Saturday 10 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড: এক সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের খতিয়ান

ফারহানা নীলা
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৩৯

ব্রাসেলসের রাজপ্রাসাদের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ঘোড়ায় চড়া যে বিশালকার ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটি পর্যটকদের নজর কাড়ে, সেটি বেলজিয়ামের দীর্ঘতম সময়ের শাসক রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের। ইতিহাসে তিনি ‘বিল্ডার কিং’ বা ‘স্থপতি রাজা’ হিসেবে পরিচিত হলেও, তার এই ভাস্কর্যকে ঘিরে জড়িয়ে আছে গত দেড়শ বছরের এক অমীমাংসিত বিতর্ক, যা আজও ইউরোপের রাজনীতির অলিগলিতে ঝড় তোলে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকা মহাদেশকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছিল, তখন বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড এক অদ্ভুত চাল চালেন। তিনি আফ্রিকার বিশাল এক ভূখণ্ডকে বেলজিয়াম রাষ্ট্রের নামে নয়, বরং নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেন। ১৮৮৫ সালে বার্লিন কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক ভূখণ্ডের মালিক হন, যার নাম দেওয়া হয় ‘কঙ্গো ফ্রি স্টেট’।

বিজ্ঞাপন

‘বিল্ডার কিং’ এর আড়ালে এক নিষ্ঠুর শাসক

বেলজিয়ামের ভেতরে লিওপোল্ড ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি ব্রাসেলসকে লন্ডনের মতো জাঁকজমকপূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। আজকের বেলজিয়ামের আর্ক অফ সিনকুয়ান্টেনায়ার (Arc du Cinquantenaire), রয়্যাল মিউজিয়াম ফর সেন্ট্রাল আফ্রিকা এবং অগণিত পাবলিক পার্ক তার হাত ধরেই তৈরি। কিন্তু এই রাজকীয় জৌলুস তৈরির অর্থ আসত কঙ্গোর সম্পদ থেকে। বিশেষ করে সেই সময় সারা বিশ্বে সাইকেলের টায়ার এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের জন্য প্রাকৃতিক রাবারের চাহিদা আকাশচুম্বী ছিল।

রাবার ও হাত কাটার বিভীষিকা

লিওপোল্ডের শাসনামলে কঙ্গোর স্থানীয় মানুষের ওপর যে বীভৎসতা চালানো হয়েছিল, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। রাবার সংগ্রহের কোটা পূরণ করতে না পারলে স্থানীয় পুরুষ, নারী এমনকি শিশুদেরও হাত কেটে নেওয়া হতো। হাজার হাজার মানুষের হাত কাটা ছবি সে সময় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তার শাসনামলে অপুষ্টি, রোগ এবং অত্যাচারে কঙ্গোর জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি কমে গিয়েছিল।

ভাস্কর্যের গায়ে কেন লাল রঙ?

অশ্বারোহী ভাস্কর্যটি লিওপোল্ডের সেই দর্প ও ক্ষমতারই প্রকাশ। তবে গত কয়েক দশকে এই মূর্তিগুলো প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে যখন বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন বেলজিয়ামের সাধারণ মানুষই এই ভাস্কর্যের গায়ে লাল রঙ ঢেলে দেন। এটি ছিল সেই রক্তক্ষরণের প্রতীক, যা এক সময় কঙ্গোর মাটিতে ঝরেছিল। অনেক ক্ষেত্রে মূর্তির হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যেটি লিওপোল্ডের সৈন্যদের দ্বারা মানুষের হাত কেটে ফেলার করুণ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।

ইতিহাসের সংশোধন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

দীর্ঘদিন ধরে বেলজিয়ামের পাঠ্যপুস্তকে লিওপোল্ডকে কেবল একজন মহান নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বর্তমান প্রজন্মের দাবিতে সেই ইতিহাস পরিবর্তিত হচ্ছে। বেলজিয়াম সরকার এখন সরকারিভাবে স্বীকার করে যে, লিওপোল্ডের শাসনামল ছিল চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সময়। অনেক শহরের পাবলিক চত্বর থেকে তার মূর্তি সরিয়ে নিয়ে জাদুঘরে বা সংরক্ষিত স্থানে রাখা হচ্ছে।

একটি নৈতিক প্রশ্ন

লিওপোল্ডের এই ভাস্কর্যগুলো আজ আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। ইতিহাসের কোনো নায়ককে কি কেবল তার করা স্থাপত্য বা উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিচার করা হবে, নাকি তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের যন্ত্রণার খতিয়ানও সেখানে সমান গুরুত্ব পাবে?

ছবি: লেখক

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

সিলেটে বাসচাপায় মা-মেয়ে নিহত
১০ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৪২

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন