সোমবার ১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২রা রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

শীত তাড়ানোর আগুনে পুড়ে বার্ন ইউনিটে বাড়তি চাপ

জানুয়ারি ১২, ২০১৮ | ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ভৈরব থেকে ৬২ বছরের ফুপাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে এসেছেন শফিকুল ইসলাম। গত ৭ জানুয়ারি ভৈরব থেকে এখানে নিয়ে এসে সেদিনই তাকে ভর্তি করা হয়েছে। শফিকুল জানান, গরম পানি নিয়ে বাথরুমে গোসল করতে যাবার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যান তিনি। আর সে সময় হাতে থাকা গরম পানির বালতির পুরোটা তার পুরো শরীরকে ঝলসে দেয়।

আর আগুন পোহাতে গিয়ে ৫৮ বছরের রাহেলা খাতুনের প্রথমে শাড়িতে এবং পরে শরীরে আগুন লেগে যায়। চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের ৩৮ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। কেবল শফিকুল ইসলাম এবং রাহেলা খাতুনই নন, পুরো বার্ন ইউনিট অগ্নিদগ্ধ রোগীতে ভর্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবারই শীতের সময় বার্ন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু এ বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ১৫০ জনের হাসপাতালে রোগী রাখতে হচ্ছে ৪ গুণেরও বেশি রোগীকে।

১০ জানুয়ারি ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে। হাসপাতালের বেড, বারান্দায় এমনকি পঞ্চম তলার সিঁড়ির নিচেও ঠাঁই হয়েছে রোগীদের।

কেবল, আগুনে পোড়াই নয়, ইলেকট্রিক তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে, গরম পানিতে শরীর পুরে যাওয়া রোগীরাও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসছেন এই বার্ন ইউনিটে। চিকিৎসকরা বলছেন, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও যদি পুড়ে যাওয়া রোগীদের সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকতো, হাসপাতালের বার্ন ইউনিটগুলোতে যদি এসব রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া যেত তাহলে রোগীদেরকেও দূর দূরান্ত থেকে ঢাকায় আসতে হতো না আর এই হাসপাতালের ওপর এতো চাপ পরতো না। রোগীদের চাপ সামলাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি বলেন চিকিৎসকরা।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, বার্ন ইউনিটে যেটা কখনই করা হয়নি সেটাই এবার করতে হচ্ছে আমাদের। রোগীর চাপে আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ‘রিস্কলেস’ রোগীদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে টিউমার বা এ ধরণের রোগীদের আমরা কয়েকদিন পর আসার জন্য বলে দিচ্ছি, এছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।

গত দুইদিন ধরে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত সোমবার রাতে এই ভবনের ট্রলিতে, অবজারভেশন রুমে পর্যন্ত রোগী রাখতে হয়েছে। লিফট থেকে নেমে দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। তারপর থেকেই আমরা কিছুটা ড্রেসিং করে যাদেরকে বাসায় ফেরত পাঠানো যায়, তাদেরকে হাসপাতালে না রেখে কেবলমাত্র যাদেরকে ভর্তি করতে হবে এবং যাদের লাইফ রিস্ক রয়েছে তাদেরকেই গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। আমাদের আসলে জায়গা নেই- আমরা কী করবো? বলেন  ডা. তানভীর আহমেদ।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শারমিন সুমী সারাবাংলাকে বলেন, প্রতিবছরই শীতের সময়ে বার্ন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু এ বছর সেটা আরও বেড়েছে। প্রতিদিন এখানে ভর্তি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী। আর জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছে এর প্রায় তিনগুণ। আর যাদের জীবনের কোনও ঝুঁকি নেই তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে, ড্রেসিং করিয়ে এবং প্রয়োজন মতো পুনরায় হাসপাতালে আসার অনুরোধ জানিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সারাবাংলাকে বলেন, বার্ন ইউনিটে বেডের সংখ্যা ১০০, আমরা তারপরও ১৫০ জন রোগীকে রাখতে পারি। কিন্তু এবারের শীত বার্নের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ১৫০ রোগীর হাসপাতালে গত কয়েকদিন ধরে রোগী থাকছে চার গুণের বেশি।


তিনি বলেন, রংপুরে কেবলমাত্র আগুন পোহাতে গিয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে, অগ্নিদগ্ধ হয়েছে ৫০ জনের ওপরে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা আরও কয়েকজনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের কাছে আসা রোগীদের মধ্যেও বেশিরভাগ এই আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হচ্ছে।

যেমন করে শীত বেড়েছে তেমনি করে বেড়েছে দগ্ধ হওয়া রোগীর সংখ্যা। এই হাসপাতালে জায়গা দিতে না পেরে আমরা রোগীদের বাধ্য হয়ে বাড়ি পাঠাচ্ছি, সেই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

তবে পুড়ে যাওয়া রোগীদের ভেতরে সহায়-সম্বলহীন মানুষই বেশি জানিয়ে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, এই হাড়-কাঁপানো শীত থেকে বাঁচার জন্য তাদের ভালো উপকরণ না থাকাতে আগুণ পোহানোই তাদের অবলম্বন। কিন্তু তার জন্য যে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার সেটা না করাতে এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। আর তাই কেবলমাত্র সচেতনতাই পারে এই অগ্নিদগ্ধের ঘটনা রোধ করতে। একইসঙ্গে গরম পানি বহন করার সময় হাড়ি বহন না করে বালতি বহন করা এবং রান্না করার সময়ে শাড়ি, ওড়না সাবধানে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

কেবলমাত্র সচেতনাই আগুন থেকে পুড়ে যাবার অন্যতম উপায় বলে জানান ডা. সামন্ত লাল সেন।

সারাবাংলা/জেএ/জেডএফ/এমএ

 

 

 

Tags: ,

শীত তাড়ানোর আগুনে পুড়ে বার্ন ইউনিটে বাড়তি চাপ
শীত তাড়ানোর আগুনে পুড়ে বার্ন ইউনিটে বাড়তি চাপ
শীত তাড়ানোর আগুনে পুড়ে বার্ন ইউনিটে বাড়তি চাপ