নীলফামারী: রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে প্রাইভেট কারের চাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম নিহতের ঘটনায় তার স্বজনেরা গাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার লেনদেন করার মাধ্যমে আপস-মীমাংসা করেছেন।
মামলার বাদী ও নিহতের সৎভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম ওই টাকা গ্রহণ করে মামলাটি প্রত্যাহার এবং আসামিদের জামিনে আপত্তি না জানানোর অঙ্গীকার করেছেন। আপসনামায় নিহতের বাবা এরশাদুল হক ও মামা খায়রুল ইসলাম সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে নিহত মেহেদীর চাচা রাকিবুল ইসলাম পরিবারের পক্ষে জানান, মামলার বাদী মোক্তাদীর নিহত মিমের সৎভাই। সে মেহেদী বা তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতেন না এবং পরিবার নিয়ে আলাদা থাকত। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও মেহেদীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। অদূর ভবিষ্যতে এই অস্বচ্ছল পরিবারের পক্ষে মামলা চালিয়ে যাওয়া অনেকটাই কঠিন। তাই সমঝোতা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিবারে সবার মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারন ঢাকায় গিয়ে মামলা চালানোর মতো সামর্থ্য এই পরিবারের নাই। এখন পর্যন্ত টাকা তাদের হাতে আসেনি তবে পরবর্তীতে টাকা নিয়ে কোনো ঝামেলা হবার আশঙ্কা দেখেন না তিনি।
গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম (২৪)। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তার মৃত্যু হয়। মেহেদী নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামের হাজীপাড়ার এরশাদুল হকের ছেলে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জানাজা শেষে নিজ এলাকায় দাফন সম্পন্ন হয় মেহেদীর।
এ ঘটনায় মেহেদীর বড় ভাই মো. মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, বেপরোয়া গতিতে প্রাইভেট কার চালিয়ে মেহেদীকে চাপা দেওয়া হলে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। এজাহারে গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারক (৪৪) নামের একজনকে আসামি করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ বছর বয়সী আযান আলী শরীফকে ওই মামলায় আইনের সংস্পর্শে আনা হয়।
আযানের জামিন আবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় কিশোরটি গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা ছিল। নিহত মেহেদী শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। হর্ন বাজানোর পরও তিনি দ্রুত সরে যেতে না পারায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনার পর কিশোরের পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেহেদীর দাফন-কাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা এবং তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা এরই মধ্যে নিহতের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আপসনামায় আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে বা খালাস পেলে নিহতের পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, মামলাটি তদন্তকালে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পরপরই প্রাইভেট কারের ডান পাশের চালকের দরজা খুলে আযান আলী শরীফ বের হয়ে আসেন। তদন্তে ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক রাখার আবেদন করা হয়। পরে শুনানি শেষে কিশোরের আইনজীবীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে টাকা নিয়ে বিষয়টি সমাধান করায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা বলেন, দোষীদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে অপরাধীরা এভাবে রেহাই পেলে দিন দিন এই ধরনের অপরাধ করতে অনেকেই উৎসাহী হবে।