শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১১ ফাল্গুন, ১৪২৪, ৬ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯

সাবধান হোন ! মোকাবেলা করুন জরায়ুমুখের ক্যান্সার !

জানুয়ারি ২০, ২০১৮ | ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

মারজিয়া প্রভা।।

ভাবা যায়? কেবল বাংলাদেশেই প্রতিদিন ১৮ জন নারী মারা যাচ্ছে একটি প্রাণঘাতী রোগে। এই প্রাণঘাতী রোগ আর কিছু নয়! আমাদের সবার পরিচিত জরায়ুমুখের ক্যান্সার। ইংরেজিতে একে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার বলা হয়। জানুয়ারি মাস জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতার মাস। এখনোই সময়! প্রতিটি নারীকে জানতে হবে এই প্রাণঘাতী রোগের কারণ। সেইসাথে জানতে হবে মোকাবেলা করার পদ্ধতিও।

নারীদের জন্য যে কয়টি প্রাণঘাতী রোগ রয়েছে তার মধ্যে ৫ম স্থানে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ নারী মারা যায় জরায়ুমুখের ক্যান্সারে।

২০০৮ সালের একটি সমীক্ষা বলছে, সেই বছর বিশ্বে প্রায় ৪ লক্ষ ৭৩ হাজার নারী আক্রান্ত হয়েছিল এই রোগে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যাটি খুব একটা কম নয়। ২০১১ সালের জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ হাজার নারী প্রতিবছর আক্রান্ত হয় এই ক্যান্সারে। এরমধ্যে ছয় হাজার নারীই মৃত্যুবরণ করেন।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ হচ্ছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ। মেডিসিন এবং ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডঃ রেহনুমা পারভীনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যায়, এই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) প্রায় ১০০ প্রজাতির হয়। এরমধ্যে ৪০টি প্রজাতি  যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এবং যৌনাঙ্গের সাধারণ আঁচিল থেকে শুরু করে জরায়ুমুখের ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে মূলত ১৩ প্রজাতির এইচপিভি ভাইরাস ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যার মধ্যে এইচপিভি ১৬ এবং এইচপিভি ১৭ শতকরা ৭০ ভাগ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

মজার বিষয় হচ্ছে, এইচপিভি সংক্রমণ খুবই সাধারণ একটি ছোঁয়াচে রোগ। পৃথিবীর ১০ জন নারী পুরুষের মধ্যে ৯ জনই এই ভাইরাসের কোন না কোন একটি প্রজাতি দ্বারা আক্রান্ত হয়। আর এই সংক্রমণে শারীরিক কোন পরিবর্তন ঘটে না বলে তা আমাদের অগোচরেই থেকে যায়। এইচপিভি ভাইরাস সংক্রমণ মাত্রই যে ক্যান্সার তা কিন্তু নয়। এই ভাইরাস সংক্রমণের পরে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে শরীর তার নিজস্ব রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। যদি তা না করতে পারে, তবে ১০ থেকে ২০ বছর পর ক্যান্সারের উপসর্গ প্রকাশ পায়।

রেহনুমা জানান, এই ভাইরাসটি যৌনমিলন ছাড়াও যেকোনো যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে এক দেহ থেকে অন্যান্য দেহে সংক্রমিত হতে পারে। যেমন ওরাল সেক্স কিংবা অ্যানাল সেক্স। অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের মতো এটি কেবলই পুরুষের বীর্য এবং নারীর যোনিরসের উপর নির্ভর না। তাই এইচপিভি জরায়ুমুখের ক্যান্সার ছাড়াও পায়ুপথ, যৌনাঙ্গ এবং মুখ গহ্বরের বিভিন্ন অংশের ক্যান্সার ঘটায়।

চিকিৎসক রেহনুমার কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই এইচপিভি ভাইরাস সংক্রমণের কোন চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তাই যৌনক্রিয়ায় সক্রিয় হবার পূর্বেই যদি প্রতিষেধক নেওয়া যায় তবেই কেবলমাত্র জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোধ করা সম্ভব।

ত্রিদেশীয় সিরিজ লাইভ দেখুন সারাবাংলায়

এইচপিভি ভাইরাসের সংক্রমন প্রায় সকলেরই হয়। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এই সংক্রমণকে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে পরিণত করে। যেমন-

  • ধূমপান জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ায়
  • জননতন্ত্রের অন্যান্য ইনফেকশন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন- ক্ল্যামাইডিয়া
  • দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা পিল গ্রহণ করলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে
  • তিন বা ততোধিক সন্তান জন্মদান এবং ১৭ বছর বয়সের আগে সন্তান জন্মদান নারীর জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়
  • এমনকি দৈহিক স্থুলতা এই ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।
  • পরিবারের ইতিহাসে কারো জরায়ুমুখ ক্যান্সার থাকলে সেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ক্যান্সারের আক্রান্ত হবার প্রবণতা বেশি।
  • খাদ্য তালিকায় ফলমূল এবং সবজির স্বল্পতা থাকলে তা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারের লক্ষণ

