বুধবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ , ১২ বৈশাখ, ১৪২৫, ৮ শাবান, ১৪৩৯

২০১৭’য় যত নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ!

ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭ | ১:১৮ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল মাওয়া

বছর শেষের সূর্যাস্তের একদম কাছাকাছি চলে এসে বারবার ফিরে তাকাই। কেমন ছিল এই বছরটা; বিশেষত নারীদের জন্যে কেমন ছিল প্রতিটি দিন? বেশ কিছু আশা জাগানিয়া খবরের মাঝেও দগদগে ঘা হয়ে জ্বলতে থাকে রূপার ছবি। সংগ্রামী একটি মেয়ে, পারিবারিক, অর্থনৈতিক নানান সংকটক মোকাবেলা করে দৃঢ়পায়ে এগিয়ে যাওয়া একটি মেয়ের পথচলা যখন থেমে যায় কিছু মদ্যপ মূর্খ পরিবহন শ্রমিকের হাতে, তখন গোটা জাতি থমকে যেতে বাধ্য হয়। ভাবতে বাধ্য হই, আসলেই আমরা কতটুকু এগিয়েছি?

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের হিসেব অনুযায়ী গতবছর থেকে এই বছর নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে ৫৮ শতাংশের বেশি। গত বছর অক্টোবর থেকে এই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নারী নির্যাতনের সংখ্যা ৯১৯৬ টি। এর মধ্যে ৬৮ ভাগ ঘটনা নথিভূক্তই হয়নি। সব ধরনের নির্যাতনকে ছাপিয়ে গেছে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো। এ বছর এ পর্যন্ত রিপোর্টেড ধর্ষণের সংখ্যা ১ হাজার ৭৩৭ এরও বেশি। শুধু তাই নয় শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনা এই বছর ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। বছরের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত ৩৯৯ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৫৮ শিশু হয়েছে গণধর্ষণের স্বীকার। এদের মধ্যে ৩৭ জন প্রতিবন্ধী শিশু।

ধর্ষণের মত বিকারগ্রস্ত এই নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচারকাজ যতটা দ্রুততার সাথে করে অপরাধীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত, তত দ্রুত সেই কাজটি হচ্ছেনা। বরং অনেকক্ষেত্রেই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হতে এক যুগেরও বেশি সময় কেটে যাচ্ছে।

রুপা

এই বছর চাঞ্চল্যকর শাজনীন ধর্ষণ ও হত্যামামলার আসামিকে ফাঁসি দেয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ১৯ বছর পরে। এই মামলার বাদীরা ছিলেন প্রচন্ড প্রভাবশালী তবুও ন্যায়বিচার পেতে তাদের লেগে গিয়েছে সুদীর্ঘ একটা সময়। সেক্ষেত্রে গত ২৫ অগাস্টে ছোঁয়া পরিবহনের বাসে ধর্ষণ এবং খুনের শিকার হওয়া ইউনিলিভার কর্মী জাকিয়া সুলতানা রূপার পরিবারকে ন্যায়বিচারের জন্যে কত বছর অপেক্ষা করতে হবে সেই অনুমান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কিংবা আদৌ কি রুপা ন্যায়বিচার পাবে? ইতিমধ্যেই রুপা হত্যা মামলার পাঁচ আসামিই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারপরও এখনো মামলাটির উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি। রুপার স্বজনেরা মামলাটি দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে উল্লেখ করেছে যে, আসামিদের স্বজনেরা কালক্ষেপণের সুযোগে মামলার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। গত ১২ ডিসেম্বর আঁখি আক্তার নামে চার বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এর আগে জুলাই মাসে তানহা নামের আরেকটি চার বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়। এসব রোমহর্ষক ঘটনার যেন কোন শেষ নেই।

এতসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণের যে ঘটনা সারাদেশে বেশ তোলপাড় তুলেছে, সেটি হল রাজধানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে নিয়ে তিন তরুনীকে ধর্ষণের ঘটনা। এই মামলার প্রধান আসামিদের একজন হলেন দেশের নামকরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলারসের মালিকের পুত্র সাফাত আহমেদ। নানান কারনে মামলাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। এসব আলোচনা থেকে ভিক্টিম ব্লেমিং এর প্রবণতা স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গিয়েছে। অনেকেই বলার চেষ্টা করেছে, কেন এই নারীরা রাতের বেলা পার্টিতে গেল?

ধর্ষণের ঘটনাই একমাত্র অপরাধ যেখানে ভিক্টিমকেও অনেকেই অপরাধী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে। হয়তো সে কারনেই দেশে প্রতি বছর ধর্ষণের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকে। ধর্ষণের শিকার হবার পর আবার সেই ধর্ষিতাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে এই বছরের জুলাই মাসে বগুড়ায়। গত ১৭ জুলাই বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের নেতা তুফান এক কিশোরীকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেবার নাম করে নিজ বাসায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। অন্যায়ের শিকার কিশোরীটি মামলাও করেনি তখনো, কিন্তু ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে ২৭ জুলাই তুফান সরকারের স্ত্রী আশা সরকার ও তাঁর বোন বগুড়া পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রূমকি কিশোরী এবং তাঁর মা’কে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করে এবং মাথা ন্যাড়া করে দেয়। পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে।

