ঢাকা: অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) আর্থিক সংকট দিনদিন গভীর হচ্ছে। মূলত নিয়মকে তোয়াক্কা না করে নামে-বেনামে বিতরণ করা হয়। সেই ঋণের বড় অংশ ফেরত আসছে না। এতে তর তর করে বেড়েছে খেঝলাপি ঋণের অঙ্ক। গত জুনে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। অথচ মাত্র বারো বছর আগে আওয়ামী লীগের টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমসতা গ্রহনের সময় ২০১৪ সালে খেলাপি ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ১২ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। মূলত সরকারের মদদপুষ্টরা নামে-বেনামে ঋণ ভাগায় ননেওয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে খেলাপিদের সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে খেলাপির বশিাল অঙ্কের টাকা বকেয়ার খাতায় রয়েছে, কিন্তু আদায়ের খাতা শূণ্যের কোটায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত জুন প্রান্তিক শেষে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর ওভারডিউ বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৩ দশমিকন ৬০ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার ধারাবাহিক অবনতি হচ্ছে। অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ আদায় না হওয়া, পরিচালকদের প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এ সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে ঋণ আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থাও কমেছে।
তারা আরো জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগের টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহনের সময় ২০১৪ সালে খেলাপি ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল থেকে এ খাতের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের মদদপুষ্ট লোকজন। আর করোনার পর তা ব্যাপক বেড়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ হয় ১৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে খাতটির ঋণ পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ প্রান্তিকে এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এরপর আর লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, কমপক্ষে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের ঘটনায় আলোচনায় আসে সাবেক ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা ও তদন্ত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠানও সংকটে পড়ে।
এনবিএফআই খাতে ঋণ আদায় না হওয়ায় একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। আমানতকারীরা অর্থ ফেরত চাইলে সেই চাপ আরও বাড়ছে। বর্তমানে খাতটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের তুলনায় ওভারডিউয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এতে নতুন করে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমছে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ খেলাপির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব নীতিমালা করেছে তাতে ঋণ খেলাপিরা অনেক ছাড় পেয়েছে। তার মতে, যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছে না, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুবিধা দিচ্ছে। এর ফলে খেলাপিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে ভালো গ্রাহকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। হঠাৎ হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নয়। তাদের কাজ বা নীতিগুলো হতে হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যাংকের জন্য মঙ্গলজনক। যাতে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল, প্রভিশন ঘাটতি কমে আসে। এসব সমস্যা সমাধানে অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এ খাতে তদারকি বাড়ানো উচিৎ।