জরায়ুমুখের ক্যান্সার হবার আগে কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কেবলমাত্র ক্যান্সার আক্রান্ত হবার পরেই আমরা নিচের উপশমগুলো দেখতে পাই

  • মাসিকের পাশাপাশি মাসিকের রাস্তা দিয়ে অনিয়মিত রক্তক্ষরণ যা অনেকে মাসিক বলেই মনে করেন।
  • যাদের মেনোপজ হয়ে গেছে অর্থাৎ মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে তাদের মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্তক্ষরণ।
  • সহবাসের পর রক্তক্ষরণ
  • জরায়ুমুখে স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষরণ
  • তলপেটে অস্বাভাবিক ব্যাথা
  • কোন ধরণের ইনফেকশনের কারণে মাসিকের রাস্তা দিয়ে সাদা কিংবা বাদামি দুর্গন্ধযুক্ত তরল স্রাব নিঃসরণ হওয়া

এই উপশমগুলোর মানে হচ্ছে ক্যান্সার জরায়ুমুখে ছড়িয়ে গেছে। তখন রেডিওথেরাপি ছাড়া আর উপায় থাকে না।

তাই ক্যান্সার হবার আগেই জরায়ুমুখে কোন অস্বাভাবিকত্ব আছে কি না তা জানতে হবে পেপ টেস্ট বা স্মেয়ার টেস্টের মাধ্যমে। ২১ বছর বয়স থেকেই অর্থাৎ যৌনক্রিয়া সক্রিয় হবার পর থেকেই যেকোনো নারীকে তিন বছর পরপর পেপ টেস্ট বা স্মেয়ার টেস্ট করাতে হবে ক্যান্সার আছে কি না তা জানার জন্য। যদি ২১ বছরের আগেই কেউ যৌনক্রিয়ায় সক্রিয় হয় তাহলেও ২১ বছরের পর থেকেই এই টেস্ট করাতে হবে।

খুশির সংবাদ হচ্ছে, বাংলাদেশে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করার জন্য সরকারিভাবে প্রায় সকল জেলা ও উপজেলায় VIA-Visual inspection with Acetic acid টেস্ট এর সুবিধা আছে।

কীভাবে মোকাবেলা করব জরায়ুমুখের ক্যান্সার?

জরায়ুমুখের ক্যান্সার মোকাবেলা করার পদ্ধতি কি? এই প্রসঙ্গে ডঃ শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, নিরাপদ যৌন জীবন এবং নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সময়ে প্রতিষেধক নিলেই জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রতিষেধক সম্পর্কে ডঃ শাহরিয়ার জানান, বাংলাদেশে সারভারিক্স নামে এইচপিভি ভাইরাসের টিকা পাওয়া যায়। এই টিকাটি মেয়েদের জন্য প্রযোজ্য। ১১ থেকে ২৫ বছর বয়স নারীদের জন্য এই টিকা গ্রহণের উপযুক্ত সময়। তবে কেউ চাইলে এর পরেও এই টিকা নিতে পারবে। মূলত যৌনজীবনে সক্রিয় হবার আগেই এই টিকা নেওয়া উচিত। এই টিকার মোট তিনটি ডোজ। প্রথম ডোজের ১ মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ এবং ছয় মাস পরে শেষ ডোজটি দেওয়া হয়। এই টিকাটি বাংলাদেশের সব হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে পাওয়া যায়। যেকোনো স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেই নারীরা এই টিকাটি নিয়ে নিতে পারবেন।

এর বাইরেও জীবনযাপনে কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন প্রতিরোধ করতে পারে জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে।

  • ১৮ বছরের পূর্বে সন্তান না নেওয়া
  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা
  • যৌনজীবনে হাইজিন মেনে চলা।
  • যৌনসঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, একাধিক যৌনসঙ্গী না রাখা।
  • ধূমপান কে না বলা।
  • নিয়মিত কনডম ব্যবহার করা।

বাংলাদেশের নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সারের পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে তাদের অসচেতনতা। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যৌনজীবন নিয়ে স্পষ্ট কথা বলা একটি ট্যাবু হিসেবে প্রচলিত। অথচ যৌনজীবনের সুস্থতার উপরেই অনেকাংশে নির্ভর করছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। এখনই সময়,  নারীদের উচিত তাদের জনন অঙ্গ এবং যৌনজীবন নিয়ে সচেতন হওয়া। যৌনজীবনে সক্রিয় হবার আগেই তাদের নিতে হবে প্রতিষেধক। প্রতি তিন বছর পরপর পেপ টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে ক্যান্সার হয়েছে কিনা। নিজের শরীর নিয়ে এই সচেতনতাই কেবলমাত্র নারীকে বাঁচাতে পারে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে।

 

ছবি- ইন্টারনেট

সারাবাংলা/এসএস

 

 

Tags: ,