বৃহস্পতিবার ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

রোহিঙ্গা সংকট, আশ্রয় ও মানবিক বাংলাদেশ

ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭ | ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

এ বছর বিশ্বব্যাপী আলোচিত বিষয় রোহিঙ্গা নির্যাতন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থেকে নির্যাতনের ভয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১০ লাখ রোহিঙ্গা। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত এসেছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা। বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে মানবিক এক দেশ হিসেবে। মাদার অব হিউম্যানিটি খেতাব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সালতামামি পর্বে জেনে নেওয়া যাক রোহিঙ্গা সংকটের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ভয়াবহ ২৫ আগস্ট
পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন কর্মীকে হত্যার অভিযোগে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে সন্ত্রাস নির্মূল কার্যক্রম হাতে নেয়। এতে নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু হয় খুন, ধর্ষণ, হত্যাসহ অমানবিক নির্যাতন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম। যা জাতিগত নিধন এবং গণহত্যায় রূপ নেয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা
বেসরকারি আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইন্টার সেকটর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ এর হিসাব অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। যার মধ্যে ৫ লাখ ৪৭ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। ২ লাখ ৪২ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের অন্য শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। ৭৯ হাজার রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বসত-বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান জানান, প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা মোট ৮ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিবন্ধন শেষ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে বেশির ভাগই এসেছেন গত ২৫ আগস্টের পর। নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২ লাখেরও বেশি শিশু। নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

sdr

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধন চলছে : জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসেইন বলেছেন, মিয়ানমারে মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যে নির্যাতন চলছে তা জাতিগত নিধনের শামিল। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী লক্ষ্য করে দেশটির সেনাবাহিনী যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে তা পাঠ্য-পুস্তকের জন্য জাতিগত নিধনের উদাহরণ হয়ে থাকবে। মিয়ানমারে যে অভিযান চালানো হচ্ছে তা দেশটির উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই হচ্ছে। এটা একটি পরিকল্পিত অভিযান। এই অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক উপ-হাইকমিশনার ক্যালি ক্লিমেন্টস জানান, রাখাইনে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত পরিবেশ নেই। রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ বসত-ভিটাই পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত ত্রাণ তৎপরতা নেই। মানবাধিকার কর্মীদেরও ওই অঞ্চলে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

dav

ফিরিয়ে নিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর দপ্তরের মন্ত্রী চ টিন্ট সোয়ের এতে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।

ফিরিয়ে নিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন  
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সঙ্গে সই হওয়া সমাঝোতা স্মাক্ষরের আওতায় গত ১৯ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ১৫ জন করে মোট ৩০ জন সদস্য এই কমিটিতে রয়েছে। এই ওয়ার্কিং গ্রুপ কীভাবে কাজ করবে তা এখনো খোলাসা করেনি দুই দেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব
নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ দফা প্রস্তাব দেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে এই প্রস্তাব দেয় প্রধানমন্ত্রী। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে, অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা ও জাতিগত নিধন বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলকে প্রবেশ করতে দিতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিতে জাতিসংঘের আওতায় মিয়ানমারে সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করতে হবে। রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে তাদের নিজস্ব বসত-বাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুর্নবাসন নিশ্চিত করতে হবে। কফি আনান কমিশনের সুপারিশ নিঃশর্তে বাস্তবায়ন করতে হবে।

dav

৯ হাজার রোহিঙ্গা হত্যা
যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ নিয়ে কাজ করা ফ্রান্স ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সেচ্ছাসেবি সংস্থা মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানায়, গত আগস্টে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমার। গত ২৪ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে হত্যা করেছে মোট ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে। যার মধ্যে ৫ বছর বয়সের নিচে ৭৩০ জন শিশু রয়েছে। ৭৯ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বন্দুকের গুলিতে। ৯ শতাংশকে তাদের বাড়ি-ঘরে দেয়া আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ৫ শতাংশকে মারতে মারতে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, শিশুদের মধ্যে ৫৯ শতাংশকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৫ শতাংশকে আগুনে পুড়িয়ে, ৭ শতাংশকে মারতে মারতে এবং ২ শতাংশকে স্থল মাইনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।

