রবিবার ১৯ আগস্ট, ২০১৮, ৪ ভাদ্র, ১৪২৫, ৭ জিলহজ্জ, ১৪৩৯

রাজনীতির পদ্মাবতী ও পদ্মাবত’র রাজনীতি

জানুয়ারি ২৮, ২০১৮ | ৭:০২ অপরাহ্ণ

 

দীপ্ত সাহা

পদ্মাবতীর গল্পটা জানতে আমাদের একটু ফ্ল্যাশব্যাক মোডে যেতে হবে। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়তে গিয়ে আলাউদ্দিন খিলজীর নাম সবাই পড়েছে। এই খিলজী সাহেব ১৩০৬ খ্রিষ্টাব্দে আক্রমণ করে বসেন আর ঠিক ১০ বছর পর তিনি ভবলীলা সাঙ্গ করেন। তারও প্রায় ২২৪ বছর পরে গিয়ে দিল্লি থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দূরে আমেথিতে বসে সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সী তার “পদ্মাবত” মহাকাব্য রচনা করেন ১৫৪০ সালে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি তথ্য দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না।

প্রথমটি হচ্ছে, উত্তর ভারতীয় আওয়াধি গণ উপভাষায় রচিত প্রথম মহাকাব্য ছিল পদ্মাবত। এই ভাষার আরো দুজন বিখ্যাত কবি হলেন, তুলসীদাস এবং রামাছত্রিমানস।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আবার বাংলাভাষার সাথে সম্পর্কিত। আরাকানের বৌদ্ধ রাজার অমাত্য মাগন ঠাকুরের নির্দেশে মহাকবি আলাওল ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে জায়সীর কাব্যকে অনুবাদ করে পদ্মাবতী রচনা করেন, যা কিনা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক নিদর্শন।

শেষ যে কথাটি তা হল, উত্তর প্রদেশের এই আমেথি নামক স্থানটি রাজনৈতিকভাবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গান্ধী পরিবার ঐতিহ্যগতভাবেই এই আসন থেকে নির্বাচন করে। বংশপরিক্রমায় এখন এ আসন থেকে লড়েন রাহুল গান্ধী।

তো এই “পদ্মাবত” বা “পদ্মাবতী” যাই বলুন, এ নিয়ে সিনেমা বানাবেন সঞ্জয় লীলা বানসালি। কিন্তু তা হতে দেবে না হিন্দুত্ববাদী সংগঠনেরা, এ সিনেমা নাকি তাদের রাজপুত ভাবাবেগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এজন্য হুমকি ধমকি, জ্বালাও পোড়াও চলছে। যেমন রাজস্থান প্রদেশের রাজপুতানার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শ্রী রাজপুত কর্নি সেনা হুমকি দিয়েছে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক কেটে নেওয়া হবে। তারা তাদের রাণী পদ্মাবতীর কোন অসম্মান দেখতে চাননা। প্রশ্ন হচ্ছে, কি আছে এই মহাকাব্য কিংবা সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমায়?

জায়সীর কাব্যে পদ্মাবতী হলেন সিংহলদ্বীপ (শ্রীলঙ্কা) এর রাজকন্যা। তার একটি অতিপ্রিয় বন্ধু ছিল। তবে রাজকন্যাদের তো সোশ্যালাইজেশনের সুযোগ কম ছিল, তাই মানুষ নয় ফ্রেন্ডজোনড হয়েছিল এক তোতা পাখি, নাম হিরামন।

কিন্তু পদ্মাবতীর পজেজিভ বাবা এ অসম বন্ধুত্ব মেনে না নিয়ে পাখিটিকে মেরে ফেলার আদেশ দেন। কিন্তু পাখি ফাগুনি পূর্ণিমারাত এবং রাজকন্যার অপেক্ষা না করে প্রাণভয়ে একাই পালায় এবং এক পাখি ব্যবসায়ীর কাছে ধরা পড়ে।

হাতবদল হয়ে চিতোরের রাজা রতন সেনের কাছে পৌঁছায়। রূপকথায় যা হয়, হিরামন পদ্মাবতীর গল্প করে আর রাজা সেটা ফ্যান্টাসাইজ করে এবং রাজহৃদয়ে প্রেমের আগুন দ্বিগুণ প্রাবল্যে জ্বলে ওঠে। ১৬ হাজার দেহরক্ষী সহ সাধু-সন্তুর ছদ্মবেশে রাজা সিংহল যান পদ্মাবতীর সাক্ষাত লাভের জন্য।

রাজা ডিরেক্ট কাজের জন্য শিব মন্দিরে গিয়ে উপসনা শুরু করেন। কাক বা কোকিলতালীয়ভাবে পদ্মাবতীও একই মন্দিরে উপাসনা করতে আসতেন এবং এই পাগলামির কথা তার কানে যায়। কিন্তু পাসওয়ার্ড আর ম্যাচ করে না, দুজনের দেখাও হয় না। সন্ন্যাসীজোনড রাজা তখন আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু গায়েবি আদেশে তিনি সরাসরি প্রোপোজ করতে রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা দেন কিন্তু রাজসেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হন আর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। শেষ মুহূর্তে তার আসল পরিচয় জানা যায়, আদালত প্রভাবিত হয়, মৃত্যুদণ্ডের বদলে রাজ্যসহ রাজকন্যা এবং প্রোফিট বোনাস হিসেবে আরো ১৬০০০ সুন্দরী নারী উপঢৌকন পেয়ে বর্তে যান রতন সেন। অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পাড় হয়ে পদ্মাবতীকে নিয়ে পুরীতে, রাজা তাঁর নিজ রাজ্যে এসে পৌঁছান। কিন্তু এই মহান ব্যক্তি পলিগ্যামাস হওয়ায় সংসারে সুয়োরাণী দুয়োরাণী ক্রাইসিস শুরু হয়। এর মাঝে আরো স্পাইস নিয়ে আসেন রাঘব নামের এক কর্মচারী, যে কিনা পদ্মাবতীর সাথে পরকীয়ার এটেম্পট নেন। রাজা অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই রাঘব পগাড়পাড়, পালিয়ে আশ্রয় নেন খিলজী সাহেবের দরবারে।

হিরামন যে বর্ণনা রতন সেনকে দিয়েছিল, একই রকম একটা বর্ণনা রাঘব খিলজীকে দেয়। খিলজীও হতে পারে একই রকম ফ্রাস্ট্রেটেড ছিলেন নারীঘটিত ব্যাপারে, তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়লেন রতন সেনের রাজ্যে। যুদ্ধ শেষ হয় না, রতন সেন মধ্যস্থতা করতে খিলজীকে ডাকেন রাজদুর্গে। এই সুযোগে পদ্মাবতীকে এক নজর দেখে নেন এবং দিল্লী যাবার বেলায় রতন সেনকেও কিডন্যাপ করে নিয়ে নেন। ভাবলেন পদ্মাবতী এবার অন্তত আসবে।

কিন্তু না, পদ্মাবতী নিজে না গিয়ে দুই সেনাপতি পদ্মাবতীর ছদ্মবেশ নিয়ে যান। মেক আপ আরটিস্ট কে ছিলেন তা জানা যায় নি। একপর্যায়ে রতন সেনকে উদ্ধার করে আনা হয়। এর মাঝখানে নতুন প্রেমপ্রার্থী হিসেবে আগমন ঘটে কুম্ভালনার শাসক দেবপালের। যিনি কিনা পদ্মাবতীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। চিতোর ফিরে আসার পর তা জানতে পেরে দেবপালের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন রতন সেন। কিন্তু ওই যুদ্ধে তারা দুজনেই মারা পড়েন।

আর রতন সেনের মৃত্যুর খবর শুনে তার দুই স্ত্রী পদ্মাবতী এবং নাগমতি দুজনেই সতীত্ব রক্ষায় আগুনে জীবন্ত পুড়ে মরেন। এরপর আলাউদ্দিন খিলজী চিতোর আক্রমণ করতে এলে পরাজয় নিশ্চিত জেনে রাজপ্রাসাদে থাকা সব নারী তাদের সতীত্ব রক্ষায় একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে তাতে ঝাপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে নেন। আর পুরুষরা সব যুদ্ধ করে মারা যান।

যুদ্ধের শেষে জায়সী ব্যাঙ্গ করে বলেন, আলাউদ্দিন খিলজী শুধু চিতোরের ইট-পাথরের দূর্গকেই ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কোনো মানুষকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে পারেননি। পদ্মাবতীও শুধু সেসময়ের ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালি শাসক আলাউদ্দিন খিলজীর স্বপ্ন হিসেবেই রয়ে গেল!

তো এই হল কাহিনী। এখন ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা ভাবছেন এই ছবিতে কি রাজপুত রাণীর সাথে এক মুসলিম খিলজীর মিল দেখানো হবে? এর চেয়ে বড় অসম্মান আর কি হতে পারে? কিন্তু আদতে সিনেমায় কি আছে তা কিন্তু তারা জানেনই না। তার চেয়েও বড় কথা এ পদ্মাবতী চরিত্রটি আসলেই ছিল কিনা সে ব্যাপারে ইতিহাসবিদেরা একমত নন। তো ব্যাপার হচ্ছে, চিলে কান নিয়েছে না, নিতে পারে এমন এক ধারণা থেকেই এই ব্যাপক গোলমাল শুরু। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে সিনেমার নাম পদ্মাবতী থেকে পদ্মাবত হয়েছে। নাচের দৃশ্যে দীপিকা পাড়ুকোনের উন্মুক্ত কোটিদেশ থ্রিডি প্রযুক্তি দিয়ে আবৃত করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বানসালি সাহেব যদি শিল্পের স্বাধীনতায়, শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হতেন তাহলে এ আপোসগুলো হল কেন? তাহলে কি এটা পাবলিসিটি স্টান্ট, যত কন্ট্রোভারসি তত ব্যবসা। হতেই পারে, আবার আরেকটা ব্যাপার চোখ টাটায়, ঠিক এ সময়ে, যে চরিত্র কাল্পনিক তাকে নিয়ে এত বড় আন্দোলনের পেছনে কেউ কলকাঠি নাড়ছে না তো?

তাহলে চলুন অন্য এক গল্প জেনে আসা যাক। নভেম্বরের শেষদিক যখন এই পদ্মাবতী ইস্যু সামনে এল তখন ই দিল্লির রাস্তায় প্রায় লাখ তিনেক কৃষক সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাচ্ছিল। কারণটা কী? এক প্রবল সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় কৃষিসমাজ। অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে উঠছে কৃষিকাজ, সিস্টেম তাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, তার সঙ্গে পরিবেশগত কিছু সমস্যা এই সংকটকে তীব্র করে তুলেছে। এই সার্বিক কৃষি-সংকটে দাঁড়িয়েও মোদী সরকার নিস্পৃহ এবং অসহযোগী। আত্মহত্যা নৈমিত্তিক হয়ে উঠছে কৃষকদের মধ্যে, অথচ সরকার সেই তথ্য চেপে দিচ্ছে বলে দাবি। মূলধারার বামপন্থী দল ও সংগঠনগুলির পাশাপাশি অনেক স্বতন্ত্র কৃষকগোষ্ঠী দিল্লিতে এই আন্দোলনে সামিল হয়ে তাদের নিজস্ব ‘প্রান্ত’ থেকে এগিয়ে চলেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রের দিকে, জমে উঠছে স্বতঃস্ফূর্ত বিজেপি-বিরোধী ক্ষোভ। সার্বিক সিস্টেমের বদল, কৃষকের উৎখাত আর নতুন অর্থব্যবস্থা এই সমস্যার কেন্দ্রে। ইতোমধ্যেই দিল্লির রাস্তায় কৃষকদের একটা অংশ জানিয়ে দিয়েছে, তারা সরাসরি ধর্মঘটের রাস্তায় হাঁটছেন, যার অর্থ, কৃষিপণ্য আর গ্রাম থেকে শহরে ঢুকতে পারবে না। গুজরাটে এই ধনী কৃষক সম্প্রদায় আর শহুরে ব্যবসায়ীদের বড় অংশ জিএসটি, বিমুদ্রাকরণ সব মিলিয়ে বিজেপির প্রতি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, ভোটে তার প্রতিফলন হয় কি-না দেখার। সব মিলিয়ে দিল্লির এই কৃষক বিদ্রোহ (কিংবা অভ্যুত্থান) এক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণের প্রতীকমাত্র, বিজেপি যে হাওয়া টের পাচ্ছে। কিন্তু একরকম মিডিয়া ব্ল্যাকআউটের শিকার এ আন্দোলন, কোথাও এর খবর যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না? সামনের বছর নির্বাচন, এখন কৃষক বিদ্রোহ ছড়ালে মোদিরাজত্বের দশা হবে কংগ্রেসের মত। তো এটাকে ঢাকতে তো ইস্যু চাই। কি এমন ইস্যু, যেটা পাবলিক পালসের গোড়া ধরে টান দেবে। বাহ, পদ্মাবতী তো আছেই, টান দাও। রাজা আছে, রাণী আছে, খিলজীর মধ্যে মুসলিম ফ্লেভার আছে আর বলিউড তো আছেই। লাগিয়ে দাও আগুন। আর বিজেপি এসব জাতপাতের খেলায় মাস্টার। সব মিডিয়া লাইন দিয়ে দাঁড়ালো। বাকি যা বোঝার সচেতন পাঠকমাত্রই বুঝবেন।

শেষ করবো মজার একটা কথা বলে। দীপিকার নাক কেটে নেয়ার দাবি করেছিলেন যিনি, রাজস্থান প্রদেশের রাজপুতানার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শ্রী রাজপুত কর্নি সেনার নেতা লোকেন্দ্র সিং কহলভী, ইনি কিন্তু একেবারেই সিনেমা টিনেমা দেখেন না। শেষ সিনেমা দেখেছিলেন ক্লাস এইটে পড়ার সময়, প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে। তিনি যখন সিনেমার কন্টেন্ট নিয়ে আন্দোলন এর মাথা বনে যান, তখন রাগও হয় না, পেট চেপে হাসতে ইচ্ছে করে। আহ রাজনীতি, বাহ রাজনীতি! পদ্মাবত রাজনীতি!

সারাবাংলা/এমএম

রাজনীতির পদ্মাবতী ও পদ্মাবত’র রাজনীতি
রাজনীতির পদ্মাবতী ও পদ্মাবত’র রাজনীতি