রবিবার ২৭ মে, ২০১৮ , ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫, ১০ রমযান, ১৪৩৯

সেন্সরশিপ সাময়িকভাবে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায় : আসগর ফারহাদি

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮ | ৫:২৪ অপরাহ্ণ

ইরানের অস্কারজয়ী পরিচালক আসগর ফারহাদি। ৮৯তম অস্কারে বিদেশী ভাষার সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয় তার ‘দ্য সেলসম্যান’ চলচ্চিত্রটি। এর আগেও তিনি ‘এ সেপারেশন’ চলচ্চিত্রের জন্য একই বিভাগ থেকে অস্কার জয় করেন। নানা সমস্যা-সীমাবন্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয় ইরানী চলচ্চিত্রকারদের। পাশাপাশি রয়েছে ইরানের কুখ্যাত সেন্সরশিপ। ইরানী নির্মাতাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আমেরিকার বিখ্যাত ফিল্ম ম্যাগাজিন স্লান্ট-এর রিপোর্টার অ্যালিস নাখনিকিয়ানের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকারটি সারাবাংলার পাঠকদের জন্য ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন মুনীর মমতাজ

স্লান্টের ভূমিকাতে বলা হয়েছে, আসগর ফারহাদি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সমাজ, রাজনীতি ও নারী-পুরুষের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে তার চলচ্চিত্রের জন্য উপাদান সংগ্রহ করেন। তার দ্য সেলসম্যান সিনেমাটি এ বছর বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচিত একটি সিনেমা। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে রানা (তারানে আলিদোস্তি) ও এমাদ (সাবা হোসেইনী) নামের এক তরুণ দম্পতি। যারা আর্থার মিলারের দ্য ডেথ অব এ সেলসম্যান-এর মঞ্চ নাটকে অভিনয় করে। এরইমধ্যে একদিন রানার সঙ্গে  যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আপাত দৃষ্টিতে স্বভাবত উদার ও সংবেদনশীল এমাদও সেটা কোন ভাবেই  মেনে নিতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে তার আচরনের মধ্যে কর্তৃত্ব ও পুরুষোচিত স্বভাব দেখা দিতে শুরু করে। যার ফলে দিন দিন তাদের মধ্যে জটিল মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।

অ্যালিস নাখনিকিয়ান: আপনার সিনেমায় ইরানি সমাজের যে মানবিক চিন্তা-ধারার ব্যাপারটা তুলে ধরা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন অধিকাংশ চলচ্চিত্রে ইরানকে উপস্থাপনের এই প্রবণতা (ভীতিকর, বিপদজনক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চরমপন্থীতে পূর্ণ একটা রাষ্ট্র হিসাবে উপস্থাপন) ইরানের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে?

আসগর ফারহাদি: বিশ্বের সামনে আমার দেশের সমাজ-বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে, এ উদ্দেশ্যে আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ করি না। কখনো সেটা যদি এমনিতেই ঘটে যায়, তাহলে আমার খারাপ লাগে না। আমার সিনেমার চরিত্রগুলোর মাধ্যমে যে ঘটনাগুলো দেখানো হয়েছে, তা বিশ্বের যে কোন স্থানেই ঘটতে পারে। আমি সাধারণত সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে চরিত্রগুলো দেখে থাকি। এমন কি ত্রুটিপূর্ণ চরিত্রগুলোও। যখন আমি থিয়েটারে কাজ করতাম, নাটক লিখতাম, তখনও এভাবেই চরিত্রগুলো তৈরি করতাম। যাতে মানুষ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে।

অ্যালিস: নিউইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আপনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ইরানের কুখ্যাত সেন্সর এড়িয়ে কিভাবে সেখানে আপনার চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন? যেখানে জাফর পানাহির মতো চলচ্চিত্রকারের জন্যও ইরানের সেন্সরশিপ প্রথা খুব বড় একটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি বলেছিলেন, ‘প্রথমত আমার ছবির ব্যাপারে নিজে থেকে খুব একটা উচ্চবাচ্য করি না। দ্বিতীয়ত, দর্শকের ওপর কোন সিদ্ধান্ত নিজে থেকে চাপিয়ে দিই না। তারা ছবি দেখে নিজের মতো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়’। আপনার চলচ্চিত্রের এটা একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য, শিল্পসম্মত উপায়ে দর্শকে নিজের মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়া। তবে কি বলতে চাচ্ছেন সেন্সর এড়াতেই আপনি এ পদ্ধতি বেঁছে নিয়েছেন?

