মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

শিল্পকর্মে সাজানো ছিমছাম এক অন্যরকম ঘর

অক্টোবর ২৯, ২০১৮ | ১:৩৪ অপরাহ্ণ

তিথি চক্রবর্তী।।

‘অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে আত্মিক শান্তি থাকে না, সাদামাটাভাবেই জীবনটাকে যাপন করতে হয়’- কথাগুলো বলছিলেন তারেকুল ইসলাম। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী।  শিল্পের প্রতি গভীর ভালবাসা ও অনুরাগ থেকেই নিজের ঘর সাজিয়েছেন মনের মতো করে। যেখানে দামী আসবাবপত্র কিংবা কার্পেটের জৌলুস নেই, দেওয়ালে চোখ ধাঁধানো রঙ ব্যবহার করা হয়নি। তবে তাতে সৌন্দর্যের একটুও কমতি ঘটেনি। তারেকুল ইসলামের ঘরটি দেখলে একজন সত্যিকার শিল্পীর অপূর্ব শিল্পমনের পরিচয় পাওয়া যায়।  তারেক মনে করেন, ‘সিমপ্লিসিটি ইজ দ্য বেস্ট’।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                       

তার বসার ঘরটি অত্যন্ত ছিমছাম। সোফা রাখেননি, তবে ঘর সাজানো হয়েছে দেশ বিদেশ থেকে আনা নানা ধরনের শো পিস, মুখোশ, মাটির তৈজসপত্র আর নামকরা চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবি দিয়ে। ঘরের একপাশের দেওয়াল শুধু ইট দিয়ে গাঁথা আছে, ইচ্ছে করেই প্লাস্টার করেননি, জানালেন তিনি। মূলত এই অংশটিই সাজিয়েছেন নানারকম শিল্পকর্ম দিয়ে।

 

কখন থেকে ঘর সাজানোর আগ্রহ জন্মালো, জানতে চাইলে তিনি অল্প কথায় নিজেকে তুলে ধরেন। প্রায় ১৮ বছর থিয়েটারের সাথে যুক্ত ছিলেন। তখন থেকেই মূলত ঘর সাজানোর আগ্রহ জন্মে তার। এরপর দেশ বিদেশ থেকে নানা শিল্পকর্ম সংগ্রহ করে তিলে তিলে সাজিয়েছেন তার ঘর। তাছাড়া শখ করে ফটোগ্রাফিও করেন তিনি। স্টিল ফটোগ্রাফির প্রতি ভালবাসাও ঘর সাজানোর আগ্রহতে বাড়তি মাত্রা যোগ করছে, জানালেন তারেকুল ইসলাম।

 

নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভীষণ ভালবাসেন তিনি। মনে করেন, বিভিন্ন জায়গায় গেলে নিজের অনেক ধারণা পাল্টে যায়। নানা ধরনের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে এবং জীবনকে বড় করে দেখার সুযোগ হয়। তবে ঘুরতে গেলেও মাস্ক, বই, শো পিস কিংবা যেকোন শিল্পকর্ম কিনে আনতে ভুল হয় না তার। দামি পোশাক কেনার চেয়ে নানা ধরনের বই ও শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতেই ভালবাসেন তিনি।

 

 

মাস্ক বা মুখোশ সংগ্রহের প্রতি তার রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। নানান দেশে ঘুরতে গেলে কিনে আনেন মাস্ক। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দেশের মাস্ক সম্পর্কে জানতে তার সংগ্রহে আছে অনেকগুলো মাস্ক বুক।

এই প্রসঙ্গে তারেকুর ইসলাম জানান, এক ডাচ বন্ধুর মায়ের কাছ থেকে এই বইগুলো উপহার হিসেবে পেয়েছেন। বইগুলো পেয়ে মাস্ক কেনার প্রতি উৎসাহ আরও বেড়ে গেছে বলে জানালেন তিনি।

 

পুরনো বা অব্যবহৃত জিনিসও শিল্পকর্মের অংশ হতে পারে। চারুকলার শিক্ষার্থী নাসির আহম্মদের তৈরি করা এমনই দুটি শিল্পকর্ম দেখালেন । পুরনো কোদালের ফাল, নিরানি, লাঙ্গলের ফাল, তাওয়া আর পুরনো চাবি দিয়ে তৈরি করা এই দুটি অপূর্ব শিল্পকর্ম দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

 

মাটির কলস ও লাটিম ঘরের একপাশে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কোরবানি ‍ঈদে মাংস কাটার জন্য যে কাঠের গুঁড়ি ব্যবহার করা হয়, তার একটি গুঁড়ি এনেছেন গ্রামের বাড়ি থেকে। তাতে নানা ধরনের শো পিস সাজিয়ে রেখেছেন।

 

 

মূল দরজার পাশেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা পাঁচটি ছবি। ছবিগুলো রোম থেকে কিনে এনেছেন এই সৌখিন মানুষটি।

 

 

রান্নাঘরের দেওয়ালে ছোট্ট ফাঁকা জায়গায় একটি বুদ্ধ মূর্তি রেখেছেন, যা ঘরের সৌন্দর্য্য আরেকটু বাড়িয়ে তুলেছে। কোথা থেকে এটি সংগ্রহ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেদারল্যান্ড থেকে  এনেছেন।

