মঙ্গলবার ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

#মিটু: নিজেদের প্রমাণ করুন মানুষ হিসেবে

নভেম্বর ৮, ২০১৮ | ১২:১৮ অপরাহ্ণ

রাতে ঘুমোতে যাবার ঠিক আগ মুহূর্তে চোখে পড়লো পোষ্টটা। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারলাম না।

মেয়েটি আমার পরিচিত পেশাগত কারণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রকাশ পাওয়া হ্যাশ ট্যাগ মিটু’র তৃতীয় ঘটনা এটি। আসমাউল হুসনা নামের মিষ্টি একটা মেয়ে, যে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, সে লিখেছে তার জীবনে পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক বীভৎস মিটুর কথা। যার বিরুদ্ধে লিখেছে সেই পুরুষটিও গণমাধ্যমে সুপরিচিত।

মাত্র কয়েকদিন আগে আরেকটি মেয়ে প্রবাস থেকে একটি মিটু লিখেছে। সেটিও একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। আর সর্বপ্রথম মিটু লিখেছে যে মেয়েটি, সে একজন মডেল, সেও প্রবাসী আর অভিযুক্ত পুরুষটি একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক।

আসমাউল হুসনার মিটু’র বিশেষ দিকটি হল, সেই প্রথম মেয়ে যে দেশের মাটিতে বসে নিজের জীবনের ভয়ঙ্কর কথাটি প্রকাশ্য করে দেবার সাহস দেখাতে পেরেছে। এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। স্লাট শেইমিং, ভিক্টিম ব্লেইমিং এর এই সময়ে এই পচা গলা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিতে পারা অনেক বড় সাহসের ব্যাপার। হুসনা সেই সাহসটি নিঃসঙ্কচিত্তে দেখাতে পেরেছে।

সীমন্তি আর প্রিয়তির মিটু নিয়ে পাওয়া শক কাটিয়ে ওঠার আগেই হুসনার দেয়া মিটু পোস্ট আমাদের কি বাকরুদ্ধ করে দিচ্ছে? স্তব্ধ করেছে?

হ্যাঁ, আমি আমার চারপাশে থাকা বন্ধু, প্রিয়জন, সহকর্মী সকলের মধ্যে এই হতবাক বিষয়টি লক্ষ্য করছি। কিন্তু আমার জানার ইচ্ছে, তারা আসলে কেন হতবাক হচ্ছেন?

এক. হতে পারে তারা এইসব পরিচিত ব্যাক্তিত্বের এইসব নোংরা রূপ কখনো চিন্তায়ও আনেননি।

দুই. তারা ভাবতে পারেননি মেয়েরা এইভাবে গণহারে হয়রাণির শিকার হয়।

তিন. তারা কখনো ভাবেননি এদেশের মেয়েরা এভাবে সাহস দেখিয়ে মুখ খুলতে শুরু করবে।

উপরের তিনটি ব্যাপারের কোন একটি, দুটি বা সবগুলোই ঘটেছে আমাদের ক্ষেত্রে। আমরা তাই হতভম্ব হয়ে গেছি। একটা কথাই শুধু উচ্চারণ করতে পারছি, ‘কিচ্ছু বলার নাই।’

আমি আমার পরিচিত অপরিচিত সকলের উদ্দেশে বলতে চাই, এই তিনটি মিটু’র একটিও আমাকে অবাক করেনি এবং আমি বিশ্বাস করি এদেশের কোন মেয়ে এই মিটুগুলোতে এতটুকু বিস্মিত হয়নি। কারণ এদেশের শতকরা ৯৯ ভাগ মেয়ে জীবনে কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়, এই তথ্য আমরা সকলেই জানতাম। কিন্তু আপনারা এতদিন তা পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি, আমলে নেননি, মেয়েদের গুরুত্ব দেননি। আজ যখন এক একটা নোংরা ঘটনা চোখের সামনে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে, তাও আবার অভিযুক্ত হয়েছে কোন না কোন রাঘব বোয়াল, তখন আপনারা হতবাক হচ্ছেন। নড়েচড়ে বসছেন। অথচ এই আমরা, ‘নারীবাদি’ বলে যাদের আপনারা নানাভাবে সমালোচনা করেন, এই আমরাই সারাক্ষণ  বলেই চলেছি- এদেশের মেয়েরা জঘন্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। এদেশের পুরুষের অধিকাংশই নানাভাবে মেয়েদের নির্যাতন করে, যার একটা বড় অংশ যৌন হেনস্থা।

