বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই, ২০১৮, ৪ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

স্কুটি নিয়ে ডিম পাহাড়ের চূড়া জয়!

জানুয়ারি ২, ২০১৮ | ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা-চট্রগ্রাম-বান্দরবান-চিম্বুক-নীলগিরি-থানচি-আলীকদম-লামা-ফাইসসাখালি-কক্সবাজার-টেকনাফ-চট্রগ্রাম-ঢাকা-পুরো পথটা ১ হাজার ২২০ কিলোমিটার। দক্ষিন এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু সড়কপথ পাড়ি দেয়ার খবরই চোখ কপালে ওঠার জন্য যথেষ্ঠ। আর এরসঙ্গে যখন যোগ হবে, এই পুরো যাত্রাপথের মাঝেই ছিল সমুদ্র সমতল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথের হিসাব তখন চোখটা কুঁচকে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন জানা যাবে, এতোটা বন্ধুর পথ-সবচেয়ে উঁচু সড়ক পাড়ি দিয়েছেন একজন নারী, তাও স্কুটি নিয়ে-তখন চোখ দুটো কচলাতে হবে বৈকি। আর এই চোখ কচলানোর মতো অসম্ভব কাজটাই করেছেন আতিকা রোমা। তিনি তার টিভিএস উইগো ১১০ সিসির স্কুটি নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন পাহাড়ি রাস্তার আঁকাবাঁকা পথ। রোমার ভাষায়, ‘এখান থেকে পড়ে গেলে জীবনে দ্বিতীয় বার ভুল করার মতো জীবন পাওয়া যাবে না’।
অ্যাডভেঞ্চারের শুরুটা হয় ২১ ডিসেম্বর রাতে। বাংলাদেশের দুইটি বাইকিং গ্রুপ টিমে এসিএস এবং এক্সপ্লোরার্স এমসি গ্রুপ রওনা হয় বান্দরবানের উদ্দেশে। যেখানে অংশ নেয় ২০ জন আর এই ২০ জনের মধ্যে নারী রাইডার ছিলেন আতিকা রোমা একাই। এই দলটির উদ্দেশ্য ডিম পাহাড়ে যাওয়া। ডিম পাহাড় বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার একটি পাহাড়। পাহাড়টি আলীকদম এবং থানচি উপজেলার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এই পাহাড় দিয়েই দুই থানার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। এই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সমুদ্র সমতল থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ। যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কপথ।
‘নতুন অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য, কারন পাহাড়ী রাস্তায় এর আগে কখনও চালাইনি স্কুটি। কিন্তু এর আগে ঢাকা থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে গেছি। পাহাড়ী রাস্তার অভিজ্ঞতা আসলে অন্যরকম, আমার কোনও প্রস্তুতিও ছিল না যে, কতটা চড়াই-উৎড়াই হতে পারে’ বলছিলেন রোমা।

তবে সে অভিজ্ঞতা যে কতোটা ভয়ংকর এবং ভয়াবহ হতে চলেছে সেটাও আতিকা রোমা জানতেন না। তাইতো তার চলার পথে বারবার মনে হয়েছে মা, বড় বোন নিশাত জাহান রানা এবং পোষা বিড়ালের কথা। রোমা বলেন, ২১ তারিখ রওনা হয়ে চট্রগ্রাম গেলাম আমরা পরদিন ভোরে পোঁছাই। সেখান থেকে বান্দরবান। বান্দরবান যখন যাচ্ছি তখন একটু ভয় লেগেছিল যে উঁচু খাড়া রাস্তা। তখন সঙ্গীরা বললেন, এ রাস্তা দেখেই এমন করছেন, আমরাতো যাবো আলীকদম-যেটা আমাদের মূল গন্তব্য, যেখানকার রাস্তা সর্ম্পকে কোনও ধারনাই নেই।

এরপর ২৩ তারিখ যখন বান্দরবান ঢুকছিলাম তখন পেছনের বাইকের ছেলেটা ক্রমাগত হর্ণ দিচ্ছে, কিন্তু আমি বাইক না থামানোর কারনে একসময় সে আমাকে পার হয়ে গিয়ে আমার সামনে দাড়ায় এবং জিজ্ঞেস করে, আপা আর ইউ ওকে? আপনি টের পাননি, আপনার পেছনের চাকার মধ্যে সাপ ঢুকে গিয়ে চক্কর খাচ্ছিলো এবং সে আপনাকে বাইট করছিল। এমনকী, আপনার চাকা থেকে পড়ে গিয়ে একদম ফনা তুলে আমার পায়ে কামড় দিয়েছে। তাড়াতাড়ি জুতো মুজা খুলে দেখতে লাগলাম। কিন্তু এসব রাইডে আমরা খুব ভারি জুতো পরি থাকি বলে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। এই সাপ কীভাবে কখন চাকার মধ্যে ঢুকেছে আমি বলতেই পারবো না-এটা ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।

