শুক্রবার ২০ জুলাই, ২০১৮, ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

`শীতে প্রতিরাতেই মরে যাই, সকালের রোদে আবার বেঁচে উঠি’

জানুয়ারি ১৪, ২০১৮ | ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা : জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকদের আমরণ অনশনের ৬ষ্ঠ দিনে এসে অসুস্থের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৪ জনে। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছেন ৬ জন। এর আগে মেডিকেল থেকে চিকিৎসার পর ছাড়পত্র নিয়ে সবাই অনশনে ফিরেছেন। শিক্ষক নেতাদের দাবি, তীব্র শীত আর অনাহারে প্রাণ সঙ্কটাপন্ন হলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত  রাজপথ ছাড়ছেন না।

রোববার(১৪ জানুয়ারি)সকাল থেকে প্রতিদিনের মতো মাইক বেজে উঠে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকদের আন্দোলনের মঞ্চে। এর সঙ্গে সঙ্গে আড়মোড়া ভাঙ্গে শিক্ষকরা। কেউ কেউ উঠে বসে পড়েন মঞ্চমূখী হয়ে। শিক্ষক নেতাদের তৎপরতায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৬ষ্ঠ দিনের অনশন কর্মসূচী। যদিও অসুস্থদের তালিকা দীর্ঘ হওয়ায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের এ রাজপথ এখন যেন হাসপাতালের কোনো ওয়ার্ড। বিভিন্ন স্থানে অসুস্থ শিক্ষকদের আহাজারি লক্ষ্য করা গেছে।

শিক্ষক নেতা আবু সাইদ জানান, সরকারের কাছে আবেদন করেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া যায়নি। আমাদের শিক্ষকদের অবস্থা খুবই করুন। এ অবস্থায় আমরা আতঙ্কিত। কখন কোন দু:সংবাদ আসে। যদি সত্যিই কারো মৃত্যু হয় তবে তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

দুপুরে শিক্ষকদের সঙ্গে সংহতি জানাতে আসে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। এসময় শিক্ষকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক বলেন, এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এইসব গরীব লোকগুলোকে রাস্তায় অভুক্ত রেখে সরকার উন্নয়নের গান গেয়ে বেড়ায়। অথচ তীব্র শীতে অনাহারে মৃত্যুকে আলিঙ্গণের পথে শিক্ষকরা। এসব শিক্ষকের যদি কিছু হয়, তবে আপনারাও গদিতে বসে থাকতে পারবেন না। তাই সময় থাকতে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিন। তাদের কাছে প্রতিনিধি পাঠান।

তিনি আরো বলেন, দেশে এতো এতো মন্ত্রী নিয়োগ করেন। অথচ আপনার সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো কাজই হয় না। তাহলে জনগণের টাকায় এতো এতো পুতুল নিয়োগ করে কী লাভ। আপনিই সকল ক্ষমতার কেন্দ্র এসব বঞ্চিত শিক্ষকদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিন। এসময় তিনি তার দলের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের সাধ্য অনুযায়ি সহায়তার আশ্বাস দেন।

তার এ বক্তব্যের সময় অনশনস্থলের মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের শিক্ষক আব্দুর রশীদকে কাঁদতে দেখা যায়। পঞ্চাশোর্ধ এই শিক্ষক সারাবাংলাকে বলেন, চাকুরি জীবনের আর বেশি বাকি নেই। এখন শেষ মূহুর্তে যদি সরকার বেতন-ভাতা না দেয় তবে কষ্ট আর বঞ্চনা নিয়ে মরতে হবে। পরিবারের দু:খ-দুর্দশার কথা জানিয়ে সারাবাংলাকে এ শিক্ষক আরো বলেন, আজ প্রায় দুই সপ্তাহ রাজপথে আছি। শরীর আর কুলোয় না। রাতে শীতে অনেক কষ্ট হয়। অপেক্ষায় থাকি কখন সকাল হবে। একটু রোদ আর মানুষের কোলাহল শুনবো। আমরা প্রতি রাতেই মরে যাই আবার সকাল বেলা যেনো বেঁচে উঠি।

এদিকে অসুস্থ শিক্ষকদের চিকিৎসায় সহায্যের  হাত বাড়িয়েছেন কোনো কোনা হৃদয়বান ব্যক্তি। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় রবিবারও একজন ব্যবসায়িকে দেখা গেছে চিকিৎসার জন্য অনুদান দিতে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ওই ব্যক্তি জানান, গণমাধ্যমের খবরে এসব শিক্ষকদের করুন অবস্থার কথা গেল কয়েকদিন ধরে শুনে আসছি। তীব্র শীতে মানুষ যেখানে ঘর থেকে বের হতে চায় না সেখানে কী করে তারা এই খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন, ভাবতেই কষ্ট হয়। এইসব গরীব শিক্ষকদের চিকিৎসার জন্য তাই সামান্য কিছু টাকা অনুদান দিতে পেরে অনেক শান্তি লাগছে।

আন্দোলন সম্পর্কে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতির মহাসচিব কাজী মোখলেসুর রহমান বলেন, আমাদের বক্তব্য পুরনো। দাবি আদায় না হলে আমরা এখানেই মারা যাব। তবুও খালি হাতে ফিরবো না।

সারাবাংলা/এমএস/জেডএফ

`শীতে প্রতিরাতেই মরে যাই, সকালের রোদে আবার বেঁচে উঠি’
`শীতে প্রতিরাতেই মরে যাই, সকালের রোদে আবার বেঁচে উঠি’