ফারহাদি: আমি শিল্পের সেন্সরশিপকে প্রবাহমান স্রোতের মুখে বাঁধের সাথে তুলনা করি। আপনি যখন প্রবাহমান স্রোতের মুখে বাঁধ তৈরি করবেন, তখস সে নিজের মতো করে অন্য কোন দিকে পথ খুঁজে নেবে। তার অর্থ আবার এই নয় যে, আমি সেন্সরশিপকে সমর্থন করছি। সেন্সরশিপ স্বল্প মেয়াদে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটা সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে।

অ্যালিস: তাহলে এটাই হচ্ছে আপনার সৃজনশীলতার মূলসূত্র, যার কারনে আপনানি ফিল্মে সরাসরি কোন ম্যাসেজ দিতে চান না?

ফারহাদি: অনেক সময় সিন্সরশিপ আপনাকে বিকল্পভাবে কথা বলতে শেখাবে। সিনেমাতে আমি সরাসরি কোন ম্যাসেজ দিতে চাই না। এটা করা মানে আপনি তাদের নিজেদের মতো করে কোন কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ দিচ্ছেন না। দর্শকের ওপর কিছু একটা চাপিয়ে দিচ্ছেন।

অ্যালিস: ইরানের সেন্সশিপ ব্যবস্থা কেমন? এখানকার (আমেরিকার) মতো কি বিশেষ কোন দিক নির্দেশনা আছে, সেটা মেনে কাজ করতে হয়। এর আগে আপনি কী ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন?

ফারহাদি: ইরানে বিভিন্ন ধরনের সেন্সরশিপ রয়েছে। একটি কমিটি আছে, যারা স্ক্রিপ্ট পড়ে তাদের মতামত জানায়। সারা বছর তারা বিভিন্ন চলচ্চিত্র দেখা ও স্ক্রিপ্ট পড়ার ফলে চলচ্চিত্র সম্পর্কে এরা কিছুটা উদার। এর বাইরের এক ধরনের আনঅফিসিয়াল সেন্সরশিপ আছে, যখন কোন একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষে প্রদর্শিত হয়, তখন তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিতে চুলচেরা বিচার করে, সেখানে এমন কোন ঘটনা দেখানো হয়েছে কি না, যেটা তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারতো। অনেক সময় কিছু ঘটনার নিজেদের মতো  করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দর্শকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

অ্যালিস: তাদের কথা মতো আপনার চলচ্চিত্রের কি, কোন অংশের পরির্বতন করার প্রয়োজন হয়েছে?

ফারহাদি: না। আমার চলচ্চিত্রে কোনো কিছু পরিবর্তন করি না।

অ্যালিস: কীভাবে তারা একটা চলচ্চিত্র সম্পর্কে দর্শকদের প্রভাবিত করে?

ফারহাদি: যেমন ধরুন, তারা কোন চলচ্চিত্রের এমন একটা দৃশ্য বা বিষয় নিয়ে সমালোচনা শুরু করবে পরিচালক হয়তো বিষয়টা ঠিক সে ভাবে উপস্থাপন করেনি অথবা করতে চায়নি। এরপর তারা দর্শকদের মধ্যে সে বিষয়ে আলোচনা তৈরি করে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। আমার ‘এ সেপারেশন’ যখন মুক্তি দেয়া হলো তখন তারা গুজব ছড়াতে শুরু করে এই বলে যে, সিনেমায় আমি ইরান ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে উৎসাহিত করেছি। যেটা আমার কাছে খুব উদ্ভট মনে হয়েছিলো, তার কারণ এই চলচ্ছিত্রে দুজন নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখানো হয়েছে। সেখানে মেয়ে চরিত্রটি দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে যেতে চায় এবং পুরুষ চরিত্রটি দেশেই থাকতে চায়। মূলত তাদের মধ্যকার টানাপোড়েন নিয়েই সিনেমার কাহিনী। সেখানে আমি দেশ ত্যাগ করতে উৎসাহিত করার মতো কোন কিছু দেখায়নি। তবে এর উল্টোটাও ঘটেছে বলে শুনেছি, সিনেমাটি দেখার পর অনেক ইরানি বিদেশ থেকে তার জন্মভূমিতে ফিরে এসেছে। এ রকম উল্টোপাল্টা কথাবার্তা আমার চলচ্চিত্রের কোন ক্ষতি করতে না পারলেও দর্শকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টিতো করতেই পারে।

অ্যালিস: আপনি জানেন, আমাদের দেশে (আমেরিকাতে) মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে (অন্তত এই সময়)। আপনি যে ধরণের ছবি তৈরি করেন, বাণিজ্যিক চাপ ও বাজার চাহিদার কারনে এখানে সে ধরনের চলচ্চিত্র খুব একটা দেখ যায় না। এখান থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ আপনার জন্য ইরানের চেয়ে সহজ হবে না কঠিন হবে বলে মনে করেন?

ফারহাদি: ইরানে যে সমস্ত চলচ্চিত্র নির্মিত হয় সেগুলো খুব বড় মাপের বা বড় বাজেটের কোন চলচ্চিত্র নয়, সেখানে এ ধরণের চলচ্চিত্র বানানো অনেক সহজ। ইরানে কিছু ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে, যার কারণে বর্হিবিশ্বের তুলনায় সেখান থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা আমার জন্য অনেক সহজ। আবার এমন কিছু ব্যাপারও আছে সেখানে যেটা একটা চলচ্চিত্র নির্মাণকে বর্হিবিশ্বের তুলনায় অনেক কঠিন করে দিতে পারে। তবে আমার ছবি বানানোর জন্য যে ধরনের কাহিনী, চরিত্র প্রয়োজন সেগুলো শুধু ইরানেই পাওয়া যায়। এ কারণে শত সমস্যা সত্ত্বেও আমি ইরান থেকেই চলচ্চিত্র বানাতে চাই।

অ্যালিস: আপনার চলচ্চিত্র কিভাবে নিচ্ছেন ইরানের দশর্করা?

ফারহাদি: আমার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘দ্য সেলসম্যান’ সবচেয়ে বেশি মানুষ দেখেছে এবং ব্যবসা সফল হয়েছে। ইরানি চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এটি সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি।

অ্যালিস: আপনি নামকরা চলচ্চিত্রকার বলেই কি তারা আপনার সিনেমা দেখতে আসছে নাকি এই সিনেমায় তারা বিশেষ কিছু খুঁজে পাচ্ছে? আমরা দেখেছি আপনার অস্কার বক্তৃতা ইরানি জনগনের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

ফারহাদি: দুটোই হতে পারে, তবে অনেক মানুষ এই সিনোমার নির্মানের সাথে জড়িত ছিলো। সিনেমাটি শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি, এখানে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করারও একটা সুযোগ পাবে দর্শকরা।

অ্যালিস: কথাটি আপনার যে কোন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই সত্য। তবে আমি অবাক হচ্ছি এই বিশেষ চলচ্চিত্রটির প্রতি মানুষ এতো আগ্রহ দেখিয়েছে কেন?

ফারহাদি: মনে হয়, আমার অন্যান্য সিনেমার মতো এখানেও দর্শক ভাবনার সুযোগ পাচ্ছে। আমার সিনেমার দর্শক এখন অনেক সচেতন হয়েছে। তারা একটা সিনেমা দেখার পর সেটা নিয়ে কথাবর্তা বলে, তর্ক করে। এমন কি যারা আমার সিনেমাটি পছন্দ করে না তারাও। এটাই আমার জন্য বড় পাওয়া।

অ্যালিস: তাহলে জনগন ফারহাদির চলাচ্চিত্র বুঝতে চাইছে?

ফারহাদি: মানুষ আমার চলচ্চিত্রের ভাষা বুঝতে পেরেছে। এটা যেমন একদিকে আমার চলচ্চিত্র নির্মাণকে সহজ করে দিচ্ছে অন্যদিকে তেমনিই কঠিনও করে দিচ্ছে।

অ্যালিস: কঠিন করছে কিভাবে?

ফারহাদি: এর ফলে তারা ছবির খুঁটিনাটির প্রতি মনোযোগি হয়ে এমন সব সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যেটা আমি বোঝাতে চাইনি। (হাসি)

অ্যালিস: আপনি কি ইঙ্গমার বার্গম্যানকে খুব পছন্দ করেন? আমি এ প্রশ্ন করছি তার কারণ আপনার চলচ্চিত্রে যেভাবে দুজন থিয়েটার কর্মীর ব্যক্তিগত জীবন, তাদের থিয়েটারে অভিনয় এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে একই সাথে  সমন্বয় করেছেন, সেটা বার্গম্যানের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ফারহাদি: বার্গম্যান আমার অসম্ভব প্রিয় একজন নির্মাতা। বার্গম্যানকে আমি পৃথিবীর অন্যতম সেরা একজন পরিচালক মনে করি । তার প্রতি শ্রদ্ধার জায়গা থেকেই আমার চলচ্চিত্রের একটা দৃশ্যে তার শেইম ছবির পোস্টার রেখেছি। সেটি বার্গম্যানের চলচ্চিত্রের অন্যতম একটি চরিত্র যেটি মানুষের মনোজাগতিক ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। এই চলচ্চিত্রটিরও থিয়েটারের সাথে গভীর যোগসুত্র আছে।

অ্যালিস: তারানে আলিদোস্তি, যাকে আপনার একাধিক ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে। তার সম্পর্কে কিছু বলুন?