 

 

ওই দেশে একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়। তাই প্রত্যেকটি বাসায় অন্তত একটি করে মূর্তি থাকে। দেখতে ভাল লাগে বলে তিনিও একটি  নিয়ে এসেছেন। এর পাশে রেখেছেন বাকুরার অসাধারণ শিল্পকর্ম, যাকে বলা হয় ডোকরা।

 

 

 

পড়ার ঘরে একটি বিশেষ ধরনের মাস্ক আছে। এই মাস্কটি মাশরুম গাছের কাঠ থেকে তৈরি হয়েছে।  ভুটান থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন এটি। পড়ার ঘরের দরজার পাশে ঝুলিয়ে রেখেছেন লোহা ও মাটির তিনটি সরা। মাটির সরায় পেঁচা, আর লোহার সরার একটিতে রবীন্দ্রনাথ ও অন্যটিতে রাণী নেফারতিতিকে আঁকা হয়েছে। শোবার ঘর সাজিয়ে রেখেছেন ভ্যানিস মাস্ক ও বার্মিজ পুতুল দিয়ে।

 

 

 

মূল দরজার পাশে রেখেছেন কতগুলো আফ্রিকান পেইন্টিং। শিল্পী শাহীনুর রহমানের আঁকা কয়েকটি ছবিও ঘরের সৌন্দর্য্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

 

 

 

নেদারল্যান্ড ও এদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকগুলো চেরাগ বাতি সংগ্রহ করেছেন তারেকুল ইসলাম। একটি সেলফের নিচে সাজিয়ে রেখেছেন চেরাগ বাতিগুলো। আর সেলফের উপরে রেখেছেন পূজার ঘন্টা, কাঠ ও মাটি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের শো পিস।

 

 

 

সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে জেলেরা যে বাতি ব্যবহার করে সেটিও ঘরের একপাশে সাজিয়ে রেখেছেন তিনি।

 

 

শিল্পের প্রতি ভালবাসা থেকেই তিনি এভাবে ঘর সাজানোর আগ্রহ পেয়েছেন। তবে কারো কারো বিরূপ মন্তব্য তাকে হতবাক করে, জানালেন তারেকুল ইসলাম। অনেক সময় কাছের আত্মীয়-স্বজন তার বাসায় বেড়াতে এসে বলেন, ‘মুসলিম পরিবারে শিল্পকর্ম থাকতে নেই। তাতে ধর্মকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করা হয়।’ এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ থেকে দূর না হলে শিল্প ও শিল্পীর মুক্তি সম্ভব না।

 

 

তারেকুল ইসলাম মনে করেন, প্রকৃতিকে দিলে প্রতিদানে প্রকৃতি কখনও ফিরিয়ে দেয় না।

আসলেই প্রকৃতি ফিরিয়ে দেয়নি তাকে। ইট পাথরের এই শহুরে জীবনে তার ছাদবাগানটি এক স্বর্গরাজ্য। যেখানে চোখের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হতে বাধ্য।

ছাদ বাগানে লাগিয়েছেন নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ। জবা, অলকানন্দা, নয়নতারাসহ নানা ধরনের ফুলগাছ আছে তার বাগানে। জবা আছে কয়েক ধরনের- হলুদ জবা, মরিচ জবা, হাজারি জবা, রক্ত জবা, সাদা জবা, গোলাপী জবা।

কিছু ফল ও সবজির গাছ লাগিয়েছেন, যেগুলো পুরো পরিবেশে গ্রাম্য আবহ সৃষ্টি করেছে। সরিষা, মিষ্টি আলু, গাছ আলু, পেয়ারা গাছ, জামগাছ আতা ফল, থানকুনি পাতা, পুঁই শাক আরও কত কী!

চিতালিলি নামে একটি ফুল গাছ আছে , যা জীবনে প্রথমবার দেখা হলো আমাদের। বনসাঁই, হিজল ও নিমগাছ অন্যরকম মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে। মাটির একটি বড় পাত্রে ছেড়েছেন গাপ্পী মাছ। আর এতে দিয়েছেন কচুরিপানা, যা বাগানের পরিবেশকে বাড়তি সৌন্দর্য্য দিয়েছে।

বিভিন্ন দেশের মগ সংগ্রহ করা তারেকুল ইসলামের অন্যতম শখ। তাই ঘুরতে গেলে সেখানকার স্মৃতি স্বরুপ কিছু মগ নিয়ে আসেন।

 

 

অপূর্ব এই শিল্পীমন নিয়ে তারেকুল ইসলাম সাজিয়েছেন তার ঘর ও বাগান। যা মুগ্ধতা ছড়াতে বাধ্য।

 

আলোকচিত্র- আশীষ সেনগুপ্ত

 

সারাবাংলা/ টিসি/ এসএস

 

শিল্পকর্মে সাজানো ছিমছাম এক অন্যরকম ঘর
শিল্পকর্মে সাজানো ছিমছাম এক অন্যরকম ঘর
শিল্পকর্মে সাজানো ছিমছাম এক অন্যরকম ঘর