যশোর: যশোর শহরের স্টেডিয়ামপাড়ার একটি ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশুনা করেন মাহফুজুর রহমান। ২০২৫ সালে সহকারি প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মনিরামপুর উপজেলায়। চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন নিয়োগপত্র পাওয়ার। কিন্তু অন্যরা নিয়োগপত্র পেলেও পাননি তিনি। হতাশায় বাড়িতে ফিরতে পারছে না মাহফুজ।
অভিযোগ জানালেন, পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে অযৌক্তিকভাবে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাহফুজুরের দাবি, ‘সরকারি চাকুরি করার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে যশোরে এসেছিলাম। ৮ বছর ধরে ছাত্রাবাসে পড়াশুনা করছি। অর্নাস মাস্টার্স শেষ করে বিভিন্ন চাকুরি পরীক্ষা দেই। এরমধ্যে ২০২৫ সালে সহকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে চুড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিলাম। তখন বাড়ির লোকজনকে খুশি হয়। এলাকায় মিষ্টি বিতরণও করে। স্বপ্নও দেখতে শুরু করি, একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবো। দীর্ঘ আট মাস ধরে নিয়োগপত্র না দিয়ে আমাদের গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। ঐ তালিকায় আমার নাম না পেয়ে জেলা অফিসে যোগাযোগ করি, তারা জানায় গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাহফুজ বলছিলেন, আমার চাকুরি হওয়াতে মা বাবা অনেক খুশি হয়েছিলেন। এলাকায় সবাই জানে আমার চাকুরি হয়েছে। এখন যদি চাকুরি না হয়; কোন মুখ নিয়ে বাড়িতে যাবো।
গত বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলো ২৯০ জন, কিন্তু এর মধ্যে ১৮৪ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে, গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ভিত্তিতে ১০৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পেয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক প্রার্থী। উপায়ান্ত না পেয়ে আজ শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ছুটির দিনেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জড়ো হতে থাকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস চত্বরে। কর্মকর্তাদের কারও সাড়া না পেয়ে চলে যান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও। সেখানে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিয়োগপত্র না পাওয়া এসব শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবকেরাও। প্রশ্ন তোলেন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে।
হাবিবুর রহমান নামে সুপারিশ প্রাপ্ত হওয়া এক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। এখন ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ না পাওয়ায় আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা হতাশ। খবরটি শোনার পর মা কান্না করেছেন, বাবাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। আমাকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক।’
হাবিবুরের মতো ৮০ থেকে ৯০ জনের দেখা মিললো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে। তাদের সবার হাতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার কাগজপত্র। সবার চোখে মুখে হতাশার চাপ।
সাদ্দাম হোসেন নামে আরেক পরীক্ষার্থী বলেন, সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর আবার কিসের ভেরিফিকেশন। এটা প্রহসন। আমাদের সাথে জুলুম করা হয়েছে। আমাদের স্বপ্নকে কবর দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ না করলে, চাকুরি হবে না-এমন নীতি ছিলো গত সরকারের সময়। সেই পথে যদি এই সরকারও হাটে, তাহলে কিসের এতো পরিবর্তন হলো বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়াতে গত আট মাস ধরে অন্য কোথাও আবেদন করেনি। এমনকি মাঝে ডাকবিভাগে ভাইবার জন্য ডেকেছিলো; সেখানেও যায়নি। ভেরিফিকেশনের বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান তিনি।
ছেলের সঙ্গে ডিসি অফিসে আসেন আব্দুল হামিদ। পেশায় কৃষক এই বাবা বলেন, বিনা টাকায় চাকুরি হওয়াতে গ্রামের মানুষ খুশি হয়েছিলো। কাল রাতে শুনি ছেলেরে নাকি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই কথা শুনে বাড়ির লোকসব স্তব্ধ হয়ে গেছে। ছেলে ও তার মা খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়েছে। হওয়া চাকুরি যোগদান করার আগে বাদ দেওয়া অবিচার। আমি আর আমার ছেলে কোন দল করি না। দ্রুত আমার ছেলেরে নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এই বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিস কিংবা জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তাদের দফতরে গেলেও তাদের পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া দেয়নি।
তবে এদিন দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কর্মসূচিতে সরকারি সফরে আসেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এসময় তিনি সেখানে অবস্থানরত সুপারিশপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীদের কথা শুনে সভাকক্ষে প্রবেশ করে। সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী পরীক্ষার্থীদের বলেন, তাদের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা দ্রুতই আপনাদের (পরীক্ষার্থীরা) সমস্যা সমাধান কিংবা বাদ দেওয়ার কারণ জানাবেন।
উল্লেখ্য, নিয়োগপত্র পাওয়ার পর আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান করার কথা প্রার্থীদের। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে তাদের পদায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।