এমএসএফের জরিপে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা হত্যার তথ্য উঠে আসলেও মিয়ানমার বলছে মাত্র ৪০০ রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে। এমএসএফ বলছে, মিয়ানমার রাখাইনে যে গণহারে হত্যা চালিয়েছে তা স্পষ্ট। যে কারণে ৬ লাখ ৪৭ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। জাতিগত নিধনের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিসি) মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযোগ দায়েরের সুপারিশ করেছে এমএসএফ।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পেতে আইনি বাধা নেই 

সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অনুপ কুমার চাকমা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণভাবে সবাই বলে যে নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ছে। এটা ঠিক না। আসলে নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীন করেনি। ১৯৪৮ এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের নাগরিক হতে কোনো বাধা নেই। বিষয়টি হচ্ছে যে মিয়ানমারের প্রশাসন কিছু জটিলতা করে রেখেছে যাতে রাখাইনের জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ব না পায়। আবার এই নাগরিকত্ব আইন বিষয়ে রোহিঙ্গারাও সচেতন না।’

১৯৪৮ সালের ইউনিয়ন নাগরিকত্ব আইনের ৩ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানে মিয়ানমারের উপজাতি বলতে বোঝানো হবে যে আরাকানিজ, বার্মিজ, চিন, কাচিন, কারিন এবং মঙদের বোঝাবে।

৩ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ২ পূর্ব পুরুষ যদি বার্মায় জীবন কাটায় অথবা তাদের যদি এই অঞ্চলে স্থায়ী আবাস থাকে অথবা কোনো ব্যক্তির পিতামাতা এবং সে নিজে যদি এই অঞ্চলে জন্ম নেয় তবে সে বার্মার নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা রাখবে।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৬ নম্বর প্যারার এইচ চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে, এই আইন তৈরির সময় বা আগে যে ব্যক্তি মিয়ানমারের নাগরিক স্বীকৃতি পেয়েছে তিনি এই আইনের বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব লাভ করবে।

রোহিঙ্গা সুরক্ষার বিপক্ষে রাশিয়া ও চীন
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘসহ বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করলে ব্যতিক্রম ভূমিকা দেখা গেছে রাশিয়া, চীন, ভারতসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের একাধিক অধিবেশনে পদক্ষেপ নেয়া হলেও রাশিয়া এবং চীনের ভেটো দেয়ার কারণে তা আটকে যায়। আর ভারত ওইসব অধিবেশনে ভোট দেয়নি।

সর্বশেষ (এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত), ইসলামিক দেশগুলোর জোট ওআইসি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গত ২৪ ডিসেম্বর রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাব উত্থাপন করে।

ওআইসির প্রস্তাবে বলা হয়, অবিলম্বে মিয়ানমারে সেনা অভিযান বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিতে হবে। বাস্তুচ্যত রোহিঙ্গাদের তাদের বসত-ভিটায় ফিরিয়ে নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের বিশেষ দূতসহ আর্ন্তজাতিক ত্রাণ, সহায়তা ও মানবাধিকার কর্মীদের মিয়ানমারে কাজ করার অনুমতি দিতে হবে।

ওআইসির এই প্রস্তাবের আহ্বানে জাতিসংঘের অধিবেশনে ১২২টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়। ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে ২৪টি দেশ। রাশিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, লাওস, ভিয়েতনামসহ ১০টি দেশ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়।

নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে মিয়ানমার। কিন্তু চুক্তি করার দিনেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনের বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। সার্বিক পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মধ্যে এখনো কোনো আন্তরিকতা দেখা যায়নি।

সারাবাংলা/জেআইএল/একে

Tags: , ,

রোহিঙ্গা সংকট, আশ্রয় ও মানবিক বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা সংকট, আশ্রয় ও মানবিক বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা সংকট, আশ্রয় ও মানবিক বাংলাদেশ