সোমবার ১৬ জুলাই, ২০১৮, ১ শ্রাবণ, ১৪২৫, ১ জিলক্বদ, ১৪৩৯

স্তন ক্যান্সার- আতঙ্ক নয়, সচেতনতাতেই মুক্তি!

জানুয়ারি ৪, ২০১৮ | ১২:২৭ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা

২০০৩ সালে পরিবারের সাথে থাইল্যান্ড বেড়াতে গিয়ে তাহমিনা গাফফার হঠাৎই সিদ্ধান্ত নেন নিজের পুরো শরীর ডাক্তারি পরীক্ষা করাবেন। পঁয়তাল্লিশ পেরোনোর পর সব নারীর বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা করানো উচিত, এটা তিনি জানতেন।

স্তন পরীক্ষার সময় যে মহিলাটি কাজটি করছিলেন, তার মুখের রঙ পরিবর্তন হতে দেখেন তাহমিনা গাফফার। আতঙ্কিত হয়ে তাকে বারবার প্রশ্ন করতে থাকেন। কিন্তু তাকে স্পষ্ট করে কিছু না বলে পরীক্ষক চিকিৎসকদের ডেকে আনেন। এর পরের কয়েক ঘন্টা ছিল তাহমিনা আর তার পরিবারের জীবনের এক ক্রান্তিকাল।

একের পর এক পরীক্ষার পরে ধরা পড়ে তাহমিনার একটি স্তনে থাকা লাম্প বা পিন্ডটি  ক্যান্সারের জীবাণু বহন করছে। আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের পুরো পরিবারের মাথায়। কারণ সে সময় সবার মতো তাহমিনাও ভাবতেন ক্যান্সার মানেই মৃত্যু।

বিধ্বস্ত মনে দেশে ফিরে এসে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে যান তিনি। সেখান থেকে অপারেশন ও একটি কেমোথেরাপি শেষে দেশে ফিরে আসেন। বাকি পাঁচটি কেমো দেশের একটি বেসরাকারি হাসপাতালে সারেন।

তাহমিনার মত এরকম স্তন ক্যান্সার রোগে ভুগছেন অসংখ্য নারী। প্রতিবছর এদেশে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮২২ জন। আর মারা যান ৭ হাজার ১৩৫ জন। নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে আক্রান্তের ও মৃত্যুর হার যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৯ ও ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

স্তন ক্যানসার আসলে কি?

শরীরের কোন স্থানে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি হলে সেটাকে টিউমার বলে। স্তনে দুই ধরনের টিউমার হতে পারে-  বিনাইন টিউমার ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। বিনাইনের অবস্থান তার উৎপত্তি স্থলে সীমাবদ্ধ থাকলেও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আগ্রাসী ধরনের যা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে দূরের বা কাছের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা গ্রন্থিকে আক্রান্ত করতে পারে।

স্তনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই ক্যান্সার যা সাধারণত দুধবাহী নালিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য টিস্যু থেকেও শুরু হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি পিন্ড বা চাকা হিসাবে এটি প্রথম দেখা দেয় এবং আস্তে আস্তে বড় হয়ে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। স্তনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কারনে বাহুমূলেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে এই ক্যানসারের।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যান্সার ইপিডেমোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন সুদীর্ঘ একযুগ ধরে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত পঞ্চাশ বছর বয়সের পরে শুরু হলেও আমাদের দেশে অজানা কারনে চল্লিশের পরেই স্তন ক্যান্সার দেখা যায়। মনে রাখা ভালো, শুধু নারীরাই নয়, পুরুষেরাও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে।

স্তন ক্যানসারের কারণ কি এবং কারা আছে ঝুঁকিতে?

ডাঃ রাসকিনের মতে বিআরসিএ-১ ও ২ নামের জিনের অস্বাভাবিক মিউটেশন ৫ থেকে ১০ শতাংশ দায়ী স্তন ক্যান্সারের জন্য। আবার কারো মা, খালা, বড় বোন বা মেয়ের স্তন ক্যানসার থাকলে সেও ঝুঁকিতে থাকে। তাছাড়া যাদের বারো বছরের আগে ঋতুস্রাব হয় এবং পঞ্চাশ বছরের পরে মেনোপজ বা ঋতু বন্ধ হয়, তারাও ঝুঁকিতে থাকে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা কোন কারনে স্তনে কোন চাকা বা পিন্ড থাকলেও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।

ডাঃ রাসকিন কিছু পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কথাও বলেন যেমন, নারীর সন্তানহীনতা, ৩০ বছর বয়সের পরে বিয়ে ও সন্তান ধারণ, সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি বা ফলমূলের চাইতে চর্বি ও প্রাণিজ আমিষ বেশি থাকলে অথবা মাত্রাতিরিক্ত ওজন বেশি যাদের তারাও ঝুঁকিতে থাকে।

তাহমিনা গাফফার ডাক্তারি পরীক্ষার আগে জানতেনই না যে তাঁর শরীরে কোন সমস্যা আছে। ক্যানসারের সাথে যুদ্ধের শুরুর দিনগুলো তাই বেশ কঠিন ছিলো। নিজে তো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিলেনই, আশপাশের মানুষের আচরণে আরো ভেঙে পড়েছেন। তিনি আর বাঁচবেন না, এমনটা ধরে নিয়ে কেউ কেউ এসে বলেছে ‘কি খেতে চাও?’  আবার আত্মীয় বা বন্ধুদের কেউ কেউ এসে তার বাসায় কিছু খেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ক্যান্সারকে ছোঁয়াচে মনে করে।

