বুধবার ২৪শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

সাবজেলে জন্ম নেয়া বেড়ালের ছানারা এখনো সঙ্গী!

জানুয়ারি ১, ২০১৮ | ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

মাহবুব স্মারক, বিশেষ প্রতিনিধি, একাত্তর টেলিভিশন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিড়ালটিকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘এই চল!’ অমনি বিড়ালটি দিলো এক লাফ। একেবারে তাঁর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল। একটু দ্রুত পায়েই তিনি এগিয়ে গেলেন গণভবনে সেই সন্ধ্যায় আয়োজিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মিটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কক্ষের দিকে। বিড়ালটিও চললো তাঁর পায়ে পায়ে।

এটি একটি গল্পের শেষাংশ। প্রথম অংশটি এরকম-

২০১৩ সালের মাঝামাঝি কোন এক সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী সভা ডেকেছিলেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সময়টায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে, এমন সভা গুরুত্বপূর্ণ বলে, আগেভাগেই আমরা সংবাদকর্মীরা গিয়ে পৌঁছাই গণভবনে।

গণভবনের নিচতলায় সুপরিসর বসার ঘর। বৈঠক শুরুর অপেক্ষা। সেখানে সংবাদকর্মীরা যেমন আছেন, অপেক্ষায় আছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর নানান পর্যায়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা।

দোতলা থেকে নেমে আমরা যে রুমটিতে রয়েছি সেই রুম ধরেই প্রেসিডিয়াম মিটিংএ যাবেন শেখ হাসিনা এমনটিই জানা। যেকোনও সময় নেমে আসতে পারেন, তাই আমরা সংবাদকর্মীরা খুব একটা নড়াচড়া করছি না। প্রেসিডিয়াম বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে নিজেদের মধ্যে। আর লক্ষ্য রাখছি কারা আসছেন, আর কে কী করছেন।
এসময় চোখে পড়ল একটি বিড়াল ঘুরঘুর করছে আমাদের আশেপাশে। ঝকঝকে, তকতকে পরিপাটি একটি রুমে বিড়াল! ঘুরঘুর করার ভঙ্গিতে মনে হলো কারো চোখ এড়িয়ে ঢুকে পড়েছে এমনটা হবার কথা নয়। তবে, বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো, কোত্থেকে এলো এই বিড়াল!

আমাদের সংবাদকর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন- কোথা থেকে এলো? কে আনলো?

এদিকে সে বিড়াল আবার সোফায়ও বসছে! অতিথি যারা সোফায় বসে আছেন, তাদের কোলেও উঠে পড়ছে। কেউ তাকে বিরক্ত করছেন না, তাড়াচ্ছেনও না। কেউ কেউ আবার বিড়ালের প্রশংসা করছেন। বোঝার চেষ্টা করছিলাম ঠিক কী কারণে বিড়ালের এমন প্রশংসা। নিশ্চয়ই এ যেনোতেনো বিড়াল নয়!

ভাবতে ভাবতে দেখি বিড়ালটা উঠে বসলো আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধুর কোলে। কোলে বসা বিড়াল নিয়ে তিনি ভয়ে রীতিমতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন। তা দেখে একটু মজা নিচ্ছিলাম। এরপর বিড়ালটা একের পর এক কোল বদল করতে শুরু করলো।

আগেই বলে রাখি, বিড়াল, পশু-পক্ষীতে আমার আগ্রহ যতখানি তারচেয়ে বেশি অহেতুক ভীতি। ছোট বেলায় অনেকের মতোই আমারও ঘরে বিড়াল পালতে দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। নানাবাড়িতে বিড়াল পালতে দেখেছি। আমার নানা-নানু বিড়ালদের খাবার দিতেন। যত্ন করতেন। তবে নানাবাড়ির এই সব বিড়ালের সাথে আমার সখ্যতা হয়নি কখনো। ফলে ভয়ও কাটেনি।

যা হোক। এদিকে, গণভবনের সেই প্রেসিডিয়াম বৈঠকের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অন্যদিকে বিড়ালটিও এর ওর কোলে চড়ার সাধ মিটিয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ কী বুঝে, ঝপ করে বিড়ালটি উঠে বসলো আমার কোলে! আমার তাতে ত্রাহি ত্রাহি দশা। অন্যরা আমার অবস্থা দেখে, মুচকি হাসছেন। কী করবো? কী করা উচিত? তাই ভাবছি মনে মনে। শরীরও হিম হয়ে আসছে। তার মাঝেও বিড়ালটিকে কোলেই সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি।

ঠিক তখুনি গণভবনের দোতলার আবাস থেকে নেমে এলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সবাই উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু হায়! আমার আমার কী হবে! আমি কীভাবে উঠে দাঁড়াবো বুঝতে পারছি না। এমনি সময় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চলে এলেন আমার সামনে! আমি আধা বসে, আধা দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। বিড়ালটা তখনও কোলে। নেমে যাবার চেষ্টা করছে না।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘খুব জ্বালাচ্ছে নাকি?!’ আমি বললাম, ‘না আপা!’

