শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ৭ মাঘ, ১৪২৪, ২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

Live Score

সন্তানহীন নারীর মর্যাদা এই সমাজের চোখে কোথায়?

ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ | ১২:৫০ অপরাহ্ণ

মারজিয়া প্রভা

২০১৬ সালের ৩০ মে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরোদান এক টিভির ভাষণে বলেন, যেসব নারী মা হতে অনীহা প্রকাশ করে সেসব নারীর জীবন অসম্পূর্ণ।

এই বক্তব্য দিয়ে তিনি তুরস্কের সাধারণ জনগণকে জন্মবিরতিকরণ ব্যবস্থা নিতে অনুৎসাহী করেছিলেন। এরোদান দেশের প্রেসিডেন্ট। তার এই মতামতকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এটুকু ভেবে শংকিত হতে হয় যে, প্রেসিডেন্ট এরোদানের মত এই সমাজের অধিকাংশ মানুষই ভাবেন, সন্তানই কেবল নারীর জীবন সম্পূর্ণ করতে পারে।

সন্তান জন্ম দেওয়া একজন নারীর অনন্য ক্ষমতা সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়াই একজন নারীর জীবনে সবকিছু নয়। আমাদের সমাজে সন্তানহীন নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। সন্তান জন্মদানে অক্ষম একজন নারীকে বাঁজা, আঁটকুড়ি প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। শুধু তাই নয়, এখনো এই সমাজে ট্যাবু আছে সন্তানহীন নারী কোন শুভ কাজের জন্য অশুভ। তাই বিয়ে বা নতুন সন্তানের প্রথম ভাত খাওয়ার উৎসবের আয়োজনে সন্তানহীন নারীকে থাকতে দেওয়া হয় না- এমন ঘটনা এখনও ঘটে।

নীরা (ছদ্মনাম) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে দেশে বিদেশে নাম কুড়িয়েছেন। ১৪ বছর বিবাহিত জীবন চলছে তার। শারীরিক কিছু সমস্যার কারণে তিনি এখনো মা হতে পারেননি। এই কথাগুলো আত্মীয়স্বজন সকলেই জানেন। তবুও পারিবারিক পার্টিতে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়, “কেন বাচ্চা হয় না? সমস্যা কি তোমার না তোমার স্বামীর? যদি তোমার হয়ে থাকে তবে তুমি স্বামীকে আবার বিয়ে করতে বলছ না কেন?”

নীরা এই প্রতিবেদককে জানান, সন্তান নেই বলে তার স্বামী কখনোই হীনম্মন্যতা প্রকাশ করেন না। তারা বহু ডাক্তার দেখিয়েছেন, চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু জন্মগতভাবে নীরার ভ্যাজাইনাল লেন্থ অনেক বড়। তাই শুক্রাণু ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে জাইগোট উৎপন্ন হতে পারছে না। এই কথা জানানোর পর থেকে তারা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (কৃত্রিম জন্মপদ্ধতি) এর জন্য ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম ধাপে তারা অসফল হন। বাচ্চা নেওয়ার জন্য চেষ্টা তারা এখনো করছেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের কটু কথায় নীরার মনোবল ভেঙ্গে যায়।

নীরার মতে, ইচ্ছে করে বেশিরভাগ নারী সন্তানহীন থাকে না। শারীরিক জটিলতা যেমন- বড় ভ্যাজাইনাল লেন্থ, হরমোনাল ইমব্যালেন্স, ইকটোপিক প্রেগন্যান্সি প্রভৃতি কারণে একজন নারী সন্তান জন্মদানে অক্ষম হতে পারেন। কিন্তু সমাজ কখনো সন্তান জন্মদানে অক্ষম নারীকে মেনে নিতে পারে না। আজ আমার জায়গায় আমার স্বামী অক্ষম হলে তারা কেউ কখনো বলত না, আমি যেন আমার স্বামীকে ছেড়ে আরেকজনকে বিয়ে করি।

২০১৬ সালের থেরেসা মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রাইম মিনিস্টার হিসেবে মনোনীত হন। তার বিরুদ্ধ প্রতিপক্ষ ছিলেন আন্দ্রেয়া লিডসম। থেরেসা কখনো মা হতে পারবেন না। আর তাই আন্দ্রেয়া ভাষণে জানান, আমিই ইউকে এর পরবর্তী প্রাইম মিনিস্টার হবার যোগ্যতা রাখি। কারণ আমার সন্তান আছে। তারা আমার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়। সেটা ভাইবোনের সন্তান বা অন্য লোকেরা পারে না।

আন্দ্রেয়ার এই ভাষণে ইউকের সন্তানহীন নারীরা ভীষণ ভেঙ্গে পড়ে। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এলিজাবেথ ডে এর বিপক্ষে বলেন, আমি সন্তানহীন নারী বলে কি আমার সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দেবার কোন অধিকার নেই? আমি সন্তানহীন বলে একজন মায়ের মত করে বুঝতে সক্ষম নই? প্রতিদিনকার আবেগজনিত জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে পারব না?

এলিজাবেথ তার বক্তব্যে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সন্তানহীন বাবাদের বেলায় সমাজ নিশ্চুপ! সেক্ষেত্রে রাজনীতি বা অন্য কোন স্থানে উচ্চপদে আসীন হতে তাদের বাঁধা পেতে হয় না! সব বাঁধা কেবল সন্তানহীন নারীরই!

