ঢাকা: কলেজে পড়াশোনা করেন ইসমত আরা (১৭)। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি অল্প বয়সেই তার লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে। গত ৪ জুলাই তার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করানো হয়। আর ইসমতের লিভারের ডোনার তারই বড় বোন আয়েশা (২৪)। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর সুস্থ আছেন জানিয়ে সারাবাংলাকে আয়েশা বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটে। সেখানে চিকিৎসক আমাদের বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতাল রেফার করে। পরে এখানে এসে চিকিৎসা নিলে হাসপাতাল থেকে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের কথা বলা হয়। আমি আমার বোনকে লিভার দিয়েছি। আমরা প্রায় ২৯ দিন হাসপাতালে ছিলাম। বর্তমানে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না, আমরা দু’জন খুবই সুস্থ জীবন যাপন করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বোন যে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে এতে আমি খুবই আনন্দিত। আমরা আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। আমাদের পক্ষে দেশের বাইরে গিয়ে এত টাকা খরচ করে এই লিভার ট্রান্সফার করা সম্ভব ছিল না। বিএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখন আমাদের জানাল যে, তাদের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে ফ্রি ট্রান্সপ্লান্ট করার একটা সুযোগ আছে, তখন এটা আমরা আর না করতে পারি নাই।’
দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগের (সিরোসিস বা ক্যানসার) কারণে লিভার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন পড়ে। তবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের কথা চিন্তা করলে কপালে ভাঁজ পড়ে কোটি টাকার। তারপরও অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে করাচ্ছেন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট। তবে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষেরই এই ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা না থাকায় অনেকেই দ্রুত মৃত্যু বরণ করছেন। কিন্ত বাংলাদেশেই মাত্র ৩০ লাখ টাকায় সম্ভব লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট। সম্প্রতি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ছয়টি সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করে চিকিৎসকরা এমনই বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন। এমনকি, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা রোগীরা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপনও করছেন।
বিএমইউর সাবেক উপাচার্য ও হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমের তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে লিভার রোগে আক্রান্ত। বছরে ২২ থেকে ২৫ হাজার মানুষ লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারে মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে বছরে কমপক্ষে ১ হাজার রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা প্রয়োজন। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে রোগী দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকে এবং তারা স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে।

বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে সুস্থ আছেন এই দুই বোন । ছবি কোলাজ: সারাবাংলা
লিভারের আরেকজন ডোনার হলেন সুমাইয়া। তিনি তার বাবাকেই লিভার দিয়েছেন। এ বিষয়ে সুমাইয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নারায়ণগঞ্জ সদরে থাকি। সেখান থেকে এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা করিয়াছি এবং লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমার বাবার লিভার সিরিসিস ধরা পড়ে। আমি আবার বাবাকে লিভার দিয়েছি। গত ৩ জুলাই আমাদের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়।’
লিভার ট্রান্সপ্লান্ট এর জন্য আলাদা কোন খরচ করা হয়েছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ জন্য আমাদের কাছ থেকে কোনো খরচ রাখা হয়নি। এটা আমাদের সরকারিভাবে করিয়াছে। তবে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার পর কয়েক লাখ টাকার ওষুধ লাগছে। সেগুলো আমাদের দিতে হয়েছে।’
রাজধানী ঢাকার বনশ্রীতে থাকেন জোসনা বেগম। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করিয়ে সুস্থ আছেন তিনি। সারাবাংলাকে জোসনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আমাকে লিভার দিয়েছে। আমি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাতে প্রথমে চাইনি। কিন্তু আমাকে বলল যে, আমার অনেক বড় সমস্যা হয়েছে, এটা না করলে আরও বেড়ে যাবে। পরে আমাকে সাহস দিলে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানোর সম্মতি দিই। আমি সুস্থ আছি এবং হাসপাতালের প্রতিও আমি খুবই সন্তুষ্ট।’
রোগী হাসপাতালে গেলেই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে পারবেন কিনা?- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক (ডা.) বিধান সি. দাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘কেউ এলেই যে তিনি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে পারবেন বিষয়টি কিন্তু তা নয়। আমরা অনেক রোগী থেকে বাছাই করে ৫০ জন নিয়েছি। পরে সেখান থেকে বেছে আমরা দু’জন নিয়েছি। এত বড় সার্জিক্যাল জার্নিটা খুব সহজ নয়।’

বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে সুস্থ আছেন বাবা ও মেয়ে। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা
বিএমইউতে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমকে একটি স্থায়ী ও গতিশীল রূপ দেওয়ার বিষয়ে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সারাবাংলাকে সিদ্দিকী বলেন, ‘বিএমইউতে সম্প্রতি চার জনসহ একবছরের মধ্যে ছয় রোগীর লিভার সফলভাবে ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। আরও চারটি অপেক্ষমাণ আছে। লিভার ট্রন্সপ্ল্যান্ট সার্জারির জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ নিয়ে একটি দক্ষ টিমওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। বিএমইউ লক্ষ্য মাসে দু’টি এবং বছরে ২৪টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করা। কারণ, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পূর্ণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এতে প্রচুর রক্ত প্রয়োজন হয়, অন্তত ১৫০ ব্যাগ রক্ত প্রস্তুত রাখতে হয়। তবে রোগীদের চাপ তৈরি হলে ট্রান্সপ্ল্যান্টের এই সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।’
দেশে আর কোথাও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয় কিনা?- এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘দেশে ছোটখাটো দুয়েক জায়গায় চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু, দেশে আর কোথাও হচ্ছে বলে আমার জানা নাই।’ দেশেই লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের খরচ আরও কমানো সম্ভব কিনা?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদেশে, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশেও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু বিএমইউতে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কমবেশি ৩০ লাখ টাকার মতো ব্যয় হবে। দেশে রোগীরা বিএমইউ’র ওপর আস্থা রেখেই লিভার ট্রন্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম সেবা নিতে পারেন।’
বিএমইউ উপাচার্য বলেন, ‘দেশের মানুষদের আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম আইনগতভাবে সব বিধিবিধান মেনে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হবে। সেই সঙ্গে ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিকমান নিশ্চিত করা বিএমইউ’র বর্তমান প্রশাসনের একটি অন্যতম লক্ষ্য।’
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর দু’টি এবং ২০২৬ সালের ৩-৪ জুলাই ও ১১-১২ সেপ্টেম্বর চারটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দের আওতায় রোগীদের এসব ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিনামূল্যে করা হয়। বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি, হেপাটোলজি এবং অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগসহ মোট ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এসব সার্জারি সম্পন্ন হয়। এই সকল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করতে ভারতের হায়দ্রাবাদস্থ এআইজি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিম বিএমইউর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে।