শুক্রবার ২০ জুলাই, ২০১৮, ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ, ১৪৩৯

হারিয়ে গেছে টুনটুনিটা, থেমে গেছে কিচিরমিচির

জুলাই ৮, ২০১৮ | ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ

।। রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।

চট্টগ্রাম ব্যুরো: বিয়ের সাত বছর পর সাংবাদিক রুবেল খান ও রুমানা খানের কোল আলো করে এসেছিল রাফিদা খান রাইফা। একমাত্র আদরের ধন রাইফা ছিল বাবা-মায়ের নয়নের মণি। শুধু বাবা-মা কেন, পুরো ঘরের আলো ছিল রাইফা। ছোট্ট টুনটুনিটা কিচিরমিচির শব্দে ঘুরে বেড়াত ঘরময়। নিয়তির নির্মম পরিহাস! নিভে গেছে ঘরের আলো। ছোট্ট টুনটুনিটা হারিয়ে গেছে হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায়।

চট্টগ্রাম নগরীর নূর আহমদ সড়কের রাবেয়া রহমান লেইনের সেই বাড়িটিতে এখনও আর শোনা যায় না পাখির কিচিরমিচির। সেই ঘরে এখন শুধু নিস্তব্ধতা, শোকে মূহ্যমান ঘরের প্রতিটি সদস্য। এমনকি রাইফা’র মৃত্যুর খবরে শোকাহত পাশের সবজি বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতারাও।

শনিবার (৭ জুলাই) দুপুরে রাবেয়া রহমান লেইনের বাসাটিতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা গেছে। সন্তান হারানোর হতবিহ্বলতা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি রুবেল খান। বাসায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খেলনা আর পোশাকের মধ্যে রুমানা খুঁজে ফেরেন তার নাড়িছেঁড়া ধনকে। চোখের জল আর স্মৃতি হাতড়ে দিন কাটছে রুবেল খানের।

রাবেয়া রহমান লেইনের প্রয়াত গোলাম কিবরিয়া চৌধুরীর ছোট মেয়ে রুমানাকে ২০০৯ সালে বিয়ে করেন দৈনিক সমকালের জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক রুবেল খান। ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয় রাইফা।

অধিবর্ষ নিয়মে চার বছর পর একবার রাইফার জন্মদিন আসার কথা। আড়াই বছর বয়সী রাইফার জীবনে একবারও জন্মদিনটি আসেনি। মেয়ের জন্মদিন পালন নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক পরিকল্পনা ছিল।

রুমানা খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা বলতাম, মা খুব বড় করে তোমার জন্মদিন করব। র‌্যাডিসন হোটেলে জন্মদিন করব বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কাউকে বার্থডে কেক কাটতে দেখলে রাইফা বায়না ধরত। কিন্তু ওর জন্মদিন তো আসবে চার বছর পর। সেজন্য আমরা মাঝে মাঝে কেক কিনে এনে এমনিতে কাটার অভিনয় করতাম। রাইফা খুব খুশি হতো।’

টেলিভিশনে ‘সংগীত বাংলা’ চ্যানেল ছিল রাইফার খুব প্রিয়। সেই চ্যানেলে গান শুনিয়ে শুনিয়ে তাকে ভাত খাওয়াত মা রুমানা।

রুবেল খান জানালেন, সংগীত বাংলা চ্যানেলে প্রচারিত অনেক গানই রাইফার মুখস্ত ছিল। গান শুনত আর নাচত।

রুবেল খান আর রুমানা এখন আর টেলিভিশনের সামনে যেতে পারেন না। টেলিভিশনের সামনে গেলেই ভেসে উঠে মেয়ের মুখ। রুমানা বলেন, ‘মোটু পাতলু সিরিয়াল আর সংগীত বাংলা চ্যানেল, এসব আর কখনোই হয়তো দেখা হবে না।’

রুবেল বলেন, ‘আমার পরিবারে দীর্ঘদিন পর একটি সন্তান আসে। সেজন্য সবার আদরের ছিল রাইফা। ওর যা করতে মন চায়, যা পেতে মন চায়, আমরা কোনোদিন দেরি করিনি। মেয়ের কোনো আব্দার কখনও পূরণ না করে থাকিনি।’

মাত্র আড়াই বছর বয়সেই ‘বড়দের মতো’ কথা বলতেন রাইফা। বাসায় দুজন গৃহপরিচারিকার একজনকে ডাকতেন নানি। আরেকজনকে ডাকতেন ‘লাল বুয়া’। নিয়মিত সবজি আর মাছ বিক্রির জন্য যারা আসতেন, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলে তাদের সঙ্গেও ভাব জমিয়ে নিয়েছিলেন রাইফা। সেই লাল বুয়া এবং সবজি-মাছ বিক্রেতারা রাইফার মৃত্যুর পর থেকে আর বাসায় আসছেন না, জানালেন রুবেল।

তিনি বলেন, ‘সারা ঘরে দৌঁড়াত আর কথা বলত। এত কথা বলত, বাসায় নতুন অতিথি কেউ এলে তারা ভাবতে বয়স বোধহয় চার-পাঁচ বছর। আমাকে দেখলেই বলত- কোলে আস, কোলে আস। মানে তাকে কোলে নেওয়ার কথা বলত। মাঝে মাঝে সে নিজেই আমাকে মুখে ভাত তুলে খাইয়ে দিত।’

রুমানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাইফা তার বাবাকে খুব বেশি ভালবাসত। ঘুম থেকে চোখ খুলেই বলত, বাবা কোথায়। বাবাকে ফোন করে বলত, আমার জন্য আইসক্রিম আনবে, চিপস আনবে। হাতে করে কিছু না আনলে রাগ করত খুব।’

মেয়ের জন্মের পর থেকে রুবেল খান পারতপক্ষে রাতে বাসায় ফিরতে দেরি করতেন না।

‘অফিস থেকে রাতে বেরিয়ে কোথাও আড্ডা না দিয়ে সরাসরি বাসায় চলে আসতাম। মেয়েকে সময় দিতাম। আমাকে পেলে সে খুব খুশি হত ‘

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুবেল বলেন, ‘ রাইফাকে ঘিরেই ছিল আমাদের পরিবারের যত আনন্দ-উচ্ছ্বাস। সব শেষ হয়ে গেল !’

রুমানা জানালেন-খাবারের মধ্যে আইসক্রিম, চকলেট আর চিপসের প্রতি রাইফার আগ্রহ ছিল বেশি। নতুন জামা পরতে পছন্দ করত। আর সাজগোজের প্রতি ছিল ভীষণ আগ্রহ। বাইরে যাবার সময় চোখে সানগ্লাস লাগাতেই হবে। মোবাইলে নিজে নিজে সেলফি তুলত। নিজে নিজে ইউটিউব থেকে গান শুনত।

রুমানার মোবাইলের গ্যালারি ভর্তি সব রাইফার ছবি। সেই ছবি দেখে দেখে কান্না করেন তিনি-জানালেন রুবেল খান।

‘এক অসহ্য যন্ত্রণা। রাতে ঘুমাতে পারছি না। মোবাইলে ছবির দিকে তাকিয়ে তার মা কাঁদে। বিছানায় আমার পাশে রাইফা নেয়। ঘুম আর আসে না।’ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন রুবেল খান বেড়ানোর প্রচণ্ড শখ ছিল রাইফার। বেড়াতে নিয়ে যাবে বললেই আর বাসায় রাখা যেত না। হাসপাতালে ভর্তির (২৮ জুন) দুইদিন আগেও রুবেল ও রুমানা মেয়েকে নিয়ে পতেঙ্গায় বোটক্লাবে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে রাইফা আইসক্রিম খেয়েছিল বলে জানালেন রুবেল।

তিনি বলেন, আইসক্রিম একটু বেশি খেত। এজন্য ঠান্ডা লেগেছিল। সামান্য গলাব্যাথা ছিল। তবে অসুস্থ হয়ে পড়েনি। এমনিতেই বাড়তি যত্ন নেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, এই ছোট অসুখে হাসপাতালে না নিলেও পারতাম। মেয়েটা বেঁচে থাকত।

গত ২৯ জুন চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদিবাগে ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রাইফা। রুবেল খান অভিযোগ করেছিলেন-ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলায় রাইফার মৃত্যু হয়েছে। তদন্তে চিকিৎসকদের অবহেলার বিষয়টি প্রমাণ হয়েছে।

বাসা থেকে সামান্য গলাব্যাথা নিয়ে হাসিখুশি চটপটে যে মেয়েটিকে বাবা-মা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, দুদিন পর তার নিথর দেহ নিয়ে তাদের বাসায় ফিরতে হয়েছে।

রাইফা শুয়ে আছে গরীবউল্লাহ শাহ মাজারের কবরস্থানে নানার পাশে। রাইফাবিহীন বাসাটিতে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাইফার খেলার পুতুল, বল আর গাড়ি। অস্ট্রেলিয়া থেকে এক নিকটাত্মীয় পাঠিয়েছেন বড় আকারের এক খেলনা ক্যাঙারু। বাসাভর্তি নতুন নতুন নানা ধরনের খেলনা। সেগুলোর মধ্যে এখন রাইফাকে খুঁজে বেড়ান তার বাবা-মা।

বাসাটির ড্রইংরুমে একটি দোলনা ছিল। রাইফার খুব প্রিয় দোলনা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুবেল খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘দোলনাটা আমার মেয়ের এত প্রিয় ছিল, দিনের বেশিরভাগ সময় সেটাতে বসে দুলত। সেটাতে দোল খেয়ে খেয়ে টেলিভিশন দেখত। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে শুধু দোলনা থেকে নামত। দোলনাটার দিকে আমরা তাকাতে পারছি না।’

রাইফার মৃত্যুর পর নীরবে দোলনাটি সরিয়ে ফেলেছেন পরিবারের সদস্যরা। দোলনা সরানো গেছে। রুবেল আর রুমানার হৃদয় থেকে প্রাণপ্রিয় সন্তানের অকাল বিয়োগের ব্যাথা কি কখনও মুছে ফেলা যাবে ?

সারাবাংলা/আরডি/এমএইচ

হারিয়ে গেছে টুনটুনিটা, থেমে গেছে কিচিরমিচির
হারিয়ে গেছে টুনটুনিটা, থেমে গেছে কিচিরমিচির