ফারহদি: এটা (দ্য সেলসম্যান) ছিলো তারানের সাথে আমার চতুর্থ ছবি। এ ছাড়াও বিউটিফুল সিটি, ‘অ্যাবাউট এলি ও ফায়ারওয়ার্কস ওয়েনসডে নামের আরো তিনটি ছবি করেছি। সে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত একজন অভিনেত্রী, যখন সে কোন একটা চরিত্রের কাজ শুরু করে তখন পুরোপুরি চরিত্রের সাথে একাত্ব হয়ে যেতে পারে। কোন একটা চরিত্রকে ভালোভাবে বোঝার ক্ষমতা তারানের আছে। দ্য সেলসম্যান সিনেমায় তাকে কিছুটা ভিন্নভাবে উপন্থাপন করা হয়েছে, এখানে দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বিপর্যয়কর একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর থেকে সে একদম চুপ চাপ (সাইলেন্ট) হয়ে যায়। তাকে যে ধরনের চরিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেটা প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত কিন্তু আসাড় নয়।

অ্যালিস: দ্য সেলসম্যান সিনেমায় এমাদ-এর ক্লাসে একটি সিনেমা দেখানো হচ্ছিল, তখন ক্লাসের মধ্যেই অনেকে ঘুমিয়ে পড়ে?

ফারহাদি: অনেক পুরান আলোচিত একটা চলচ্চিত্র দ্য কাউ দেখানো হচ্ছিল। ১৯৭১ সালে শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করে। সেটার কাহিনী এরকম, প্রধান চরিত্রটির একটি গাভি থাকে যে তার গাভীটাকে খুব ভালোবাসে। হঠাৎ গাভীটি মারা গেলে লোকটা ধীরে ধীরে গাভীতে পরিণত হয়। একজন মানুষকে ক্রমাগত গাভীতে রুপান্তরিত হওয়ার কাহিনী অনেকটা কাফকার মেটামরফোসিসের মতো।

অ্যালিস: বিখ্যাত সেই ইরানী চলচ্চিত্রটির প্রতি সম্মান জানাতেই কি আপনার সিনেমায় এটা অন্তর্ভূক্ত করেছেন?

ফারহাদি: সেটাই, কিন্তু এটাও ঠিক যে এখন সিনেমাটি ছেলে-মেয়েদের পাঠ্যপুস্তকেরই অংশ।

অ্যালিস: আপনার সিনেমায় নারী চরিত্র খুব গভীরভাবে উঠে এসেছে। দেখানো হয়েছে এমাদ-এর মতো আপাত সুন্দর একজন পুরুষের কাছেও কিভাবে নারী নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। রানার চরম মানসিক বিপর্যয়ের পরও পুরুষত্বের দম্ভ তাকে অন্ধ করে রাখে। চরম কতৃত্বপরায়ণ ও নারী বিদ্বেষী একজন মানুষ সে।

ফারহাদি: আমার চলচ্চিত্রে পুরুষ চরিত্রটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন স্বাভাবিক মানুষ কিন্তু যখন সে সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে তখন সে স্ম্পূর্ণরুপে পরিবর্তিত একজন মানুষ হয়ে যায়। পুরুষ চরিত্রটিকে আমি একটা সংকটজনক অবস্থার মধ্যে ফেলে তার আসল চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছি।

অ্যালিস: আপনি কি বলতে চাচ্ছেন পুরুষরা পরিস্থিতির শিকার হয়েই নিজের স্ত্রী এবং চারপাশের মেয়েরদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে?

ফারহাদি: এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত। এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আমি দেখিয়েছি, পুরুষ চরিত্রটির নিজের স্ত্রীর প্রতি কঠোর প্রভুত্ব আছে, তার আচরনেও সেটি বোঝা যায়। বিশেষ করে রক্ষণশীল সমাজে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়। এ ছাড়া মেয়েদের তুলনায় পুরুষরাই বেশি অতিত নিয়ে ভাবতে পছন্দ করে। নারীর জন্মদান ক্ষমতার কারনেই ভবিষ্যতের প্রতি তার বেশি গুরুত্ব দেয়। নারী দ্রুতই অতিতকে অতিক্রম করতে পারে, যেটা পুরুষ পারে না।

অ্যালিস: পুরুষ সেটা পারে না বলে মনে করেন আপনি?

 ফারহাদি: নারী সহজেই অতীত থেকে ভবিষ্যৎ-মুখী হতে পারে কিন্তু পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই অতীত নিয়ে পড়ে থাকে। বার বার সে অতীত মনে করে তার স্মৃতিচারণ করে। এই সূত্র অনুসরণ করেই আমার সিনেমার চরিত্রগুলোর সৃষ্টি। এ সেপারেশন, চলচ্চিত্রে দেখিয়েছি পুরুষ চরিত্রটি তার বাবার মতো অতীত আকড়ে পড়ে থাকতে চাই, কিন্তু নারী চরিত্রটি তার মেয়ের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের চিন্তা করে।

সারাবাংলা/পিএম

 

আরও পড়ুন