দেশজুড়ে ধর্ষণের এই উন্মত্ততায় আমাদের এই ভিক্টিম ব্লেমিং এর প্রবণতা কি সূক্ষ্ম কোন ভূমিকা রাখে? ভেবে দেখা দরকার। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আইনগত জটিলতা ও দুর্বলতাও এই জঘন্য অপরাধটির পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে।

ছবিঃ কামরুল হাসান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা যায় ধর্ষণের পাশাপাশি পারিবারিক নির্যাতনের হারও বেড়েছে এ বছর। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত অক্টোবর মাসে পারিবারিক নির্যাতনে ২৮ জন নারী খুন হয়। উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন মোতাবেক, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে মোট ৩০৫টি পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২০৭ জন নারীকে স্বামী হত্যা করে। নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে ৩৯ জন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি দেশের ৫৬টি জেলা থেকে নির্যাতনের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট তৈরি করে। রিপোর্টের ২০১৬ ও ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলছে। প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালে অক্টোবর মাস পর্যন্ত নারী নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮২৫টি; যা ২০১৭ সালের একই সময়ে ৫৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ১৯৬টি।

যদিও মনে করা হয় আত্মনির্ভরশীল নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পান, তবে এ বছরের রেকর্ড আমাদেরকে ভিন্ন তথ্যই দেয়। এ বছর বহুল আলোচিত একটি ঘটনা ছিল চিত্রনায়ক শাকিব খান আর চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের পারিবারিক কলহের বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত শাকিব খান তাঁর স্ত্রী অপু বিশ্বাসকে ডিভোর্সের নোটিশ দেন এবং ডিভোর্সের কারন হিসেবে শাকিব জানান, “অপু তার পছন্দের সীমার মধ্যে থাকেননি”। এর আগে শাকিব খানের অনুরোধক্রমে অপু আট বছর যাবত তাদের বিয়ের ঘটনা লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং এর মধ্যে তাদের একটি সন্তানও হয়। সন্তানের ছয় মাস বয়সে গত এপ্রিলে অপু জনসম্মুখে তাদের বিয়ের ঘটনা প্রকাশ করেন। আর এই গোপন বিয়ের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার প্রায় আট মাস পর বিচ্ছেদের নোটিস পেলেন অপু। এটি পরিষ্কারভাবেই পারিবারিক নির্যাতনের ইঙ্গিত বহন করে। এদিকে এ মাসেই রাজধানীর মুগদায় পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের সদস্য ও ঢাকা মহানগর সংসদের সাবেক সম্পাদক লুদমিনা আহমেদ লিজা (৩৮)।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বাস্তবায়নে সমস্যা ও সমাধান শীর্ষক কর্ম অধিবেশনে বিচারকরা জানান, এই আইনে বেশ কিছু ত্রুটি থাকায় বিচারকাজে তারা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা আরো জানান, মামলা পরিচালনায় আইনী ত্রুটি, সাক্ষী ও চিকিৎসকদের আদালতে না আসা, ট্রাইবুনালের স্থানাভাব ও নথি সংরক্ষিত না থাকায় বিচার কাজ বাঁধাগ্রস্ত হয়। গত ১৭ বছরেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কোন সংশোধনী আনা হয়নি।

এরমধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে “বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিয়ের বয়সসীমা শিথিল” করে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন পাশ হয় জাতীয় সংসদে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটি যথেষ্ট আশঙ্কাজনক একটি বিষয়। এর মাধ্যমে অনেক সময় ধর্ষণের শিকার শিশু অথবা কিশোরীকে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেবার ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। ১৮ বছর বয়স হবার আগেই এদেশে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আর এমন একটি আইন এই কর্মকাণ্ডকে আরো গতিশীল করবে বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

সব ধরণের নির্যাতনের শেকলকে দৃঢ়তার সাথে ভেঙ্গে ফেলে অনেক নারীই বেরিয়ে আসছেন, কর্মক্ষেত্রে রাখছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। তবে সেখানেও রয়েছে যন্ত্রণা। গত নভেম্বরে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং নামের একটি সংগঠনের আয়োজিত “কেমন আছেন অভিবাসী নারী শ্রমিকেরা” শীর্ষক গণশুনানিতে উঠে আসে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মর্মস্পর্শী নির্যাতনের বর্ণনা। তবে এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণের খবর আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনের নানান স্তরে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখনো নারীদের নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যায়না। এই বছর দেশে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ও মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এগুলোর একটিতেও কোন নারী পরিচালকের অংশগ্রহণ ছিলনা, যা খুবই হতাশাজনক।

এতসব হতাশাজনক খবরের মধ্যেও নতুন বছরের সূর্য উঠবে আর আমাদের প্রত্যাশার পারদও থাকবে আকাশছোঁয়া। সকল বাঁধাকে পেছনে ফেলে এদেশের মেয়েরা এগিয়ে যাবেই।

ফিচার ফটোঃ ফারহানা ফারা

সারাবাংলা/আরএফ

Tags: , ,

আরও পড়ুন