মঙ্গলবার ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব জোছনা

জুলাই ১৮, ২০১৮ | ৫:৫৭ অপরাহ্ণ

আহসান হাবীব ।।

বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ তখন আমেরিকায় পিএইচডি করতে গেছে। আমার মাকে চিঠি লিখে জানাল… শাহীন (আমার ডাক নাম) যেন ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে পাঠায় তাকে, সে বর্ষা কালের ব্যাঙের ডাক খুব মিস করছে। কী আর করা। বড় ভাইয়ের হুকুম। আমি আমার এক বন্ধুর রেকর্ডার নিয়ে বের হলাম ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করতে। মুশকিল হচ্ছে তখনও বর্ষাকাল শুরুই হয়নি, ব্যাঙ কোথায় পাব। একজন বলল সংসদ চত্বরের ক্রিসেন্ট লেকে নাকি কিছু ব্যাঙ আছে তারা বর্ষাকাল ছাড়াও দয়া করে মাঝে মধ্যে ডাকে। একদিন সাত সকালে ক্রিসেন্ট লেকে গিয়ে হাজির হলাম ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করতে।
কিন্তু রেড হ্যান্ড কট। পুলিশ ধরল আমাদের।
– এখানে কি হচ্ছে?
– ইয়ে ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করছি। আমি বলি।
– মানে? পুলিশের ভ্রু কুচকে গেছে। ততক্ষনে আমার বন্ধু হাওয়া!
আমি ব্যাখ্যা করলাম আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ সে একজন লেখক সে আমেরিকায় থাকে। তার বাংলাদেশের ব্যাঙের ডাক শোনার শখ হয়েছে। তাই ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে তাকে পাঠাব। শুনে পুলিশের ভ্রু যেন আরো কুচকে গেল! আমি নিশ্চিত সংসদ চত্বরে সন্দেহজনক আচরনের জন্য পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গিয়ে আমাকে এখন ‘ডলা’ দেওয়া হবে। কিন্তু কি আর্শ্চয! পুলিশ বলল-
– এদিকে আসুন।
বলে ক্রিসেন্ট লেকের একটা কোনায় নিয়ে গেল। দেখি সত্যি সত্যি সেখানে বেশ কিছু ছোট বড় ব্যাঙ আয়েশ করে বসে আছে। তবে তারা ডাকছে না। পুলিশ বলল, অপেক্ষা করুন এরা একটু পরেই ডাক শুরু করবে। রেকর্ড করুন। আপনার নাম কি …?
নাম বললাম। পুলিশ অফিসার আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলেন।
আমি পরে সাফল্যের সঙ্গে ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে বড় ভাইয়ের কাছে ক্যাসেট পাঠাতে পেরেছিলাম। তখন অবশ্য সিডির যুগ ছিল না। ছিল ক্যাসেটের যুগ।
তারপর বহুদিন গেছে।
বড় ভাই মারা যাওয়ার পর পর আমাদের বাসায় বহু লোক এসে নানাভাবে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেছে। কেউ এসে বলেছে স্যার তাকে পড়ার খরচ দিয়েছেন। কেউ এসেছে তাকে স্যার কম্পিউটার কিনে দিয়েছেন। কেউ বলেছে স্যার তাকে চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন। ক্যান্সার আক্রান্ত দুজন রোগী এসেও বলেছে স্যার তাদের চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন… ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখনো আসে হঠাৎ হঠাৎ কেউ না কেউ চলে আসে। এইতো তার গত জন্মদিনে হঠাৎ এক তরুণ এল। আমার হাতে একটা শক্ত কাগজের খাম দিল।
– এটা কি?
– একটা সিডি।
– কিসের সিডি?
– স্যার জোসনার সিডি।
– মানে?
– হুমায়ূন স্যার একবার আমাদের গ্রামে গিয়েছিলেন জোছনা দেখতে আমি তখন অনেক ছোট। জোছনা দেখতে যে কেউ ঢাকা শহর থেকে এত দূর যায় আমার ধারনা ছিল না। আমি আসলে জোছনা ব্যাপারটাই বুঝতাম না। তারপর বড় হয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আসলেই অসাধারন জোছনা হয় আমাদের গ্রামে আর আমরা এতদিন বুঝিনি। তখন ঠিক করেছিলাম জোছনার এই অসাধারন দৃশ্য আমি রেকর্ড করে স্যারের জন্মদিনে গিফট করব। তাই রেকর্ড করে নিয়ে এসেছি।
– কিন্তু তোমার স্যারতো আর নেই।
– জি, স্যারের হাতে দিতে পারলাম না, আপনাকে দিয়ে যাই। স্যারের কাছের কাউকে দিতে পারলাম এটাও আমার একটা স্বান্তনা…
এই প্রসঙ্গে অন্য একটা গল্প বলি, চট্টগ্রাম থেকে হঠাৎ এক তরুণ এল কার্টুন নিয়ে। সে উন্মাদে কার্টুন আঁকতে চায়। আমি দেখলাম ভালই আঁকে তাকে বললাম উন্মাদে আঁকতে হলে কি করতে হবে, কোন সাইজে কি কলমে আঁকতে হবে … ইত্যাদি ইত্যাদি। সে সব বুঝে শুনে চট্টগ্রাম ফেরত গেল। তার কার্টুন কিছু ছাপাও হল। এবং মাঝে মাঝেই ছাপা হতে লাগল। তারপর হঠাৎ একদিন সে একটা সিডি নিয়ে এল। বলল ‘ বস আমার একটা গানের সিডি!’ আমি বিরক্ত হলাম। বললাম, হঠাৎ আবার গান গাওয়ার দরকার কি পড়েছে? কার্টুন আঁকছো কার্টুনই আঁকো চৌদ্দদিকে দৌঁড়ানোর দরকার কি?
তরুণ আমার আচরণে হতাশ হল মনে হয়। তবে সিডিটা রেখে গেল। আমি সিডি শোনার চেষ্টাও করলাম না। সেটা আমার টেবিলের উপর পড়েই রইল। তারপর হঠাৎ একদিন কি মনে করে সিডিটা কম্পিউটারে চালালাম… শুনলাম, আরে অসাধারন গানতো… ছেলেটাতো দারুন গায়! সেই ছেলে আর কেউ নয় আমাদের গায়ক মিনার রহমান।
জোছনার সিডিটাও এখনো আমার দেখা হয় নি। রেখে দিয়েছি যত্ন করে। আমি জানি মিনারের গানের মতই একটা চমক নিশ্চয়ই আছে ওই জোসনার সিডিতে। কোনও একদিন হয়ত দেখব। আবার ভাবি কি হবে দেখে? জোসনার আসল মানুষটাইতো নেই! বরং থাকুক না রুপালী সিডিতে বন্দি হয়ে হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব কিছু জোছনা!

আহসান হাবীব : জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট ও লেখক। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই।

সারাবাংলা/পিএম

হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব জোছনা
হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব জোছনা
হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব জোছনা