ইউএসএ’র womenhealth.org এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় শতকরা দশ ভাগ নারী সন্তানজন্মদানে অক্ষম। প্রায় ৬.১ মিলিয়ন নারী প্রেগন্যান্ট হতে পারেন না বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে। এই অর্গানাইজেশনের ভিত্তিতে সন্তান জন্মদানে অক্ষম ব্যাপারটিকে নারীর জন্য “সাধারণ” একটি সমস্যা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজের তির্যক দৃষ্টিতে এই সাধারণ সমস্যাই সাধারণ একটি মেয়ের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার জন্য যথেষ্ট।

সন্তান জন্ম দিতে না পারার কারণে কিভাবে স্বামী দ্বারা অত্যাচারিত হতে হয় তা আমরা নার্গিস আখতার পরিচালিত “চার সতীনের ঘর” চলচ্চিত্রে দেখেছি। শেষ পর্যন্ত জানা গিয়েছিল, স্বামীটি নিজেই আসলে সন্তানদানে অক্ষম। কিন্তু তা বলে স্ত্রীদের কম যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি! এই প্রসঙ্গে রিলেশনশিপ এন্ড ডিপ্রেশন স্পেশালিষ্ট হাফসা ঝুমুর তার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, আমার কাছে একজন বিষন্নতা আক্রান্ত নারী এসেছিলেন। তার স্বামী কখনো বাবা হতে পারবেন না। এই সত্যটা তিনি কাউকে জানাতেন না। তাই বাবার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি উভয় জায়গা থেকেই তাকে নোংরা সমস্ত কথাবার্তা শুনতে হতো। একপর্যায়ে তিনি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে আসেন।

এ থেকে দেখা যায়, যদি স্বামী সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়, তবুও নারীটিকেই সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে যেতে হয়।

শুধু তাই নয়, বেশিরভাগ সাহিত্যে সন্তানহীন নারী তার স্বামীকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে উদারতা স্থাপন করে তা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু উল্টোটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  ঘটে না।

তাই সাহিত্য, সিনেমা সর্বোপরি গণমাধ্যম সবসময় “মাতৃত্ব মহান” প্রচার করার ফলে এমন দাঁড়িয়েছে, যে নারী মা হতে পারে না তার এই সমাজে কোনই মূল্য নেই।

কিন্তু কীভাবে সমাজে এই ধারণা প্রোথিত হল? আদিম সমাজেও কি সন্তানহীন নারীকে অচ্ছুৎ হতে হতো? এমনই এক প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষক, লেখক এবং অনুবাদক ফারহানা আজিম শিউলীর কাছে। তিনি জানান, ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদিম সমাজ মাতৃতান্ত্রিক ছিল। সেইসময় সন্তান জন্মদানকে সমাজে এতো বিশাল কিছু করে দেখা হতো না। পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা, রাষ্ট্র প্রভৃতি ধারণা আসার পরেই সন্তান জন্মদান সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ ব্যাক্তিগত মালিকানার সাথে উত্তরাধিকার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর উত্তরাধিকার বিষয়টির সঙ্গেই সন্তান জন্মদান সম্পৃক্ত।

শিউলীর মতে, আমরা কেবল ভেবে থাকি শিক্ষার অভাব এবং সুবিধাবঞ্চিত সমাজেই সন্তানহীন নারীরা নির্যাতিত। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, সমাজের সবস্তরেই মা না হওয়া একজন নারীর উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচার। প্রযুক্তি এগিয়ে গেছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে নারীরা সেই সন্তান জন্মদানের মেশিন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত একজন শিক্ষক মা হতে পারছিলেন না। অনেক চিকিৎসার পরে তিনি মা হলেন। কিন্তু জন্ম নিল যমজ কন্যাসন্তান। তাতেও সন্তুষ্ট ছিলেন না তারা। এরপরের সন্তানও কন্যা হয়। চতুর্থ সন্তান ছেলে হবার পরে তারা বিরতি দেন সন্তান জন্মদানে। এ থেকে বোঝা যায় শুধু সন্তান জন্ম দিলেই হবে না, নারীকে পুত্রসন্তান জন্ম দিতে হবে। সমাজ একজন আদর্শ নারীর কাছে এটিই চেয়ে আসছে।

সম্প্রতি এই বিষয়গুলো নিয়ে জনসম্মুখে এবং গণমাধ্যমে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে।  আজ থেকে দশ বছর আগে এই আলোচনা এতোটা সহজ ছিল না। আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যাগুলো নিরসনের পথ আমরা পেতে পারি।

শিউলী জানান, সন্তানহীন নারীর ক্ষেত্রে সমাজের এই তির্যক দৃষ্টি বদলের একমাত্র উপায় হচ্ছে নারীকে সমাজের সিদ্ধান্তদাতার (Decision maker)  ভুমিকায় আনা আর এটি তখনই সম্ভব, যখন প্রতিটি নারীই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং স্বনির্ভর হবেন।

অলঙ্করণ- আবু হাসান

ছবি- ইন্টারনেট

সারাবাংলা/এমপি/এসএস