শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১১ ফাল্গুন, ১৪২৪, ৬ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯

সোশ্যাল যুগের আনসোশ্যাল লাইফ…

ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৮ | ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

এই মূহূর্তে বাকস্বাধীনতা, ডিজিটাল আইন, ৩২ ধারা, ৫৭ ধারা ইত্যাদি নিয়ে আশপাশ বেশ গরম। বাকস্বাধীনতা নিয়ে আমরা সবাই বেশ চিন্তায় আছি। যেন সরকারের এই আইনগুলো না থাকলেই আমরা সবাই, প্রত্যেকে, প্রত্যেকটি ইন্ডিভিজুয়াল, অন্যের বাকস্বাধীনতার প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল হতাম।

ঘটনা টা তাই কি? পূর্ণ বাকস্বাধীনতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আমরা অন্যের প্রতি কি আগের চেয়ে অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল? পরমত সহিষ্ণুতা কি আমাদের বাকস্বাধীনতা চর্চার সাথে সাথে বেড়েছে?

দেখা যাক, নিও ক্ল্যাসিকাল কলোনিয়াল যুগ aka মিলিনিয়াম ক্যাপিটালিস্ট যুগে এই অবস্থাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

যদি ক্যাপিটালিজম আর তাদের মোক্ষম অস্ত্র একসময়কার হলিউড, আজকের সোশ্যাল মিডিয়া আর ভবিষ্যতের ‘অন্য কিছু’ এইভাবেই ডমিনেট করে সব কিছু, তবে যৌক্তিক ব্যবস্থা বলে আর কিছুই টিকে থাকবে না।

কিছুদিন আগে আমাদের নিজস্ব আড্ডাখানা “জি – গ্রুপে” আলোচনায় উঠে এসেছিল ধর্মের ব্যাপারটা। স্পেসিফিকলি কথা হচ্ছিল আব্রাহামিক ধর্মগুলো নিয়ে। “আমরাই শ্রেষ্ঠ” বা “আমার কওম-ই শ্রেষ্ঠ” বা একমাত্র “বৈধ” এমন ডিসকাশনের রাষ্ট্রিক এবং স্ট্রাকচারাল সমর্থন শুরু সেই থেকে। কারণ ধারণাগুলো আইনি বৈধতা ধার্মিক লিপিবদ্ধতা পায়। “আমরা যা ভাবি বা বলি, তার বাইরে অন্যদের কথা শোনা যাবে; কিন্তু সে কখনোই ঠিক নয়” – সে সময়ের এটা একটা বিশাল সমস্যা মানি। কিন্ত ধর্মকে ক্যাপিটালিজম দারুণভাবে ব্যবহার করেছে। যখন ধর্ম রাষ্ট্রীয় প্রথাগতভাবে ছিল না, তখনো মারামারি, কাটাকাটি, মুক্তচিন্তা বা বুদ্ধির গলা টিপে ধরা বন্ধ ছিল না। আর এখন এটা অনেক সহজ কাজ।

ফেসবুক আর ইউটিউব কাজটা অনেক সহজ করে দিচ্ছে। কিন্ত মুখে বলছে এটাই বাক স্বাধীনতা।

এই আইএস বলুন, ক্যাথলিক চার্চের বিতর্কিত কথা বলুন আর অন্যান্য অনাচারের কথাই বলুন – সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমরা জানি তা খুব কম সময়ে। কিন্ত কম সময়ে জানতে গিয়ে এবং সব খবরের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া একমাত্র প্ল্যাটফরম হতে গিয়ে ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর দিকে চলে গেছে। আপনি যতই প্রতিবাদ করুন, ক্লেইম দিন, আদালতে যান – ক্যাপিটালিজম তার বড় অস্ত্র সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এগুলো কখনোই যেতে দেবে না। ব্যাপারটা এত বেশি ভয়ঙ্কর যে এখান থেকে ফেরত আসার তেমন কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

সব কিছুর অথেন্টিসিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আর অথেনটিক জায়গাগুলোকে ধ্বংস করে দিয়ে এথিকাল আর যৌক্তিক চিন্তার জায়গাগুলা ধ্বংসপ্রায়।

ফলাফল পাশাপাশি দুটি মানুষ বছরের পর বছর এক সাথে থাকলেও এখন আর ছোটখাট ব্যাপারেও কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না।

খেলার মাঠে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন-খারাবি আগেও ছিল। কিন্ত এখন ফেসবুক হয়ে গেছে এইসব হেট ছড়ানোর মূল জায়গা।