উনি বললেন, ‘না ও কোন সমস্যা করবে না, খুব ভালো।’ আমাকে বললেন, ‘উঠে দাঁড়ানোর দরকার নেই তুমি বসে থাকো।’
আমার সামনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছেন দাঁড়িয়ে আছেন আর, আমি বেড়াল কোলে নিয়ে বসে আছি ভাবুন একবার দৃশ্যটা!

ততক্ষণে বিড়ালটির কাহিনী বলতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আশেপাশে অনেক গণ্যমান্য। আমরা সবাই তখন প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে। তিনি জানালেন, এই বিড়ালটির মা ছিলো তাঁর সাথেই, সংসদ ভবনে স্থাপিত সাবজেলে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময়ের কথা। তখন এ বিড়ালটির জন্ম হয় সেই জেলখানায়।

সবাই জানেন যে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ২০০৭ সালের ১৬ই জুলাই গ্রেফতার হন। আর মুক্তিপান ২০০৮ সালের ১১জুন। সেই সাবজেলের একাকিত্বের দিনে বিড়ালগুলোই ছিলো তাঁর সঙ্গী।

জানালেন, সংসদ ভবনে স্থাপিত সাবজেলে জেল সুপার নিয়মিত আসতেন তাঁর সাথে দেখা করতে। তিনি যখন জেল সুপারের সাথে কথা বলতে যেতেন, সাথে যেতো বিড়ালগুলোও।

হাসতে হাসতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি রুমে ঢোকা মাত্র জেল সুপার বা ডেপুটি জেল সুপার উঠে দাঁড়াতেন চেয়ার ছেড়ে। অমনি টেবিল থেকে লাফ দিয়ে, বিড়াল দুটি দখলে নিতো জেলসুপারের চেয়ার।’

শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমি আমার চেয়ারে বসে পড়তাম। কিন্তু, আমার বিড়ালদের সরিয়ে নিজের চেয়ারে বসার সাহস ছিলো না জেলসুপারের। তিনি দাঁড়িয়েই থাকতেন।

‘জেলে ছিলাম ১১ মাস। বিড়াল দুটির কারণে আমার সামনে কোন দিন বসার সুযোগ পায় নাই জেলসুপার। তারা দাঁড়িয়ে কথা বলেছে আমার বিড়ালরা তাদের বসতে দেয়নি কখনো!’

‘আঁচড় খামচি দিয়েছি নাকি?’ এবার প্রশ্ন ছুড়লেন আমার দিকে।
আমি বললাম, ‘না আপা।’
উনি বললেন… ‘না ও খুব ভালো’!

এই বলে, একটা তুড়ি দিলেন। আর মুখে বললেন, ‘এই চল!’

অমনি বিড়ালটি দিলো এক লাফ। একেবারে তার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল। একটু দ্রুত পায়েই প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে গেলেন প্রেসিডিয়াম মিটিংয়ের দিকে। বিড়ালটিও চললো তাঁর পায়ে পায়ে।

দ্রষ্টব্য: এখানে ছবির বেড়াল ছানাগুলো নিশ্চয়ই সেই বেড়ালের ছানাপোনা হবে। আর বেড়ালছানা নিয়ে যেভাবে খেলছেন তাতে যে কেউ বুঝতে পারবেন এগুলো কত প্রিয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

গণভবন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন পশুপাখির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা প্রগাঢ়। অনেকেরই জানা গণভবনের চত্বরে যেসব ফলমূলের গাছ রয়েছে সেগুলোর ফল তিনি অনেক সময়ই পেড়ে আনতে দেন না। বলেন ওগুলো পেড়ে নিলে পশু-পাখীরা খাবার কোথা থেকে পাবে!

সারাবাংলা/এমএম

সাবজেলে জন্ম নেয়া বেড়ালের ছানারা এখনো সঙ্গী!
সাবজেলে জন্ম নেয়া বেড়ালের ছানারা এখনো সঙ্গী!
সাবজেলে জন্ম নেয়া বেড়ালের ছানারা এখনো সঙ্গী!