এসব ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন তাহমিনা গাফফার। দুঃসহ শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণার সেই সময়ে তাঁর স্বামী আর দুই সন্তান সারাক্ষণ মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। ক্যান্সার ছোঁয়াচ, এমন ভুল তথ্যে বিশ্বাস করে মা যেন মানসিকভাবে গুটিয়ে না থাকে সেজন্য তার ছেলেমেয়েরা মায়ের গ্লাসে পানি খেতেন মাকে ভরসা দেবার জন্য। বাসায় এসে কেউ মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার মত কথা বললে তাহমিনার স্বামী তাদের নিষেধ করেছেন। এভাবে সবার সহযোগিতায় আর ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নিয়ে চলায় একসময় পুরোপুরি সুস্থ হন তিনি।

ডাঃ রাসকিনের মতে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ক্যান্সার নিরাময় অনেক সহজ হয়ে যায়। কোনো লক্ষণ টের পেলে জরুরীভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পরীক্ষা করানো উচিৎ।

স্তন ক্যান্সারের লক্ষনগুলো কি?

  • স্তনে চাকা বা পিন্ড দেখা দেওয়া
  • স্তনের বোঁটার বা নিপলে কোন ধরনের পরিবর্তন যেমন ভেতরে ঢুকে যাওয়া, অসমান বা বাঁকা হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক রস বের হওয়া
  • চামড়ার রং বা চেহারায় পরিবর্তন এবং
  • বাহুমূলে পিন্ড বা চাকা

আবার যাদের এসব লক্ষণ নাই তাদেরও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। স্ক্রিনিংয়ের তিনটি পদ্ধতি হল-

১. মেমোগ্রাম বা বিশেষ ধরনের এক্স রে,  যার সাহায্যে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে

২.  সুনির্দিষ্ট নিয়মে চাকা বা পিন্ড থাকার পরীক্ষা (চিকিৎসক করবেন)

৩. নিজে নিজে নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী স্তন পরীক্ষা করা। ডাঃ রাসকিনের মতে বিশ বছর বয়সের পর সব মেয়েরই মাসে অন্তত একবার এই পরীক্ষা করা উচিৎ।

তিনি আরো বলেন, শতভাগ নিরাময়ের জন্য পরিপূর্ণ চিকিৎসা আর ফলো আপ নিশ্চিত করাটা খুব জরুরী।

পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসা চলাকালীন মিসেস তাহমিনা সাহস অর্জন করতে অন্যান্য রোগীদের সাথে কথা বলতেন। সেখানেই ঢাকার কিছু রোগীর সাথে পরিচয় হয় যারা প্রায় সুস্থ তখন। তাদের দেখেই বেঁচে থাকার ভরসা পান। এই নারীরা দেশে ফিরেও একে অন্যের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। শুরুতে একেকদিন একেকজনের বাসায় বসতেন আর একে অন্যকে সাহস যোগাতেন অদম্য এই নারীরা। ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর জয়ী তাহমিনা প্রতিষ্ঠা করেন একটি সংগঠন- অপরাজিতা। ক্যান্সার বিজয়ী নারীরাই এই সংগঠনটির সাথে জড়িত।

অপরাজিতা আজ অনুপ্রেরণা আর সাহসের অন্য নাম। অসংখ্য ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর পাশে দাঁড়ান তারা। কারো পাশে অর্থসাহায্য নিয়ে তো কাউকে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মনোবল বাড়িয়ে। অনেক দরিদ্র রোগীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেন তারা। তবে অপরাজিতার সবচেয়ে বড় অবদান দেশব্যাপী স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করতে ভূমিকা রাখা।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা– বাংলাদেশের সক্ষমতা ও খরচ

তাহমিনা গাফফারের অসুস্থতার সময়ে বাংলাদেশে ক্যান্সার শব্দটাই ছিলো একটি অশুভ ব্যাপার। সবাই ভাবতো ক্যান্সার মানেই বুঝি মৃত্যু। এর চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের ধারনাও কম ছিলো। সময় বদলেছে। সীমিত সামর্থ নিয়েও আমাদের দেশেই এখন ক্যান্সারের পূর্ন চিকিৎসা সম্ভব। বাংলাদেশ ক্যান্সার ইন্সটিটিউটসহ সরকারি বেসরকারি সব জায়গাতেই স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে। সরকারিভাবে স্তন ক্যান্সার নিরাময়ের খরচ পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকা। অনেকে আবার বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে চিকিৎসার সুবিধাও পেয়ে থাকেন। বেসরকারি সুবিধায় এ খরচ দাঁড়ায় সাধারণ মানের হাসপাতালে দুই থেকে তিন লক্ষ আর ব্যয়বহুলগুলোতে পাঁচ থেকে দশ লক্ষ বা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ডাঃ রাসকিন বলেন, আমাদের দেশে যথেষ্ট ভালো স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় বিশেষায়িত হাসপাতাল কম। স্তন ক্যান্সার চিকিৎসাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হলে অর্থাৎ সারাদেশে সব বিভাগে একটি করে সরকারি ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুললে শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ডাঃ রাসকিন ও সমমনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণ ধরা পড়ায় অনেকেই আজ পরিপূর্ন সুস্থ যাদের রেডিওলজিরও প্রয়োজন হয়নি।

 

অলঙ্করণ- আবু হাসান

সারাবাংলা/ আরএফ/এসএস

Tags: ,

স্তন ক্যান্সার- আতঙ্ক নয়, সচেতনতাতেই মুক্তি!
স্তন ক্যান্সার- আতঙ্ক নয়, সচেতনতাতেই মুক্তি!