Friday 06 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস আজ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৫৫ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:০৭

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম।

সুনামগঞ্জ: ভাটি বাংলার মানুষের জীবন, সম্প্রীতি ও মাটির গন্ধে ভরা অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান‘, ‘কোন মেস্তুরি নাও বানাইলো’, ‘গাড়ি চলে না চলে না’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’, ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’, ‘আমি এই মিনতি করিরে’, ‘রঙের দুনিয়া আর চাই না’, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’—এমন বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। আজ ১২ সেপ্টেম্বর তার ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও অমর হয়ে আছেন।

শাহ আব্দুল করিমের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওড়, কালনী নদীর তীরবর্তী উজানধল গ্রামে। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর ইব্রাহিম আলী এবং মা নাইওরজান বিবি। দরিদ্র পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হিসেবে ছোটোবেলা থেকেই জীবিকার জন্য শ্রম দিতে হয়েছে তাকে।

বিজ্ঞাপন

অভাবের সংসারে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা থাকলেও গান থেকে দূরে থাকেননি শাহ আব্দুল করিম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও নিজের চেষ্টায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা লোকসংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক। গ্রামের মোড়ল বাড়িতে গরুর রাখালের কাজ করতেন তিনি। সেই সময় ঈদের দিনেও ছুটি না পাওয়ার কষ্ট থেকে তিনি লিখেছিলেন—
‘মাঠে থাকি গরু রাখি,
ঈদের দিনেও ছুটি নাই,
এই দুঃখ কার কাছে জানাই’।

গরু চরানোর ফাঁকে হাতে থাকা দোতারা নিয়ে গান গাইতেন তিনি। নিজেই গান লিখতেন, সুরও করতেন। তার মা নাইওরজান বিবি গ্রামের আরেক গানপাগল মানুষ করম উদ্দিনকে ‘ধর্মের বাবা’ ডেকেছিলেন। সুযোগ পেলেই করম উদ্দিনের কাছে গিয়ে গানের তালিম নেওয়ার চেষ্টা করতেন শাহ আব্দুল করিম।

করম উদ্দিনের পৌত্র ৭২ বছর বয়সি আকমল হোসেন বলেন, ‘আমার দাদা করম উদ্দিনের কাছে গানের তালিম নিতে আসতেন শাহ্ আব্দুল করিম। দাদা তাকে ভালোবাসতেন। আমার বাবা আছদ্দর মিয়া ও শাহ্ আব্দুল করিম পরে একসঙ্গে বিভিন্ন মালজোড়া গানের আসর করেছেন। তখন গান গেয়ে তেমন টাকা-পয়সা মিলতো না। তবুও বাউল করিম গানের আসরে যেতেন।’

আকমল হোসেন আরও বলেন, ‘নিজের খাওয়া, থাকা, সংসারের চিন্তা কখনো মাথায় নেননি শাহ্ আব্দুল করিম। গানপাগল ছিলেন ছোটোবেলা থেকে। করিমের সংসারে এতোটা দারিদ্র্য ছিল, তার পাঁচ বোনকে বিয়ে দিতে পরিবারকে আর্থিকভাবে বেগ পেতে হয়েছে তখন।’ তিনি বলেন, ‘শাহ্ আব্দুল করিম ২৫-৩০ বছর বয়সে কোথাও মালজোড়া বা যাত্রা হলেই যেতেন।’

একসময় শুধু হাওড়াঞ্চলের জেলাগুলোতেই জনপ্রিয় ছিলেন শাহ আব্দুল করিম। তবে গত তিন দশকে তার বহু গান ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাভাষী মানুষের মাঝে। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এখন সারাবিশ্বের মানুষ তার গান শুনছেন।

এলাকাবাসী জানান, ১৫ বছর বয়সে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন শাহ আব্দুল করিম। কিন্তু তিনি ভর্তি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও জীবদ্দশায় তিনি দেড় হাজারের বেশি গান রচনা ও সুর করেছেন।

গানের পাশাপাশি শাহ আব্দুল করিম ছিলেন রাজনীতি সচেতন। গণমানুষের সুখ-দুঃখ, ভাটি বাংলার জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তার গানে উঠে এসেছে প্রতিবাদের ভাষা। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাঙালির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার গান মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

শাহ আব্দুল করিমের লেখা গান নিয়ে এ পর্যন্ত ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো ‘আফতাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’। বাংলা অ্যাকাডেমি তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। জীবদ্দশায় তিনি একুশে পদক, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

তবে এসব সম্মান-পুরস্কারের তোয়াক্কা না করে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন এই বাউল সাধক।

তার একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল বলেন, ‘বাবার জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকীতে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত-শত বাউলভক্ত আসেন আমাদের বাড়িতে। তাদেরকে থাকা-খাওয়া ও বসার জায়গা দিতে পারি না। গত বছর লালন সাঁইজির আখড়া থেকে আসা বাউল-সাধকদের থাকার জায়গা দিতে পারিনি। দশ বছর আগে শাহ্ আব্দুল করিম সঙ্গীতালয় ও শাহ আব্দুল করিম কমপ্লেক্স হওয়ার কথা ছিল, সেটাও হয়নি। কবে হবে তাও জানি না।’

তিনি বলেন, ‘আজ বিকেলে বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন। সন্ধ্যায় গানের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। বাবার স্মরণে ভক্তরা গান গাইবেন।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর