মঙ্গলবার ১৯ জুন, ২০১৮, ৫ আষাঢ়, ১৪২৫, ৪ শাওয়াল, ১৪৩৯

যে জীবন পচাত্তরের, যে জীবন স্মার্ট ও আই ফোনের!

মে ২৩, ২০১৮ | ৫:৩৮ অপরাহ্ণ

আহসান কবির ।।

এক কৃষক তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে গেলেন টয়লেটে। অন্যমনষ্ক হয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে সেটা গেলো হাত ফসকে… ফলে যা হবার তাই হলো। কৃষকতো কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। কিন্তু টয়লেট থেকে বের হবার সাথে সাথে দেখলেন আকাশ থেকে এক পরী নেমে এসেছে। সে মোবাইল ফোনটা তুলে এনে কৃষককে ফেরত দিল। কৃষক বললেন, আমি গরীব হতে পারি কিন্তু সৎ। এই সোনার মোবাইল ফোন আমার না। পরী তাকে ঝারি মেরে বললো-পুরোনো সেই দিন আর নাই যে সৎ থাকার জন্য আমি তোকে পচাত্তর হাজার টাকা দিয়ে একটা দামি মোবাইল কিনে উপহার দেব। আর তুই মন্ত্রী বা সচিবও না। এটা তোরই মোবাইল। যা পরিষ্কার করে ব্যবহার কর!

মোবাইল ফোন এবং পচাত্তর হাজার টাকা দুটোই এখন আলোচিত বিষয়। সাতে মন্ত্রী-সচিব শব্দগুলোও। তবে এটা সত্য, বাংলাদেশের মন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবরা কৃষকদের চেয়েও গরিব। একেবারে গণি মিঞার মত গরিব। (গণি মিঞার নিজের জমি ছিল না। সে পরের জমি চাষ করতো। দয়া করে এটা কেউ অন্যভাবে বিশ্লেষণ করবেন না বা কোন ধরণের প্রেমের সাথে তুলনা করবেন না!) গল্পের গণি মিঞাকে টানা হচ্ছে একারণে যে তাঁর যেমন নিজের জমি ছিল না তেমনি মন্ত্রী আর সচিবদেরও নিজের মোবাইল ফোন নেই। তারা অন্যের টাকায় মোবাইল ফোন কিনবেন। এই ফোনের টাকা জোগাবে ম্যাংগো পিপল অর্থাৎ আম জনতা। তাদের ট্যাক্সের টাকায় এই মোবাইল কিনে দেয়া হবে! মন্ত্রী এবং সচিবরা আগে কম গরীব ছিলেন। তখন তাঁদের মোবাইল কেনার জন্য মাত্র পনের হাজার টাকা দেয়া হত। বিলটা অবশ্য আগে থেকেই পেতেন তাঁরা। এখন তারা আরও গরীব। তাই তাদের মোবাইল ফোনের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আর যত খুশি তত মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন,নেট ব্যবহার করতে পারবেন। মনে হচ্ছে, আগামীতে তারা আরও গরিব হবেন। তখন তাদের স্যাটেলাইট কানেকশনও দেওয়া হতে পারে। স্মার্ট মোবাইলটা তখন স্যাটেলাইট টেলিফোনে রুপান্তরিত হয়ে যেতে পারে!

আসলে বাংলাদেশ এখন আর গরীব নেই। গরীব ফকির বা মিসকিন শব্দটা এখন চলে গেছে জাদুঘরে। এখন মধ্য আয়ের দেশ বাংলাদেশ। সুতরাং রিক্সাওয়ালা, কৃষকরাও নাকি এখন দশ পনের হাজার টাকা দামের মোবাইল ব্যবহার করেন। নেতা মন্ত্রী আর সচিবরাও যদি একই দামের মোবাইল ব্যবহার করেন তাহলে চলবে কী করে? একারণেই পচাত্তর হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে মন্ত্রী সচিবদের মোবাইল কিনতে। তবে নেতা মন্ত্রী তথা ভিআইপিদের জন্য যেমন আলাদা লেন দরকার তেমনি দামি মোবাইল ফোনও। ভবিষ্যতে হয়তো দামি পোষাক,অর্ন্তবাস এমন কী পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীও ফ্রি চাইতে পারেন! বাংলাদেশ ইজ অনলি ফর মন্ত্রী এন্ড সচিবস!

তবে এক সময়ে এই মোবাইল কিন্তু শুধু আম জনতার জন্য ছিল না। ১৯৬৫-৬৬ সাল থেকেই ফোন নিয়ে জার্নি করার সাধ জেগেছিল মানুষের। অনেক কোম্পানির মত মোটোরোলা কোম্পানিও চেষ্টা করেছিল বহনযোগ্য এবং তারের সংযোগ ছাড়া ফোন তৈরির। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল প্রথম কোম্পানিটির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপার প্রথম মোবাইল কলটি করেও ফেললেন। কিন্তু বহনযোগ্য একটি সেট তৈরি করতে তিনি আরও এগার বছর সময় নিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি যে ‘ডায়না টিসি’ সিরিজের মোবাইল সেটটি তৈরি করেছিলেন তার ওজন ছিল সোয়া কেজি! তখন মোবাইল ব্যবহার করতে পারতো স্বাস্থ্যবান মানুষেরা! এই মোবাইল দিয়ে মাথায় আঘাত করলে মানুষ মারাও যেতে পারতো। ভাগ্যিস সেদিন আর নেই। নাহলে আমাদের মন্ত্রী বা সচিবদেরও এটা ব্যবহার করতে হত। এখন তারা যে মোবাইল ব্যবহার করবেন তার ওজন ১২৯ গ্রাম মাত্র! গরীবরা মোটা চালের ভাত খায় এবং তাদের মোবাইল ও পছন্দের নায়িকারা নাকি মোটা ভারী হয়। মন্ত্রী সচিবরা চিকন চালের ভাত খান এবং তাঁদের নায়িকা ও মোবাইল হয় স্লিম ও স্মার্ট!

স্লিম ও ওজনে অল্প আইফোন মানুষের ভেতর একরকম ক্রেজ সৃষ্টি করে ২০০৭ সালে। এই বছর অ্যাপল কোম্পানি প্রথম আইফোন বাজারে আনে। আইবিএম অবশ্য ১৯৯৩ সালে প্রথম স্পর্শ ফোন অর্থাৎ টাচস্ক্রিন মোবাইল বাজারে এনেছিল। কিন্তু আইফোনের মত কোন কোম্পানি ক্রেতাদের ভেতর এত বেশি ক্রেজ তৈরি করতে পারেনি। আর স্মার্ট ফোন প্রথম এনেছিল নকিয়া ২০০৩ সালে। এখন পর্যন্ত নকিয়া ১১০০ এবং ১১১০ সর্বাধিক ব্যবহৃত এবং বিক্রিত মোবাইল। জাপানের বেশিরভাগ মানুষ ওয়াটার প্রুফ মোবাইল সেট ব্যবহার করেন। তারা স্নানের সময়েও নাকি মোবাইলে কথা বলেন। আমাদের মন্ত্রী ও সচিবরা অতি গুরুত্বপর্ণ ব্যক্তি। তারা স্নান এবং টয়লেট করার সময়ও মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন। মোবাইল কমোডে পরলেও ক্ষতি নেই। পরী এসে উদ্ধার করে দিয়ে যাবে!

তবে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার কিংবা চালাকি ক্ষতির কারণ হতে পারে। হ্যাকার কেভিন মেটনিকের কথাই ধরুন। তাকে দীর্ঘদিন জেলে রাখা হয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে জনশ্রুতি ছিল যে তিনি মোবাইলে শীষ দিয়ে পারমানবিক যুদ্ধ বাজিয়ে দিতে সক্ষম! মালয়েশিয়ানরা মোবাইল দিয়ে আরেক চালাকি করে থাকেন। মাছ ধরার সময় মোবাইল দিয়ে মাছ আকর্ষণের চেষ্টা করেন। মোবাইলের শব্দে নাকি মাছরা বশীভূত হয়। এদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলো অবশ্য মোবাইলে ‘মিডনাইট’ প্যাকেজ অফার করে। কম পয়সায় কথা বলে প্রেমিক প্রেমিকাকে কিংবা প্রেমিকা নাকি প্রেমিককে বশীভূত করতে সক্ষম হয়। মন্ত্রী এবং সচিবদের পচাত্তর হাজার কিংবা তার চেয়েও বেশি দামের মোবাইল আগেই থাকার কথা। নতুন এই পচাত্তর হাজারের মোবাইল হয়তো তাঁর ছেলে মেয়েরাই ব্যবহার করবে। কেউ মাছদের আকৃষ্ট করবে আর কেউ করবে প্রেম!

যে দেশে শিক্ষকরা নিযমিত বেতন পেতে ও স্কুল এমপিও ভূক্ত করার দাবিতে রাস্তায় নামে,অনশন করে, যে দেশের পোষাক শ্রমিক ন্যায্য বেতন না পেয়ে এমন কী ঈদের আগে বেতন বোনাস না পেয়ে রাস্তায় নামে সেদেশের মন্ত্রী সচিবরা এইসব পোষাক শ্রমিকদের ট্যাক্সের টাকায় পচাত্তর হাজার টাকা মূল্যের টেলিফোন ব্যবহার করবেন।

আইফোনে নাকি চমৎকার ছবি তোলার ব্যবস্থা আছে। আই ফোন দিয়ে ভিডিও করে নাকি আর্ন্তজাতিক মানের ছবি বানানো যায়। এই পচাত্তর হাজারের মোবাইলে তাঁরা কী পোষাক শ্রমিকদের মিছিলের ভিডিও করবেন? শিক্ষকদের অনশনের ছবি তুলবেন? নাকি কোটা আন্দোলনের নেতৃত্ব কারা দিচ্ছে তাদের ভিডিও ধারণ করবেন?

এই দেশটা আম জনতার নয়,মন্ত্রী সচিবদের। যারা যুদ্ধ করে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের একজন তাহেজ উদ্দীন সরকার। তিনি পাবনার বেড়া উপজেলায় থাকতেন। ১৮ মে ২০১৮ সালে তিনি মারা যান। সেদিন তাঁর মরদেহর উপর চাটাই বিছিয়ে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। যে দেশ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে একটি জাতীয় পতাকা জড়িয়ে শেষ বিদায় জানাতে পারেনা সেই দেশ তার মন্ত্রী সচিবদের পচাত্তর হাজার টাকার মোবাইল দিয়ে জাতে তুলতে চায়।

শ্রদ্ধেয় মন্ত্রী সচিবগণ, তাহেজ উদ্দীনের চাটাইময় গার্ড অব অনারের ভিডিওতে আপনাদের পচাত্তর হাজার টাকার মোবাইল দিয়ে একটা অন্ততঃ লাইক দিয়েন। যে শিক্ষক রাস্তায় অনশণ শেষে নিথর নিঃশেষ দেহ নিয়ে হতাশার গ্লানিতে আত্মহত্যা করতে ছুটে যেতে চান তার ভিডিও ধারণ করে নীচে লিখে দিয়েন-ইশ কী বোকা! এরা জীবনের মানে বুঝলো না! ইতর আর অভদ্র জনগণের শরীর থেকে ঘাম আর শ্রমের সবটা শুষে নিয়ে তাদের নিথর দেহটার সাথে অন্তঃত একটা সেলফি তুইলেন! আহা! সেল্ফি স্টিকটা কি দেওয়া হচ্ছে ফ্রি-তে। সেটা খুব জানার ইচ্ছা।

যে জীবন পচাত্তর হাজারের, যে জীবন স্মার্ট এবং আইফোনের, তার সাথে এই ইতরদের কোন কালে হবেনা তো দেখা!

আহসান কবির : লেখক, অনুষ্ঠান প্রধান, বৈশাখী টেলিভিশন।

সারাবাংলা/এমএম

যে জীবন পচাত্তরের, যে জীবন স্মার্ট ও আই ফোনের!
যে জীবন পচাত্তরের, যে জীবন স্মার্ট ও আই ফোনের!