কোনটা ঠিক, আর কোনটা নয়, সেটা অনুধাবনের মূল ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে।

এখন কোনটা “প্রকৃত” সেটা নিয়েই সারাক্ষণ বিতর্ক চলে। প্রকৃত মুসলিম কে, আসল বিএনপি কে, আসল জাপা কোনটা?
এগুলা তো আছেই। সাথে জীবনে ক্রিকেট খেলেননি তিনি ক্রিকেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করবেন, বিশেষজ্ঞ দের গালাগালি করবেন। আমজনতা আইন নিয়ে কথা বলবে, চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছে তাই মুণ্ডপাত করবে, ডাক্তারদের ফাঁসি চেয়ে বসবে।

কেউ মেট্রোরেল চাইলে সে দলকানা আওয়ামী লীগ হয়ে যাবে, আর না চাইলে সে বামাতী (বাম ও জামায়াতের মিলিত রূপ হিসেবে এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত শব্দ) হয়ে যাবে – হতেই পারে। কিন্ত নাও তো হতে পারে। কিন্ত এই “নাও তো হতে পারে” এর কোন জায়গা ফেসবুকে নাই।

পারস্পরিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিক সীমারেখার (পার্সোনাল স্পেস) ব্যবধান প্রায় ঘুচে গেছে। স্বকীয়া, পরকীয়া কোথাও কাউন্টার পার্টের জন্য নেই বিন্দুমাত্র সম্মান। ফলাফল আর ফলশ্রুতি ইনবক্স ফাঁস। মাধ্যম? আবারো সেই সোশ্যাল মিডিয়াই…..
এখানে খুব সিম্পল সব কিছু। স্ট্রেট কাট। Either with us or against us… মাঝামাঝি কিছু নেই। “ট্যাগ” খাওয়া থিওরি এই মাঝামাঝিতে থাকতে দেয় না কাউকে। আর সামনেও দেবে না। আমাদের মূল ধারার মিডিয়াও এই ভাইরাসে আক্রান্ত। তারা কেউ খুব একটা ভেরিফাই করে নিউজ ছাপে না। ছাপলেও সোশ্যাল মিডিয়ার বাতাস বুঝেই ফলো আপ ছাড়ে। আর এইভাবেই মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিতে মূল ভূমিকাটা নেয়।

এটা কখনো ধর্ম, কখনো মেট্রোরেল, কখনো হাতুরুসিংহে, কখনো সিরিয়া, কখনো ডোনাল্ড ট্রাম্প – কিন্ত নিশ্চিতভাবেই মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবার জন্য প্রতিদিনই কিছু না কিছু।

এইভাবে যে কোন ইস্যুতে আজ দশ হাজারটা মানুষ আর এক হতে পারছে না, তারপর কিছু দিন পর এক হাজারটা মানুষ পারবে না, তারপর একশ টা মানুষ ও পারবেনা…।

তারপর এমন একদিন হয়ত খুব বেশি দূরে নয় যেদিন যে কোন ইস্যুতে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের দুইটা মানুষ আর কখনোই এক হতে পারবে না…। হতে যে পারছে না সেটাই আনন্দ। এক হতে গেলেই নিজের একক হিরোইজম, একক সাফল্য, একক সেলিব্রিটি হওয়া – সব যাবে। মানুষ তাই চেয়ে চেয়ে দেখবে। কিন্ত অরগাজমের মত ক্ষণিকের আনন্দ নিভে যাবার ভয়ে কোন প্রতিবাদ, লাইক, শেয়ার কিছুই করবে না।

আমাদের প্রতিদিন শেখানো হচ্ছে সেটাই ‘আসল গণতন্ত্র’, ‘আসল লিবারেলিজম’, ‘আসল মানবতাবাদ’…

এর বাইরে আপনি যা কিছুই বলতে চাইবেন এই সিস্টেম আপনাকে হয় ‘কুকুর’, নয়ত চাপাবাজ, নয়ত মশলাপ্রদায়ক কথক বলে আপনাকে “ফিল্টার” করে দেবে…

ওয়েলকাম টু ম্যাট্রিক্স… গুড বাই রিয়েলিটি।

নিয়তি ভবিতব্য। ইকুয়েলিব্রেয়াম এটাই।

রফিক উল্লাহ রোমেল, সিইও ,কনটেন্ট ম্যাটারস, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সারাবাংলা.নেট

সারাবাংলা/এমএম