রবিবার ১৯ আগস্ট, ২০১৮, ৪ ভাদ্র, ১৪২৫, ৭ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

রনির সংবর্ধনার সামনে মেয়র নাছির

জুন ৭, ২০১৮ | ৭:৪০ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে শহীদ মিনারে সংবর্ধনা চলছিল নুরুল আজিম রনি’র। মুখোমুখি মুসলিম ইনস্টিটিউট হল থেকে ঐতিহাসিক ছয় দফা উপলক্ষে আলোচনা সভা শেষ করে বের হচ্ছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। সংবর্ধনায় চলছিল রনি’র বক্তব্য। মুসলিম হল থেকে বেরিয়ে বাজেটকে স্বাগত জানাতে বের করা নগর আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ে চলে যান মেয়র।

মেয়রবিরোধী ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি আছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি’র। তার বিরুদ্ধে মামলার নেপথ্যে মেয়রের ইন্ধনের সমালোচনায় মুখর রনি’র অনুসারীরা। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে মুক্ত রনি’র সংবধর্না অনুষ্ঠানের সামনে মেয়রের উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মাঝে আলোচনার সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খানের দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলায় বৃহস্পতিবার (০৭ জুন) দুপুরে জামিন পান নুরুল আজিম রনি। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

কারাগারের মূল ফটক থেকে কয়েক’শ নেতাকর্মী রনিকে নিয়ে মিছিল করে অদূরে আমানত শাহ’র মাজারে যান। সেখানে জিয়ারত শেষে রনিকে নিয়ে মিছিল করে নেতাকর্মীরা যান শহীদ মিনারে। সেখানে বিভিন্ন কলেজ, ওয়ার্ড ও থানা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেউ পুষ্পস্তবক, কেউ ফুলে মালা দিয়ে রনিকে বরণ করে নেন।

সেখানে রনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘যে মামলায় আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম- আদালতের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বলতে চাই, কোনো থাপ্পড়ের জবাবে কোনো চাঁদাবাজির মামলা হতে পারে না। সেদিন সেই একটি থাপ্পড় যদি আমি না দিতাম তাহলে ৯৬৯ জন পরীক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হতো না। সেদিন তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে যে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়েছিল, সেই ফি-ও ফেরত দেওয়া হতো না।’

মেয়রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যারা রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বিজ্ঞান কলেজের জামায়াতি শিক্ষককে মামলার জন্য ইন্ধন দিয়েছেন, পুলিশকে বারবার করে ফোন দিয়েছেন আমার বিরুদ্ধে থাপ্পড়ের বিপরীতে যেন চাঁদাবাজির মামলা নেওয়া হয় – তাদের রাজনীতি হচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে রাজনীতি। তারা বারবার চট্টগ্রামের মানুষের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেছেন। তারা বন্দর লুট করেছেন, তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লুটেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।’

এসময় রনি চট্টগ্রামের ৮১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সিটি করপোরেশন বাড়তি টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ করেন।

এ সময় কোতয়ালী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান মনসুর, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শিবুপ্রসাদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আবু সাদাত মো.সায়েম, মহানগর ছাত্রলীগ নেতা গোলাম সামদানী জনি, ইয়াছিন আরাফাত কচি, মায়মুন উদ্দিন মামুনসহ ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। রনি যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শিবুপ্রসাদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘রনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিল, তখন মেয়রসহ আওয়ামী লীগ নেতারা মুসলিম হল থেকে বেরিয়ে মিছিল নিয়ে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দিকে চলে যান। সেই মিছিল থেকে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা হাত নেড়ে রনিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।’

মিছিলে মেয়রের সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান ও নোমান আল মাহমুদ, আইন বিষয়ক সম্পাদক ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক চন্দন ধরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা ছিলেন।

শহীদ মিনারে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে রনিকে নিয়ে নেতাকর্মীরা নগরীর চশমাহিলে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসভবনে যান। সেখানে মহিউদ্দিনের কবর জেয়ারত করেন রনি। এরপর নিজের বাসায় ফিরে যান।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে রনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন রনি।

দায়িত্ব পাওয়ার পর দীর্ঘ ৩০ বছর পর চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ শিবিরের দখলমুক্ত করেছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্ধিত বেতন নেওয়া, সৃজনশীল প্রশ্নপত্রসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তুলেন। চট্টগ্রাম নগরীতে খেলার মাঠ রক্ষায়ও আন্দোলন করেন রনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব রনি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার। নগরীর আউটার স্টেডিয়ামে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) সুইমিং পুল নির্মাণের বিরুদ্ধেও জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন রনি, যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মেয়র নাছির। এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাড়তি টাকা আদায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেও আলোচনায় এসেছিলেন রনি। তবে এজন্য তাকে প্রভাবশালী মহলের রোষানলেও পড়তে হয়।

এরপর গত ৩১ মার্চ চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজে উন্নয়ন ফি’র জন্য এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আটকে রাখার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে অধ্যক্ষ জাহেদ খানকে মারধরের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। পরে জাহেদ খান রনির বিরুদ্ধে নগরীর চকবাজার থানায় চাঁদাবাজি ও মারধরের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গত ৪ জুন আদালতে আত্মসমর্পণের পর রনিকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

এছাড়া গত ১৯ এপ্রিল নগরীর জিইসি মোড়ে একটি কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়াকে মারধরের আরেকটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এর প্রেক্ষিতে রনি স্বেচ্ছায় ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন।

দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত একটি সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করায় গত ১৬ মে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য তানজিরুল হক চৌধুরী আদালতে রনির বিরুদ্ধে একটি মানহানির মামলা করেন।

সারাবাংলা/আরডি/একে

রনির সংবর্ধনার সামনে মেয়র নাছির
রনির সংবর্ধনার সামনে মেয়র নাছির