Thursday 17 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

এ বছর ‘হচ্ছে না’ ইউপি নির্বাচন!

নাজনীন লাকী, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:০৩

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফাইল ছবি

ঢাকা: আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘিরে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মাত্র চার দিন আগে নির্বাচন কমিশন নভেম্বর থেকে সাত ধাপে দেশের সাড় চার হাজারের বেশি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানালেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এখন তারা নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে কিছুটা কৌশলগত ব্যাখ্যা দিচ্ছে। কমিশন বলছে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে উপযুক্ত ‘স্লট’ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তারা এও দাবি করেছে, কমিশন আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা একে ইসি ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে দেখছেন।

বিজ্ঞাপন

সোমবারের সেই ঘোষণা ও ইসির প্রাথমিক ছক

এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপরবর্তী ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকারের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত ভোট করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, দেশের মোট ইউনিয়ন ৪ হাজার ৫৮০টি। এসব ইউনিয়নে সাত ধাপে ভোট করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছে। নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখগুলো হলো- প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে।

নাখোশ সরকার ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ

এদিকে ইসির সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর পরই সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল প্রতিনিধি ইসির কার্যপদ্ধতি ও এখতিয়ার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ভোটের তারিখ জেনেছেন। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠকের পর তারিখ ঘোষণার কথা।’

এদিকে একইদিনে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে ইসি কেবল সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ। অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনে ইসিকে সরকারের সঙ্গে কোলাবোরেট (সমন্বয়) করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারিখ পেছাবে না এগোবে, তা আলোচনার বিষয়।’

এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। বিষয়টিকে ইসির একটি ‘টেনটেটিভ প্ল্যান’ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন অনুসারে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া নির্বাচন করা যাবে না। ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্ত সিডিউল বা তফসিল ঘোষণা হবে।’

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ইসির নতুন ব্যাখ্যা

১৪ সেপ্টেম্বরের সেই ঘোষণার পর সরকারের মন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিক্রিয়া এবং বৃহস্পতিবারের (১৭ সেপ্টেম্বরের) আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ইসির সুর কিছুটা বদলে যায়। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে বলেন, ‘আগামী বছরের ৬ জুনের আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সবাই সম্মত হয়েছেন। তবে নভেম্বরের সম্ভাব্য সময়সূচির ব্যাপারে আমাদের টাইট স্পেস বা সময়ের সংকট রয়েছে।’

তবে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এও বলেন, “ইসি আগের অবস্থান থেকে সরেনি। সোমবারের সিদ্ধান্তটি ছিল একেবারেই একটি ‘প্রাক-প্রস্তুতিমূলক ও সম্ভাব্য’ (টেন্টেটিভ) সময়সূচি।” তিনি আরও বলেন, “আজকের প্রাপ্ত উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এখন দেখতে হবে, প্রস্তাবিত তারিখগুলোতে ভোট সম্ভব কি না। আমরা কমিশনের বৈঠকে বসে এবং আরও দুয়েকটি সাইডলাইন বৈঠক করে দ্রুতই চূড়ান্ত তারিখ জানিয়ে দেব।”

আরও পড়ুন

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক কাল / ইউপি নির্বাচন ঘিরে সরকার-ইসি টানাপোড়েন!

যে কারণে পেছাতে পারে ইউপি নির্বাচন

ইসি ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নির্বাচন পেছানো বা সূচি পুনর্নির্ধারণের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো-

শিক্ষা ব্যবস্থার জট ও বন্যার প্রভাব: সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়ে যাওয়া বন্যার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটেছে। শিখন ঘাটতি ও নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করার জন্য স্কুল-কলেজগুলোকে অতিরিক্ত ক্লাস ও পরীক্ষার সময় দিতে হচ্ছে।

শিক্ষক ও অবকাঠামোর সংকট: ইউপি নির্বাচন পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্থানীয় স্কুল-কলেজ। সেই সঙ্গে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে শিক্ষকদের বিশাল ভূমিকা থাকে। প্রতিটি ধাপের ভোটের জন্য একজন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, সমন্বয় ও নির্বাচনের মূল ডিউটি মিলিয়ে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য একাডেমিক কাজ থেকে সরিয়ে রাখতে হয়। টানা নির্বাচনের কাজে শিক্ষকদের নিয়োজিত রাখলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, খাতা মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক কাজ থেমে যাবে।

বাজেট ও সাচিবিক সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাজেট ও জনবল সমন্বয় নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া।

শিক্ষা ও পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি বাধা

ইসি জানিয়েছে, শিক্ষাপঞ্জি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের শেষভাগ থেকে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অত্যন্ত আঁটসাঁট।

নভেম্বর-ডিসেম্বর: এই দুই মাসজুড়ে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক এবং প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষাগুলো চলবে। ফলে এই সময়ে পর্যাপ্ত স্কুল ভবন ও শিক্ষকদের ফ্রি পাওয়া অসম্ভব।

জানুয়ারি: এই সময়টিতে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও নতুন শ্রেণিতে ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা চলে। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় মিললেও তা পুরো সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে নির্বাচন আয়োজনের জন্য যথেষ্ট নয়।

ফেব্রুয়ারি-মার্চ: আগামী ৭ অথবা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রমজান ও ঈদের টানা ছুটির মধ্যে এত বড় আকারের নির্বাচন আয়োজন করা বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব।

মার্চ-মে: রোজা ও ঈদের ছুটি শেষ হওয়া মাত্রই সারাদেশে শুরু হয়ে যাবে এসএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা। এসএসসি পরীক্ষার সময় সারাদেশের হাজার হাজার কেন্দ্র ও শিক্ষক সরাসরি ব্যস্ত থাকবেন।

জুন: আগামী বছরের ৬ জুন থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা আবারও পুরোপুরি সেখানে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে। সেসময় তৎকালীন কে এম নূরুল হুদা কমিশন মোট ছয় ধাপে এ নির্বাচন সম্পন্ন করেছিল। শিক্ষাখাতের এমন নানান সমস্যার কারণে সেবার প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১১ এপ্রিল। সেসময় প্রথম ধাপে দেশের ৩২৩টি ইউপিতে ভোট হয়।

ইসি-সরকারের ‘সমন্বয়হীনতা’, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তফসিল ঘোষণা করিনি; ভোটের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছিলাম। এখন আমরা আবার আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে বিস্তারিত জেনেছি। পরে বৈঠকে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো। তবে, এ বছর নির্বাচন হচ্ছে না- সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলীম সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নিয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আর কিছুই না। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছিল। এ ছাড়া সরকারে থাকা মন্ত্রীরাও নির্বাচনের তারিখ নিয়ে নানান আলোচনা করেছিল।’ তিনি জানান, কমিশন গত ১৪ সেপ্টেম্বর ৭ ধাপে যে সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিল সেইটা কিন্তু চূড়ান্ত তারিখ ছিল না। আর কমিশনও তফসিল ঘোষণা করেনি। এই পুরো যে বিষয়টা হয়েছে- সেটা ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া কিছুই না।

অপরদিকে আজ নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ১২ নভেম্বরে ৭ ধাপের স্থানীয় নির্বাচনের প্রথমধাপের তারিখ নির্ধারণ করলেও নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি ভোটের ‘স্লট’ এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।” কমিশনের এমন সিদ্ধান্তকে সমন্বয়ের অভাব বলছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম। তিনি জানান, হয়তো ইসির সঙ্গে সরকারের সমন্বয় না থাকার কারণে আজ কমিশনকে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের বিশাল এই নির্বাচন অনুষ্ঠান এখন ইসি, শিক্ষা প্রশাসন এবং নীতি-নির্ধারকদের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ের বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি শূন্যতা এড়াতে আইনগত বাধ্যবাধকতা ও প্রশাসনিক চাপ রয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষাবর্ষের সেশনজট নিরসন, বন্যার ধাক্কা সামলানো এবং এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই আপাতত এ বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে এই ইউপি নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত, ইসিকে এখন কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ দেখে নয়, বরং বাস্তবসম্মত একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। প্রস্তাবিত সাত ধাপের সময়সূচিতে কাটছাঁট করা কিংবা ছুটির গ্যাপগুলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে একটি নতুন এবং সমন্বিত তফসিল ঘোষণা করাই হবে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। সবমিলিয়ে এ বছর নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে কি না- সেইটা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে কমিশনের পরবর্তী সভা পর্যন্ত।

সারাবাংলা/এনএল/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

এ বছর ‘হচ্ছে না’ ইউপি নির্বাচন!
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:০৩

আরো

সম্পর্কিত খবর