শুক্রবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৬ আশ্বিন, ১৪২৫, ১০ মুহররম, ১৪৪০

রোকসানা, লারা, হৃদি, পৃথুলার স্বপ্নডানা ভাঙার গল্প

মার্চ ১৩, ২০১৮ | ৯:১৪ অপরাহ্ণ

সন্দীপন বসু, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর

ঢাকা: গ্রিক পুরানের ইকারুসের গল্প অনেকেরই জানা। ছোটবেলা থেকেই ছিল আকাশে ওড়ার শখ। বড় হয়ে প্রাচীন গ্রিসে দেখলেন রাজার অত্যাচার। একটু পান থেকে চুন খসায় বাবা কারিগর ডিডেলাসসহ হলেন বন্দি। সেখানেই বসে ইকারুস ও ডিডেলাস বানিয়ে ফেললেন আজব এক মোমের পাখা। আর সেই পাখায় চেপে মুক্ত ইকারুস ও ডিডেলাস সাগরের উপর দিয়ে উড়ে চলছিলেন স্বাধীনতার পানে।

মুক্ত হয়েই আকাশে ওড়ার আনন্দ যেন পেয়ে বসল ইকারুসকে। উড়তে উড়তে আরও উপরে উঠলেন তিনি। যেন ছুঁতে চান সূর্যটাকেই। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে গলতে শুরু করে ইকারুসের মোমের পাখা। সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারান তিনি।

এখানকার গল্পগুলোও আমাদের ইকারুসদের। যারা নারীদের জন্য প্রতিকূল সমাজের বন্দিদশা এড়িয়ে ছুঁতে চেয়েছিলেন আকাশটাকে। বেছে নিয়েছিলেন বৈমানিকের পেশা। সফলও হয়েছিলেন তারা! কিন্তু শেষপর্যন্ত ভাগ্যের আনুকূল্য মেলেনি তাদের। ইকারুসের ডানার মতোই যন্ত্রপাখির ডানায় উড়েই প্রাণ হারান।

আমাদের প্রথম নারী বৈমানিকের নাম হয়তো অনেকেই জানেন। সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা ছিলেন বাংলাদেশের সরকারি বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর প্রথম নারী বৈমানিক। তিনি ক্যাপ্টেন পদাধিকারী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনার সনদ লাভ করেন। এরপরের ইতিহাস কেবলই গৌরবের। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রায় ৬ হাজার ঘণ্টা বিমান পরিচালনার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। এরপর নিমিষের ভুল। আর মুহুর্তেই শেষ সব।

১৯৮৪ সালের ৪ আগস্ট। চট্টগ্রাম থেকে একটি ফকার এফ-২৭ নিয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে ফিরেছিলেন কানিজ ফাতেমা রোকসানা। প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল সেদিন। আর এই বৃষ্টির মধ্যেই অবতরণের সময় বিমানটি গিয়ে পড়ে রানওয়ে থেকে ৫০০ মিটার আগেই এক জলাতে। কেউ বাঁচেনি অভিশপ্ত বিমানের। ওই বিমান দুর্ঘটনায় ৪৫ জন যাত্রী ও ৪জন ক্রু নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিক, একজন জাপানি ও ৩৩জন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বাংলাদেশি ছিলেন। পরে তদন্তে প্রমাণ মেলে ওই বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল।

এরপর ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার পোস্তগোলায় বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান আরেক নারী প্রশিক্ষক পাইলট ফারিয়া লারা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মেয়ে। কিন্তু মায়ের পরিচয়ের বাইরেও স্বাতন্ত্রে ভাস্বর হতে চেয়েছিলেন তিনি। বৈমানিক হয়ে করতে চেয়েছিলেন আকাশ জয়।

সব প্রস্তুতি চলছিল। প্রশিক্ষণও শুরু হয়। কিন্তু বিধি বাম! নিয়তি তাকে নিয়ে যায় মৃত্যুর ওপারে। বিমান প্রশিক্ষণকালীন ঢাকার আকাশেই বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পোস্তগোলায়। ডায়রিতে তিনি লিখেছিলেন, চলতে চলতে জীবন কখনো থমকে যায়। তাই হলো। জীবন তার থমকে গেছে আকাশে।

বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা আরেক নারী প্রশিক্ষণার্থী বৈমানিক তামান্না রহমান হৃদি। ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী বিমান বন্দরে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন তামান্না। ছোটোবেলা থেকেই এ মেয়েটিরও স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাবা-মা চেয়েছিলেন মেয়েটি যেন, ডাক্তার হয়। কিন্তু যার হৃদয়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন, তাকে কী দমিয়ে রাখা যায়? তামান্না রহমান হৃদিকেও দমিয়ে রাখা যায়নি।

বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে গ্রাউন্ড ট্রেনিং শেষ করে হৃদি শুরু করে দিয়েছিলেন ফ্লাইং প্রশিক্ষণ। পাইলট হতে বেশি দূর বাকি ছিল না। কিন্তু তা হলো না। প্রশিক্ষণ বিমানটি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তামান্না।

সবশেষ সোমবার নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট দুর্ঘটনায় মারা গেলেন পাইলট পৃথুলা রশিদ। তবে মৃত্যুর আগে জীবনের বিনিময়ে বীর ওই নারী পাইলট বাঁচিয়ে গেছেন ১০ নেপালি যাত্রীর প্রাণ। নেপাল ভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে এই বীর নারীকে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

পৃথুলা ছিলেন সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটির সহকারী পাইলট। শুধু তাই নয়, ইউএস-বাংলার প্রথম নারী পাইলট ছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগেও বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন এই বাঙালি কন্যা। দুর্ঘটনা কবলিত ‘বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০’ উড়োজাহাজটিতে ৩৭ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী ছাড়াও ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় নিজের কথা না ভেবে আগে সেই যাত্রীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন পৃথুলা। ১০ জন নেপালি যাত্রীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে সরিয়ে দিতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিমান দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। যারা আন্তর্জাতিক খবরের পাঠক তারা হরহামেশাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট-বড় বিমান দুর্ঘটনার খবর পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার খবর কমই বলা চলে। কালেভদ্রে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় অনেকে নিহত হলেও যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা হাতেগোনা।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও উইকিপিডিয়ার বরাতে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যাত্রীবাহী বিমান যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৮৪ সালে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ওই বছরের ৫ আগস্ট ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘ফকার এফ২৭-৬০০’ দুর্ঘটনায় পড়ে। চট্টগ্রাম থেকে ফিরে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অবতরণের সময় বিমানবন্দরের পাশের একটি মাঠে দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানটি। এতে নিহত হন বিমানে থাকা ৪৯ জন। এর মধ্যে বিমানের যাত্রী ছিলেন ৪৫ জন, বাকিরা ওই বিমানের ক্রু।

এরপর ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে আবারও দুর্ঘটনার শিকার হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান। সেবারের ঘটনাস্থল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। জরুরি অবতরণের সময়ে ‘ফকার এফ২৮’ মডেলের বিমান কুয়াশার কারণে রানওয়ের পাশের ধানক্ষেতে পড়ে। এতে বিমানটি মাঝখান থেকে দু’ভাগ হয়ে গেলেও কেউ নিহত হননি। বিমানে থাকা ৮৫ জন যাত্রীর মধ্যে আহত হন ১৭ জন।

এরপরে ২০০১ সালে আবারও সিলেট বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে একই বিমান পরিচালন সংস্থার একই মডেলের বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। তবে এবারও কেউ নিহত হননি।

এরপরে ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর আবারও সিলেট বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটে। সেবারও ‘ফকার এফ২৮-৪০০০’ মডেলের বিমান আলোচনায়। বিমানটি সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে নামতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে যায়। কিন্তু এতে বিমানের থাকা ৮৩ জনের মধ্যে ৮ যাত্রী আহত হন।

সবশেষ দেশের মাটিতে দুর্ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি। ঘটনাস্থল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সে সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসা ‘বিজি-৫২’ বিমানের ইঞ্জিনে ঢুকে পড়ে একটি পাখি। এতে বিমানটি জরুরি অবতরণে বাধ্য হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই বছরের ৯ মার্চ কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের সময় একটি কার্গো বিমান বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। তাতে বিমানের ৪ জন ক্রু প্রাণ হারান।

সবশেষ গতকাল ১২ মার্চ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫০ জনেরও বেশি আরোহী প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

সারাবাংলা/এটি

রোকসানা, লারা, হৃদি, পৃথুলার স্বপ্নডানা ভাঙার গল্প
রোকসানা, লারা, হৃদি, পৃথুলার স্বপ্নডানা ভাঙার গল্প