বিস্মিত নই, তবু মন বড় বিষাদে ভরা। নিজের জীবনের কত কথাই মনে পড়ে যায়। নয় বছর বয়সে স্কার্টের ভিতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিতো যে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রাইভেট টিউটর, ষাট বছর বয়সী ইংরেজি স্যার যখন খপ করে চেপে ধরত বাহু, যে বন্ধু পাশে বসে উরুতে হাত রেখে হাত ঘষত, যে সহকর্মী বুকের দিকে তাকিয়ে নোংরা কথা বলত, যে বস লোকটি বলতো ‘আপনার হাসব্যান্ড অফিসে গেলে আপনার বাসায় আসবো’, অফিসে যে লোকটি লালসা মেশানো চোখে তাকিয়ে ডাকতো, ‘এই সুন্দরী আমার ঘরে এসো’- সেই সব স্মৃতি একের পর এক শুধু চোখে ভাসে। আমি ভুলতে পারি না। এসব ঘটনাই ২৫ কি ২০ কি ১৫ কি ১০ বছর আগের। আমি এর কোনটাই তো এতদিন বলতে পারিনি তেমন কাউকে, শুধু কিছু প্রিয়জন ছাড়া! এসবের তো কোন প্রমাণও নেই!

যারা বলছেন, সীমন্তি কেন এতদিন এসব বলেনি, তারা কি জানেন একটি মেয়ের জন্য কতটা যন্ত্রণাময় এইসব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা?

গতকাল সন্ধ্যায় যখন সীমন্তির ঘটনাটা নিয়ে নানান কিছু ভাবছি, তখন ফেসবুকে একজন সিনিয়র সাংবাদিককে দেখলাম মিটু নিয়ে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ব্যাঙ্গাত্মক পোষ্ট লিখেছেন। আমি তাতে মন্তব্য করলাম, ‘প্রত্যাশা করি আপনার কন্যাকে যেন কোনদিন #মিটু লিখতে না হয়’।

উনি সাথে সাথে আমার মন্তব্যটি ডিলিট করে দিলেন। কিন্তু যারা তাকে সায় দিয়ে নানান অশ্লীল মন্তব্য করে চলেছে, তাদের মন্তব্যে লাইক দিতে লাগলেন।

সম্ভবত আমার মন্তব্যে তার পিতৃহৃদয় আহত হয়েছিল। নাকি তিনি এড়াতে চেয়েছেন? নাকি তিনি ভেবেই রেখেছেন তার মেয়ের জীবনে কখনো এসব ঘটবে না! নাকি তিনি মনে করেন, সমাজের নির্ধারণ করা সংজ্ঞায় যারা ‘খারাপ মেয়ে’ তারা ছাড়া আর কারো জীবনে এসব হয়রানির ঘটনা ঘটে না!

একজন পুরুষের হৃদয় কখন পিতার আর কখন একজন অন্ধ মূর্খের হয়ে ওঠে? সবাই কি তাই? না তো!

এই যে এই সাতসকালে অফিসে বসের সাথে কথা বললাম, তিনি বললেন, হুসনার মিটু পড়ে তিনি সারারাত ঘুমোননি। নিজের মেয়েটির মুখ শুধু মনে পড়েছে তার। কষ্ট পেয়েছেন তিনি!

তাহলে? পুরুষ কেন উপলব্ধি করতে পারেনা, প্রতিটি মেয়েই কোন না কোন বাবার মেয়ে!

এখন পর্যন্ত যে তিনটি হ্যাশ ট্যাগ মিটু পোষ্ট প্রকাশ পেয়েছে তার দুটিই সরাসরি দু’জন গণমাধ্যম ব্যাক্তিত্বের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাও চোখে পড়ার মত। আমার কাছে মনে হচ্ছে মিডিয়া হাউজগুলো পড়েছে উভয় সংকটে, তারা না পারছে ফেলতে, না পারছে গিলতে। কিন্তু এইসব ঘটনার কোনটাই কি ফেলে দেয়া সম্ভব? অন্ধ হলে কি বন্ধ থাকবে প্রলয়? নাকি তা ক্রমশ ধ্বংস করবে সব!

হ্যাশ ট্যাগ মি টু’কে কোনভাবেই এড়িয়ে যাবার সুযোগ নাই। কারোরই নাই। যৌন নির্যাতন বা হয়রানি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কোন ব্যাক্তির শরীরে নোংরা উদ্দেশে স্পর্শ করা, তাকে অশ্লীল বা উদ্দেশ্যমূলক কথা বলা, তাকে প্রলোভন দেখানো, জোর করা, বারবার হেনস্থা করা ইত্যাদি সবই যৌনহয়রানির মধ্যে পড়ে। এর কোনটিই কম বা বেশি অপরাধ নয়। সবই সমান মাত্রার অপরাধ।

বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে মেয়েরা এইসব হয়রানি সহ্য করে আসছে মুখ বুজে। কখনও আত্মীয়, বন্ধু, কখনও সহকর্মী, শিক্ষক দ্বারা নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। এইসব হয়রানি একটা মেয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য রীতিমত হুমকি। শৈশব কৈশোরেই তাকে এসব হয়রানির শিকার হতে হয় বেশি। এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি বয়োঃসন্ধির মেয়ে বা ছেলের জন্য যা রীতিমত বিভীষিকা। এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, শুধু নারী নয়, পুরুষও যৌন হয়রানির শিকার হয়। সংখ্যায় তা মেয়েদের চেয়ে কম হলেও নগন্য নয়। হ্যাশ ট্যাগ মি টু তাই মেয়েদের একার নয়, হতে পারে পুরুষের যন্ত্রণা প্রকাশের জায়গাও।

মি টু প্রকাশের পর এক শ্রেণির নারী পুরুষ উঠে পড়ে লেগেছে এইসব ঘটনার প্রমাণ উদ্ধারের জন্য। তারা তদন্ত চান। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু যে মেয়েটির শরীরে নোংরা উদ্দেশে হাত দিয়েছিল কোন পুরুষ, সেই স্পর্শের প্রমাণ সে কীভাবে দেয়? সেটা কীভাবে সম্ভব?

হ্যাঁ, তাদের মেলামেশা বা তাদের সম্পর্ক ইত্যাদি বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু তা দিয়ে কতটুকু কী হতে পারে? আমরা কি পিতা কর্তৃক কন্যা ধর্ষণের সংবাদ পড়িনা? আমরা কি নিকট আত্মীয়র হাতে নির্যাতিত নারীর কাহিনী শুনি না? তাহলে আপনারা আসলে কী দিয়ে কী প্রমাণ করতে চান?

মি টু দিয়ে তাহলে আমরা কী চাই? আসলে হ্যাশ ট্যাগ মি টু  বলতে আমরা বুঝিই বা কী?

হ্যাশ ট্যাগ মি টু মানে সত্য প্রকাশ করা। এর মানে অকপটে নিজের ওপর ঘটা হয়রানির কথা জানিয়ে দেয়া। মি টু মানে মনের ভেতর রাখা তীব্র কষ্ট বছরের পর বছর মনের ভেতর চেপে না রেখে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। মি টু মানে ভালোমানুষ সেজে থাকা শয়তানের মুখোশ খুলে দেয়া। মি টু মানে ট্যাবু ভেঙ্গে ফেলা। মি টু মানে, হয়রানি যে করেছে তার অপরাধী চেহারাটা স্পষ্ট করে দেয়া, নিজে লজ্জায় নত হয়ে না থাকা। মি টু মানে সমাজকে জানিয়ে দেয় এদেশের মেয়েরা কী দুর্বিষহ কষ্টে জীবন পার করে, কত অসম্ভব সব কুৎসিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয়। কত কত বিকৃত লোকের সাথে যুদ্ধ করে তাকে টিকে থাকতে হয়!

মি টু মানে জানিয়ে দেয়া, এই সমাজের পচন আজ এতটাই বীভৎস হয়ে উঠেছে যে আর তাকে লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। যে পুরুষেরা দিনের পর দিন মেয়েদের নানা ধরনের যন্ত্রণা দিয়ে এসেছে, মি টু হল সেইসব বিকৃত পুরুষদের জন্য সতর্কবার্তা। মি টু মানে বাকি পুরুষদের জানিয়ে দেয়া, আর নয়। এইবার থামতে হবে।

শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে মেয়েদের নিগৃহিত করে রাখার কাল শেষ হয়ে আসছে। ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মেয়েরা। আরো বেশি রুখে দাঁড়াবে। যারা চোখ বুঁজে ছিল, যারা ‘না না’ বলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলো, যারা লুকাতে চাইছিল, যারা ঢেকে রাখতে চাইছিল, তাদের সকলের জানতে হবে, একদিন আপনার ঘরের কন্যা সন্তানটিও এই হয়রানির মুখে পড়তে পারে। আজ যে বিকৃত পুরুষটিকে আপনি ছাড় দিতে চাইছেন, কি সমর্থন দিচ্ছেন, অস্বীকার করতে চাইছেন, একদিন আপনার কন্যাটি তারই মত কোন পুরুষের হাতে নিগৃহিত হতে পারে। তাই সাবধান হোন। নারীকে ভোগে বস্তু ভেবে নিজেকে আর অসম্মানিত হবেন না। কারণ নারী তার সাহস প্রমাণ করেছে। নারী নিজের সম্মান ধরে রেখেছে। এখন বাকি দায়িত্ব আপনাদের, নিজেদের মানুষ হিসেবে প্রমাণ দিতে হবে আপনাদেরকেই।  নারীর প্রতি সব ধরণের যৌন হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং তা এখনই।

জয় হোক #MeToo এর।

সারাবাংলা/ এসএস

#মিটু: নিজেদের প্রমাণ করুন মানুষ হিসেবে
#মিটু: নিজেদের প্রমাণ করুন মানুষ হিসেবে
#মিটু: নিজেদের প্রমাণ করুন মানুষ হিসেবে