শনিবার ২০শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৫ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৯ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

স্বাস্থ্যবাজেট জিডিপির এক শতাংশও নয়!

জুন ১৩, ২০১৮ | ১০:৫৮ অপরাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: হাসপাতালগুলোতে একেক জন রোগীর জন্য আসছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে বছরে ৭৬ হাজার ৩৭৩ টাকা, সঙ্গে পথ্যবাবদ বরাদ্দ ১২৫ টাকা। এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ ২৩ হাজার ৩৮৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ বরাদ্দ একেবারেই অপ্রতুল। এত অল্প বরাদ্দ দিয়ে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা কতটুকু নিশ্চিত করা যাবে, সে প্রশ্ন তাদের।

এবারের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ৯ হাজার ৪০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশে স্বাস্থ্যখাতে ধারাবাহিকভাবে টাকার অঙ্কে হয়তো এক বা দুই হাজার কোটি টাকা বেড়েছে, কিন্তু এই বরাদ্দ বৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের বেশি যায়নি। এবারেও এই খাতের বাজেট মোট জিডিপির এক শতাংশেরও কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন খাতে টাকা দেওয়া প্রয়োজন, কোন খাত থেকে কোন খাতে টাকা স্থানান্তর করা যেতে পারে— সে সংক্রান্ত কোনো পর্যবেক্ষণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করে বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে পেশাজীবী বা রাজনীতিবিদদের নিয়ে কোনো আলোচনা বা মতবিনিময়ও হয় না। অথচ সবার সমন্বিত মতামত এ খাতে প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্ববায়ক ও বিএমএ’র (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) সাবেক সভাপিত অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব সারাবাংলা’কে বলেন, চলতি বছরের বাজেটে বরাবরের মতোই নতুন কিছু নেই। জিডিপি’র এক শতাংশেরও নিচে বরাদ্দ এই খাতে। বাজেটে বরাদ্দের বেশিরভাগই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, চিকিৎসকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, ইনক্রিমেন্ট, ইউটিলিটি সার্ভিসের মূল্য, ওষুধের দাম ইত্যাদি খাতের জন্য। কিন্তু এর কোনোকিছুই ভোক্তা পর্যায়ে পড়ে না। তাদের জন্য বাজেট বাড়ে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে ডা. রশীদ-ই মাহবুব বলেন, ‘রোগীপ্রতি বছরে ৭৬ হাজার ৩৭৩ টাকা খরচের কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাতে একেকজন রোগীর পেছনে দিনে গড়ে ২০০ টাকা হয়তো বরাদ্দ পড়ে।’ এই টাকা দিয়ে কিভাবে একজন রোগীর চিকিৎসা হয়— প্রশ্ন বিএমএ’র সাবেক এই সভাপতির।

বর্তমান সময়ে দেশে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’ (নিজস্ব ব্যয়) আরো বেড়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। এতে দরিদ্ররা আরো বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছেন এবং মধ্যবিত্তরা দরিদ্র হয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ডা. রশীদ।

চিকিৎসা খাতের সব জায়গায় সমানভাবে নজর নেই মন্তব্য করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘সরকার বলে চিকিৎসকরা গ্রামে যেতে চায় না। কিন্তু গ্রামের হাসপাতালগুলোতে আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা না থাকলে তারা চিকিৎসা দেবেনই বা কিভাবে? তাই নজর দিতে হবে গ্রামেও।’ তিনি আরো বলেন, একইসঙ্গে বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোতে মানুষকে বেশি টাকা দিতে হয়। সে ব্যয় এবার আরো বাড়বে। এসব বিষয়ও মনিটর করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি এবং বিএমএ’র মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান। তিনি সারাবাংলা’কে বলেন, ‘যথাযথ ব্যবহার করা গেলে এই বাজেটেও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া সম্ভব। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি কেনাসহ সব বিষয়ে খরচ স্বচ্ছ হতে হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

‘ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় হাসপাতাল, জেলা হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব ক্ষেত্রে সমানহারে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।’, বলেন ডা. ইকবাল আর্সলান।

এদিকে, বাজেটের অর্থ কোথায়, কোন প্রয়োজনে কতটুকু ব্যয় হচ্ছে— সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতি-নির্ধারণী গবেষণা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার। তিনি সারাবাংলা’কে বলেন, ‘বাজেট এমনিতেই কম, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কম। এটা একেবারেই অপ্রতুল। সেক্ষেত্রে তার সবটুকু বরাদ্দ যেন সবক্ষেত্রে সমানভাবে হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

সারাবাংলা/জেএ/টিআর

স্বাস্থ্যবাজেট জিডিপির এক শতাংশও নয়!
স্বাস্থ্যবাজেট জিডিপির এক শতাংশও নয়!