Wednesday 07 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইজারার শর্ত অমান্য করে আদায় হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া!

এস এম মাসুদুর রহমান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৬ জুন ২০২৫ ০৮:১০
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফরিদপুর: জেলার পদ্মাবেষ্টিত চরাঞ্চলে যাতায়াতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে নৌকার মালিক ও মাঝিমাল্লাদের বিরুদ্ধে। একবছর মেয়াদী ১৪৩২ বাংলা সনের ইজারা শর্ত উপেক্ষা করেই ইঞ্জিনচালিত নৌঘাটগুলোতে চরবাসীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় চলছে। ফলে নদী পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরে আসা-যাওয়া করা চরের মানুষদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি।

জেলার সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল, ডিক্রীরচর, চরমাধবদিয়া ও আলিয়াবাদ ইউনিয়নের বহু জায়গাজুড়ে জেগে উঠেছে চর। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এসব চরে এখন লাখো মানুষের বসবাস। সুবিধাবঞ্চিত এই জনপদের মানুষদের কৃষি কাজই প্রধান অবলম্বন। পাশাপাশি জেলে, কামার, মুচি, ধোপাসহ নানান শ্রেণি-পেশার মানুষও চরে বসবাস করে জীবিকা নির্বাহ করছে। স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে এইসব জনপদে। কিন্তু শহরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের জন্য পাড়ি দিতে হয় পদ্মা নদী। আর এ জন্য চড়তে হয় ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার, কিংবা কোসা নৌকায়।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছর সদর উপজেলার তত্ত্বাবধানে ধলার মোড়, টেপুরাকান্দি ও ভাজনডাঙ্গা এই তিনটি খেয়াঘাট বা ইঞ্জিনচালিত নৌঘাটগুলো সর্বোচ্চ দরদাতাদের মাঝে ইজারা দেওয়া হয়।

টেপাখোলা ধলার মোড় নতুন বেড়ীবাঁধ ইঞ্জিন চালিত নৌঘাট থেকে পালডাঙ্গী, বেপারী ডাঙ্গী, গেন্দুমোল্যার হাট হয়ে মুনছুরাবাদ ও নর্থচ্যানেল-২ আদর্শ গ্রাম পর্যন্ত এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করে। পাশাপাশি একই এলাকার সিএন্ডবি নৌবন্দরসংলগ্ন টেপুরাকান্দি ঘাট থেকে কবিরপুর চর পর্যন্ত ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বা ট্রলারে করে ডিক্রীরচর ও নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের মানুষ নদী পথে যাতায়াত করে থাকে। এ ছাড়া, ভাজনডাঙ্গা ভুইয়াবাড়ী ঘাট দিয়ে গদাধর ডাঙ্গী সাইনবোর্ডসহ আশেপাশের চরে নদী পারি দিয়ে যাতায়াত করে।

এইসব নদী পথে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীসহ গবাদিপশু পারাপার হয়। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত ইজারা টোল চার্টের বাইরে ইচ্ছে মতো ভাড়া আদায় করছে ট্রলার মালিক ও মাঝিরা। কবিরপুর চরের বাসিন্দা পলাশ খানসহ একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, ধলার মোড় ও টেপুরাকান্দি ঘাট থেকে সরকার নির্ধারিত নদী পথে যাতায়াতের জন্য জন প্রতি (প্রাপ্তবয়স্ক) ৩০ টাকা, গরু ৫০ টাকা, ছাগল ১০ টাকা, অন্যান্য মালামাল মত প্রতি ২ টাকা ধার্য থাকলেও মানুষ ভেদে ৪০-৫০ টাকা, গরু ২০০-৪০০ টাকা, ছাগল ৫০-১০০ টাকা ও মালামালের জন্য ৬০ টাকা থেকে ২০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের এমন নানা অভিযোগ জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গায় দিলেও ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে না বলেও জানান এই পথের যাত্রীরা।

ইজারার শর্ত অমান্য করে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ নৌকার মালিক ও মাঝি-মাল্লাদের বিরুদ্ধে। ছবি: সারাবাংলা

ইজারার শর্ত অমান্য করে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ নৌকার মালিক ও মাঝি-মাল্লাদের বিরুদ্ধে। ছবি: সারাবাংলা

টেপুরাকান্দি ঘাটের সরদার ও মাঝি আব্দুস সামাদ মোল্যা সারাবাংলার এই প্রতিনিধিকে জানান, এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১০টি ট্রলার চলাচল করে। সকালের ট্রলার দেড় ঘণ্টা পর পর দুই টিপ ছাড়ে। তার পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় কবিরপুর চরে যাতায়াত করে। দিনে একটি ট্রলার শুধু একবার আসা-যাওয়া করে।

তিনি বলেন, ‘টেপুরাকান্দি ঘাট বাবদ ৫৫ লাখ টাকা দিছি। তেল খরচ, মাঝির বেতন দিয়ে ৩০ টাকা করে নিলে আমাগো কিছুই থাকবে না। ঘাট যদি কম টাকায় পাইতাম, তাহলে আমরাও কম নিতাম। কিন্তু এখন তো আর সম্ভব না। কম নিলে তো আমরা বাচুম না।’

এদিকে ধলার মোড় ঘাট থেকে ২২টি ট্রলার দুই ধাপে ভাগ হয়ে একদিন পর পর টিপ পায় বলে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান ট্রলার মালিক জাবলু পাটনীদার। তিনি বলেন, ‘ঘাট নিতে ৩২ লাখ টাকার বেশি পড়ে গেছে। আমরা জনপ্রতি ৪০ টাকা করে নিই। আর গরু ৩০০-৪০০ টাকা। মোটরসাইকেল পারাপার একশ টাকা। তবে বাচ্চা ও ছাত্র-শিক্ষকদের ভাড়া নেওয়া হয় না। নদী পাড়ি দিয়ে চরে পৌঁছাতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু সরকারি যে ভাড়ার রেট তাতে চালান থাকবে না।’

অপরদিকে ঘাট ইজারা পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে টিনের বোর্ডে সরকার অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট টাঙানোর শর্ত থাকলেও একমাসে কোনো ঘাটে সেগুলোর দেখা মেলেনি। এ ছাড়াও, ঘাটে কোনো যাত্রী ছাউনি, পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও সুপেয় পানি না থাকায় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ১ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য মো. হায়দার খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চরগুলোতে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। চরাঞ্চলে পণ্যপরিবহণসহ প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র উপায় ট্রলার। পাল্লা দিয়ে বেশি টাকায় খেয়াঘাটের ডাক নেওয়ায় নৌকার মালিক ও মাঝিরা বিপাকে পড়ে যায়।’ তবে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে মাঝে-মধ্যে প্রশাসনের পদক্ষেপ থাকলেও খুব একটা কাজে আসে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত জাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চরে যাতায়াতের জন্য খেয়াঘাট ইজারায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। টোল বা ভাড়ার চার্ট টাঙানো, যাত্রী সেবা বৃদ্ধিসহ ঘাটের অন্যান্য সমস্যার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চরের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।’

নদী পারাপারে যারাই ইজারা শর্ত অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ইউএনও ইশরাত।

সারাবাংলা/পিটিএম