সময় বাঁচে, পরিশ্রম কম হয়। আর বিশাল সব ডিভাইসের সামনে মুখ গুঁজে বসে থাকতে হয় না। শুধু মোবাইলটা হাতে নিয়ে যেকোনো অবস্থায় আরামে কাজটা করা যায়।

আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করি তাকে টেনে নিয়ে নিজের দক্ষতাকে কীভাবে আরও দারুণভাবে উপস্থাপন করা যায় তার একটা সুন্দর উদাহরণ তৈরি করেছে আমিন।

আমিনের মতে, মোবাইলে ফটো তোলা আর ফটোগ্রাফি তো এক জিনিস না। ফটোগ্রাফি একটা দক্ষতার বিষয়। খুব মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন করলে শুধু একটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেও হওয়া যাবে দারুণ ফটোগ্রাফার।

সারাবাংলা/এমএ/একে

Tags: , ,

মোবাইল ফোনে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি
মোবাইল ফোনে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি
মোবাইল ফোনে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি