Tuesday 20 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রিকারিয়েট ও আগামীর সংকেত

ড. মতিউর রহমান
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:৩৮
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনার চিরচেনা ছকগুলো আমূল বদলে গেছে; অতীতে নির্বাচনের মাঠ কাঁপানো গালভরা অর্থনৈতিক বুলি বা উন্নয়নের পরিসংখ্যান এখন সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তবতার কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। দৃশ্যমান রাজনীতির সমান্তরালে আজ এক শক্তিশালী জনস্রোত তৈরি হয়েছে, যারা মূলত অনানুষ্ঠানিক ও সুরক্ষাহীন শ্রমের সঙ্গে যুক্ত—যাদের ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং ‘প্রিকারিয়েট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই শ্রেণির সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটি হলো এ দেশের তরুণ প্রজন্ম; যেখানে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি নিয়ে অনিশ্চিত পেশায় থাকা যুবক থেকে শুরু করে স্মার্টফোনে ভাগ্য খোঁজা রাইড-শেয়ারিং চালক পর্যন্ত সবাই অন্তর্ভুক্ত। মূলত এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় তরুণ ভোটাররাই এখন দেশের নির্বাচনী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গাই স্ট্যান্ডিং যখন প্রিকারিয়েট শ্রেণির কথা বলেন, তিনি কেবল দারিদ্র্যকে বোঝাননি; তিনি বুঝিয়েছেন এক ধরণের মৌলিক অনিশ্চয়তাকে। এই অনিশ্চয়তা কেবল আয়ের নয়, বরং পরিচয়েরও। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, এক বিশাল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ প্রথাগত চাকরির বাজার থেকে ছিটকে পড়ে অনানুষ্ঠানিক শ্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তারা ফ্রিল্যান্সিং করছে, ডেলিভারি সার্ভিসে কাজ করছে কিংবা পার্ট-টাইম কোনো অনিরাপদ পেশায় যুক্ত হচ্ছে। এদের অনেকেরই কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই সামাজিক সুরক্ষার কোনো ছাতা। এই ‘তরুণ প্রিকারিয়েট’ গোষ্ঠী ২০২৬ সালের নির্বাচনে কেবল একটি ভোট ব্যাংক নয়, তারা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, তাদের ক্ষোভ এবং আকাঙ্ক্ষাগুলো আগের প্রজন্মের মতো কেবল দলীয় আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না।

২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে এই তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণ হবে অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং অভিজ্ঞতা-চালিত। স্ট্যান্ডিংয়ের বিশ্লেষণে প্রিকারিয়েটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অক্ষমতা। যখন একজন তরুণ গ্র্যাজুয়েট দেখে যে তার মাসিক আয় দিয়ে কেবল বর্তমানের খরচই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সে রাজনীতিকদের দীর্ঘমেয়াদী রঙিন প্রতিশ্রুতিতে আস্থা হারিয়ে ফেলে। তাদের কাছে ভোট এখন কোনো উৎসব নয়, বরং একটি ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম। তারা এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুঁজছে যারা তাদের জীবনের এই কাঠামোগত অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারবে। এই তরুণরা রাজনীতির ময়দানে কেবল স্লোগান দিতে চায় না, তারা চায় তাদের সৃজনশীলতা ও শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনি সুরক্ষা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে তরুণদের রাজপথের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানের তরুণ প্রিকারিয়েট অনেক বেশি ডিজিটালভাবে সংযুক্ত এবং সচেতন। তারা কেবল সভার লোকসংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী নয়, বরং তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে তাদের নিজেদের জীবনের মানদণ্ড দিয়ে বিচার করছে। স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির প্রধান হাতিয়ার। আগে যেখানে অভিযোগগুলো ঘরের কোণে বা চায়ের দোকানে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা মুহূর্তেই ডিজিটাল বয়ানে রূপান্তরিত হয়ে জনমতে প্রভাব ফেলছে। এই ‘ডিজিটাল প্রেসার গ্রুপ’ ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ভীতি জাগানিয়া বাস্তবতা। কারণ, এই ক্ষোভ কখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা প্রথাগত গোয়েন্দা সংস্থা বা দলীয় কর্মীরা অনেক সময় আঁচ করতে পারে না।

এই শ্রেণির তরুণদের রাজনৈতিক আনুগত্য উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নয়। তারা তাদের বাবা-মায়ের রাজনৈতিক আদর্শকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতে আর ইচ্ছুক নয়। বরং তারা রাজনীতিকে মূল্যায়ন করছে কর্মসংস্থানের সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের আয়না দিয়ে। যখন তারা দেখে যে শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত কিংবা সরকারি সেবা পেতে হলে অনিয়মের আশ্রয় নিতে হয়, তখন তাদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়, তা মূলত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর থেকেই বিশ্বাস কমিয়ে দেয়। গাই স্ট্যান্ডিং সতর্ক করেছেন যে, প্রিকারিয়েট যদি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে পরিত্যক্ত মনে করে, তবে তারা উগ্রপন্থা বা চরম উদাসীনতার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামনে এই ঝুঁকিটি অত্যন্ত বাস্তব, যদি রাজনৈতিক দলগুলো এই তরুণদের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়।

অনিশ্চয়তা এখন আর কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি এখন একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রিকারিয়েটরা এখন এক ধরণের ‘সময়হীনতা’ বা ‘টাইম স্কুইজ’-এর মধ্যে বাস করছে। তাদের জীবনের কোনো স্থিরতা নেই—আজকের কাজ কাল থাকবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই অস্থিরতা সরাসরি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। তারা সেই রাজনৈতিক আখ্যানের প্রতি বিরূপ, যা কেবল তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত। তারা চায় এমন এক পরিবর্তন যা সরাসরি তাদের বাজারের খরচ কমাবে, তাদের ইন্টারনেটের গতি বাড়াবে কিংবা তাদের পেশাগত মর্যাদাকে আইনি ভিত্তি দেবে। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কোনো মেগা নেরেটিভের লড়াই নয়, এটি হবে মূলত এক টুকরো নিশ্চয়তা পাওয়ার লড়াই।

প্রিকারিয়েটের এই ভিন্নধর্মী চরিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কৌশলকে বড় ধরণের পরীক্ষার মুখে ফেলবে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নির্বাচনের আগে প্রতীকী কিছু দান-খয়রাত বা সাময়িক ভাতা দিয়ে ভোটারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করে। কিন্তু তরুণ প্রিকারিয়েট এখন আর কেবল ‘বেনিফিশিয়ারি’ বা সুবিধাভোগী হয়ে থাকতে চায় না। তারা চায় অংশীদারিত্ব। তারা চায় এমন এক শ্রমনীতি যা তাদের ডিজিটাল শ্রমকে স্বীকৃতি দেবে, তারা চায় এমন এক নগর পরিকল্পনা যা একজন হকার বা একজন ডেলিভারি কর্মীর অধিকারকে সুরক্ষা দেবে। ২০২৬ সালে রাজনৈতিক ইশতেহারে যদি এই বাস্তব ইস্যুগুলো গুরুত্ব না পায়, তবে তরুণ ভোটারদের এক বিশাল অংশ ভোটদান থেকে বিমুখ হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক বৈধতার জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করবে।

ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণেও এই প্রিকারিয়েট শ্রেণিটি আরও বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে শহরে আসা তরুণদের যে জীবন সংঘাত, তার সঙ্গে মিশে গেছে শহরের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বেকারদের হতাশা। এই দুই ধারা মিলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে এক অপ্রতিরোধ্য সামাজিক চাপ তৈরি করছে। স্ট্যান্ডিংয়ের ভাষায়, প্রিকারিয়েট হলো এমন এক শ্রেণি যা সর্বদা অস্থির এবং পরিবর্তনকামী। বাংলাদেশে এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে তরুণরা। তারা আর কোনো দল বা নেতার অন্ধ ভক্ত নয়; তারা এখন রাজনীতির প্রতিটি পদক্ষেপকে তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিটি মুদ্রার বিপরীতে পরিমাপ করছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার হাতবদলের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি চূড়ান্ত মুহূর্ত। এই নির্বাচনে প্রিকারিয়েট ও তরুণ প্রজন্মই হবে সেই নীরব নির্ণায়ক, যারা রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, তরুণরা এখন কেবল আগামীর নেতা নয়, তারা বর্তমানের সবচেয়ে সংকটাপন্ন এবং দাবিপ্রবণ ভোটার। গাই স্ট্যান্ডিংয়ের সতর্কবাণী অনুযায়ী, যে প্রিকারিয়েট নিজেকে উপেক্ষিত মনে করে, সে একসময় অনিশ্চিত হয়ে ওঠে এবং সেই অনিশ্চয়তা পুরো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই নড়বড়ে করে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে হলে দলগুলোকে কেবল স্লোগান দিয়ে কাজ হবে না; তাদের হতে হবে সংবেদনশীল। তরুণদের বেকারত্বের গ্লানি, অনানুষ্ঠানিক শ্রমের অসম্মান এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—এই বিষয়গুলোকে রাজনীতির প্রধান আলোচ্য সূচিতে নিয়ে আসতে হবে। যে দল এই বিশাল ‘প্রিকারিয়েট’ শ্রেণির চোখের ভাষা আর আগামীর লড়াইয়ের সংকেত পড়তে পারবে, তারাই শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের নির্বাচনে মানুষের আস্থা জয় করতে পারবে। অন্যথায়, সাধারণ ভোটারের এই অসাধারণ চাপ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

সারাবাংলা/এএসজি