তারপর আমাদের থাকার জায়গা রির্সোটের রাস্তা দেখে আরও ভয় লাগলো। মনে হচ্ছিলো, আমাকে পেছন থেকে কেউ টেনে ধরছে, যেতে না করছে আলীকদমের ডিম পাহাড়ে। কিন্তু মনে সাহস রাখলাম। বান্দরবান থেকে এরপর মিলনছড়ির পথে। সে পথটা এত সরু এবং প্রচুর বাঁক।এবং আমাদের যেতে হবে বামে চেপে। কারন উল্টোপথে দিয়ে চান্দের গাড়ি আসছে পর্যটকদের নিয়ে। এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলে আমাকে মেরে ছুঁড়ে দেবে।
যদিও তখনও আমি জানি না, এ রাস্তা তখনও কিছু না। সামনে আসছে আরও ভয়ংকর রাস্তা, ভয়ংকর সে অভিজ্ঞতা। জীবন-মরণের বাজীটা যেখানে অসাধারণ! এই করতে করতে চিম্বুক পর্যন্ত গেলাম। কিন্তু সে কেবল খাড়া খাড়া রাস্তা দিয়ে, কেবল যেন উঠছি আর উঠছি-যেন সে পথ আর শেষ হবার না!


তখনও রোমা জানেন না, সামনের রাস্তাগুলো কেমন হবে। নীলগিরি থেকে থানচি যাবার পথে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। সেখানে সবাইকে সব ধরণের তথ্য দিতে হয়। সেখানেই একজন সেনাসদস্য রোমাকে বলেন, আপনি এই রাস্তা দিয়ে যাবেন এই স্কুটি নিয়ে? বড় বড় বাইকরারা স্পোর্টস বাইক নিয়ে যেতে পারে না, আর আপনি স্কুটি নিয়ে যাবেন। আপনি ফিরে যান প্লিজ। কেবল তারাই নন, সঙ্গে থাকা রাইডাররাও বোঝাচ্ছিলেন ফিরে যাবার জন্য। রোমার বক্তব্য, কারন ওরা আমাকে ভালবাসেন।

কিন্তু এখানে ব্যতিক্রম ছিলেন এক্সপ্লোরার্স এমসি এর কর্ণধার ওয়াহেদ রেজা রোমেল। যিনি রোমাকে হাইওয়েতে চালানো শিখিয়েছেন । রোমা বলেন, রোমেল ভাইয়ের কারনেই আমি বাইকার হয়েছি এবং হাইওয়েতে চালানো শিখেছি। তবে তিনি আমাকে দেখে বুঝতে পারছিলেন যে আমার কনফিডেন্স কমে আসছে। তার কাছে জানতে চাইলাম, আমি কি ফিরে যাবো কীনা। রোমেল ভাই এবং টিম এবিএস এর প্রেসিডেন্ট আরিফ ভাই আমাকে সাহস দিলেন। বলেন, আমরা আপনার বিষয়ে কনফিডেন্ট, আপনি পারবেন। তখন আমি সাহস পেলাম।

সাহস আর আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে এরপর এই দলটি যেখানে পৌছায় সেখান পৌছালে বাইক রাইডারদের বাইক লিজেন্ড বলা হয় জানিয়ে রোমা বলেন, এরপর থানচির সরু আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে রাস্তা কেবল ডানে বায়ে করছে, যেন লাগাম ধরে থেকে কেবল বসে থাকা। তারপর থানচি যে পয়েন্টে পৌছালাম সেখানে পৌছাতে পারলে একজন বাইক রাইডারকে বলা হয়, বাইক লিজেন্ড-কারন সেখানে যাওয়া খুব কঠীন। আর আমি গেলাম স্কুটি নিয়ে নিয়ে।

থানচি থেকে আলীকদমে যাবার পথে আরেকটি সেনাবাহিনী চেকপোস্ট। সেখানেও একজন সেনাসদস্য আমাকে বলেন, আপনি কি এই স্কুটি নিয়ে এখানে উঠবেন, এটা খুব ভুল সিদ্ধান্ত হচ্ছে আপনার। তার এ কথা রোমাকে আরেকবার দ্বিধায় ফেলে।

রোমা বলেন, তখন আমি কিছুটা সময় নিলাম নিজের জন্য। খুব করে মায়ের কথা, আপা নিশাত জাহান রানা আর আমার পোষা বেড়ালটার কথা খুব মনে হচ্ছিলো। ভাবছিলাম, আমি কি কাজটা ঠিক করলাম কিংবা ঠিক করছি? অনুভব করছিলাম, আমার যদি ভুল হয় তাহলে সেটাই জীবনের প্রথম এবং শেষ ভুল হবে-জীবনে দ্বিতীয়বার আর ভুল করার সুযোগ পাবো না। কিন্তু আমি এতো কাছে এসছি-সে লোভটাও সামলাতে পারছিলাম না। আর সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট থেকে কিন্তু ডিম পাহাড় দেখা যাচ্ছিল।

আমি মনস্থির করলাম, যাবো। নাম এন্ট্রি শেষে যাত্রা শুরু করে ডিম পাহাড়ের দিকে এগুচ্ছি।
সেখানে একটা রাস্তা প্রায় ১ কিলোমিটার নিচে নেমে গেছে আর তারপর দেড় কিলোমিটার খাঁড়া হয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে। যখন সেই রাস্তা ধরে নেমে যাচ্ছিলাম তখন আরেকবার আমার মা এবং আপার কথা মনে হলো, মনটা কেমন করে উঠলো-একটা সুতোর মতো রাস্তা। নুড়ি পাথর বিছানো, চাকা কাঁপছে অবিরত। মনে পরলো, পরিচিত এক বাইকার ভাইয়ের কথা যিনি সিবিআর নিয়ে ডিম পাহাড়ে উঠতে গিয়ে পরে গিয়ে পা ভেঙ্গেছিলেন। আর আমি যদি পড়ে যাই, তাহলে আমার টিমমেটরা ভীষণ বিপদে পড়ে যাবেন। একেতো খাঁড়া এবং আঁকাবাঁকা পথ তারওপর পাহাড়ি রাস্তার নুড়ি পাথরের জন্য বার বার চাকা পিছলে যাচ্ছিল। আমি বুঝে গেলাম, একটু অসতর্ক হলে সোজা ২৫০০ ফুট নীচে পরে যেতে হবে, এক জীবন মরণ বাজি, সেই বাজির অনুভূতির কোন তুলনা হয় না। তারপরও যাচ্ছি এবং গেলাম। একটা পয়েন্টে গিয়ে পৌছালাম।

একসময় দেখলাম দুই টিমের সবাই উল্লাসে ফেটে পড়েছে, সে কি চিৎকার একেকজনের। আমি তখনও জানি না, আমি ডিম পাহাড়ে পৌঁছে গিয়েছি। এ সময় আরিফ ভাই কাছে এসে বললেন, আপনিতো এসে গিয়েছেন, আপনি জয় করেছেন-এটাই ডিম পাহাড়।

এরপর ঐদিন ২৩ ডিসেম্বর ডিম পাহাড় থেকে দলটি চলে আসে আলীকদম জিরো পয়েন্টে। তারপর সেখান থেকে লামা হয়ে ফাইসসাখালির পাহাড় ঘেরা ঘন জঙ্গল। এই জঙ্গলে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মত বেজে যায়। সেখানেই ঘটে আরেক ভয়ংকর ঘটনা। রোমা বলেন, ফাইসসাখালির জঙ্গলটা ভীষণ ঘন এবং ২/৩ সেকেন্ড পর পর ডানে বামে বাঁক। আমাদের দলটিকে লিড দিচ্ছিলেন আরিফ ভাই। এক সময় খেয়াল করলাম আমার সামনে আরিফ ভাই নেই এবং পেছনেও কেউ নেই। ঘন অন্ধকারের মাঝ দিয়ে আমি একা একা যাচ্ছি, পাহাড়ি ঠান্ডার সাথে কুয়াশা। এরপর কোনও রকমে আমরা সবাই একসঙ্গে হই।

তারপর সেখানে থেকে কক্সবাজার। সেদিন রাতেই কক্সবাজার পৌছে পরদিন মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে টেকনাফ এবং রাতে কক্সবাজার।

আতিকা রোমা বলেন, আমি স্কুটি চালানোর পর অনেক কথা শুনেছি, কেবল আমি না, আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষকে কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু কখনও কাউকে জবাব দেইনি। স্কুটি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সড়কে ওঠার মধ্য দিয়ে আমি সবাইকে সামগ্রিকভাবে জবাব দিয়েছি। আর বলতে চাই, স্কুটিকে বেশিরভাগ মানুষ মনে করে স্কুটি মেয়েলি ফ্যাশনেবল, ঠুনকো বিষয়। তাই আমার এ যাত্রায় আমি স্পোর্টস বাইক নেইনি। কারণ, আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, স্কুটি দিয়েই অনেক কিছু সম্ভব যদি ইচ্ছা এবং একাগ্রতা থাকে।

আতিকা রোমার সব কাজে যিনি অনুপ্রেরণা দেন, সেই নিশাত জাহান রানা বলেন, সকল মেয়ে যদি রোমার মতো সাহস নিয়ে বেরিয়ে আসত তবে আমাদের মেয়েদের সামাজিক বাধাটা ভেঙ্গে যেত। মেয়েদের জন্য আসলে সাহস দেখানোর সাহসটাই জরুরি, যেটা রোমা করেছে।

সারাবাংলা/জেএ/জেডএফ/এমএ

স্কুটি নিয়ে ডিম পাহাড়ের চূড়া জয়!
স্কুটি নিয়ে ডিম পাহাড়ের চূড়া জয়!