প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকের বেশি সময়ের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হল। এটি একটি রেকর্ড। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে উনার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা কর্তৃক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্যের মূল কথা তুলে ধরাই এই প্রবন্ধ বা মতামতের উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস পড়তে গেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চটিকে কোনোভাবেই পাশ কাটানো যায় না। আমার কাছে এই মঞ্চের গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে এখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানরা বক্তব্য দিয়েছেন; বরং এই বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশ নিজেকে পৃথিবীর সামনে কীভাবে দেখতে চেয়েছিল এবং নিজের সমস্যাগুলোকে কী ভাষায় আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করেছিল।
এই জায়গা থেকেই মহাম স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ২৬ আগস্ট ১৯৮০ সালের জাতিসংঘ বক্তব্যকে দেখতে হয়। তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের রাষ্ট্র। অর্থনীতি দুর্বল, দারিদ্র্য প্রবল, খাদ্য ও জ্বালানি সমস্যা তীব্র, আর বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক কাঠামোর মধ্যে চলছে যেখানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ব্যবধান ক্রমেই চোখে পড়ার মতো। সেই সময় জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে গিয়ে শুধু বাংলাদেশের দুঃখ-দুর্দশার তালিকা দেননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পৃথিবীর এক অংশকে বিপুল সম্পদের অধিকারী করে এবং অন্য অংশকে ক্ষুধা, ঋণ ও দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে দেয়, সেই ব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত?
নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের অধিকার, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, সামরিক ব্যয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—এসব বিষয় তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে আলাদা করে দেখেননি। তার বক্তব্যে ক্ষুধার্ত মানুষের নিরাপত্তাও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অংশ।
তেরো বছর পর, ১ অক্টোবর ১৯৯৩ সালে, সাবেক ৩বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন। ততদিনে পৃথিবী বদলে গেছে। শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো সমীকরণ ভেঙে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। ফলে তার বক্তব্যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক আইন, পানি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, শরণার্থী সমস্যা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে আমার কাছে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার মনে হয়: সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে, আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার বদলেছে—কিন্তু বাংলাদেশের মৌলিক কিছু স্বার্থ বদলায়নি। উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ—এই বিষয়গুলো দুই সময়েই ফিরে এসেছে। পার্থক্য হলো, ১৯৮০ সালের বক্তব্যে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; ১৯৯৩ সালে সেই প্রশ্নের সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শান্তিরক্ষার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
১৯৮০: যে পৃথিবীতে জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে কথা বলেছিলেন
১৯৮০ সালের পৃথিবী আজকের পৃথিবী ছিল না। শীতল যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। একই সময়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবধান ছিল প্রকট। উন্নয়নশীল দেশগুলো তখন একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলছিল: আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মগুলো যদি এমন হয় যে শক্তিশালী দেশগুলো আরও শক্তিশালী হবে আর দরিদ্র দেশগুলো ঋণ, দারিদ্র্য ও নির্ভরতার মধ্যে আটকে থাকবে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে ন্যায়সংগত বলা যাবে কীভাবে?এই পটভূমিতেই New International Economic Order বা নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবি সামনে আসে। জিয়াউর রহমানের বক্তব্যকে এই ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তার আসল রাজনৈতিক অর্থ হারিয়ে যায়। তিনি জাতিসংঘে গিয়ে প্রথমেই ধনী ও দরিদ্র বিশ্বের ব্যবধানের দিকে আঙুল তোলেন। আমার দৃষ্টিতে, এটাই তার বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা। তিনি বাংলাদেশের দারিদ্র্যকে শুধু বাংলাদেশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেননি; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক খুঁজেছেন।
জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি।
তিনি Brandt Commission-এর সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান এবং উত্তর ও দক্ষিণের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এখানে একটি বিষয় আমার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তিনি উন্নয়নশীল দেশকে করুণার পাত্র হিসেবে দেখাতে চাননি। তার বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখানোর চেষ্টা ছিল। বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি এবং সম্পদের ন্যায্য প্রবাহ—এসব তার কাছে আলাদা আলাদা বিষয় ছিল না। এগুলো ছিল একই সমস্যার বিভিন্ন দিক। অর্থাৎ প্রশ্নটা ছিল শুধু ‘বাংলাদেশকে সাহায্য দিন’ নয়। প্রশ্নটা ছিল আরও বড়: আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মগুলো কি এমনভাবে বদলানো যায়, যাতে বাংলাদেশের মতো দেশ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়?
দারিদ্র্য ও ক্ষুধা: নিরাপত্তার অন্য মুখ
জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের আরেকটি জায়গা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়—তিনি সামরিক নিরাপত্তার বাইরে মানুষের বাস্তব নিরাপত্তার কথা বলেছেন। পৃথিবীর একদিকে যখন বিপুল অর্থ অস্ত্রের পেছনে ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবে আছে—এই বৈপরীত্য তিনি সামনে আনেন। এখানে তার বক্তব্যের যুক্তি ছিল সরল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য শান্তি কেবল যুদ্ধ না থাকার নাম নয়। মানুষের খাবার দরকার, চিকিৎসা দরকার, শিক্ষা দরকার, কাজ দরকার। এই অর্থে উন্নয়নও নিরাপত্তা। আজ ‘human security’ শব্দটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় পরিচিত। ১৯৮০ সালের বক্তব্যে সেই আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার না থাকলেও মানুষের জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তাকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শান্তির সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট।
স্বল্পোন্নত দেশ: সাহায্য নয়, সুযোগ
জিয়াউর রহমান স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং জ্বালানি—সবকিছুর ক্ষেত্রেই তিনি অধিক কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্যকে শুধু সাহায্যের আবেদন হিসেবে পড়লে ভুল হবে। আমার মতে, এখানে আসল কথা ছিল সুযোগ তৈরি করা। একটি দরিদ্র দেশকে কিছু অর্থ দিয়ে সাহায্য করা আর তাকে এমন আন্তর্জাতিক পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে নিজে উৎপাদন করতে পারে, বাণিজ্য করতে পারে এবং প্রযুক্তি অর্জন করতে পারে—এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে দ্বিতীয় চিন্তাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ কেন বারবার খাদ্য ও জ্বালানির জন্য বাইরের ওপর নির্ভর করবে? কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়? কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্য সুযোগ পাওয়া যায়? কীভাবে প্রযুক্তির দরজা খোলা যায়? এই প্রশ্নগুলো তার বক্তব্যের ভেতরে ঘুরে ফিরে এসেছে।
আত্মনির্ভরতা বনাম আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো—তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছেন, অন্যদিকে দেশের নিজস্ব সক্ষমতার ওপরও জোর দিয়েছেন। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ—এসবকে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেন। এখানে আমি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখি: আত্মনির্ভরতা আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে তিনি পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখেননি। বাংলাদেশের নিজের শক্তি বাড়াতে হবে—এটা এক কথা। আর সেই শক্তি বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার—এটা আরেক কথা। দুটি অবস্থান একসঙ্গে সত্য হতে পারে। এই বাস্তববাদী জায়গাটি তার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
দক্ষিণ এশিয়া: একা এগোনো সম্ভব নয়
জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার কথাও আসে। আমার কাছে এই অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি অঞ্চল যেখানে ইতিহাস, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। একটি দেশ একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো দরকার—এই চিন্তা পরবর্তীতে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথকে প্রভাবিত করে। ফলে ১৯৮০ সালের বক্তব্যের আঞ্চলিক সহযোগিতার ভাবনাকে বাংলাদেশের পরবর্তী আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হিসেবে দেখা যায়।
১৯৯৩: পৃথিবী বদলেছে, বাংলাদেশের প্রশ্নও বদলেছে
১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়া যখন জাতিসংঘে বক্তব্য দেন, তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো কাঠামো ভেঙে গেছে। শীতল যুদ্ধ শেষ। কিন্তু পৃথিবী শান্ত হয়ে যায়নি। বরং নতুন ধরনের সংঘাত, জাতিগত সহিংসতা, মানবিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্রীয় সংকট সামনে এসেছে। এই বাস্তবতা খালেদা জিয়ার বক্তব্যেও স্পষ্ট। তিনি শুধু অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ, পানি, শরণার্থী, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং শান্তিরক্ষা—সবকিছুই তার বক্তব্যে জায়গা পেয়েছে। এখানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিধি স্পষ্টভাবেই বড় হয়েছে।
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন: দুটি আলাদা জগত নয়
খালেদা জিয়ার বক্তব্যে গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাষ্ট্রে নির্বাচন বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকলেই গণতন্ত্রের কাজ শেষ হয়ে যায় না। মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়া দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে যুক্ত করেন। জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনের Index to Proceedings-এ তার বক্তব্যের সঙ্গে Democracy, Environment, Human Rights, International Security, International Trade এবং Peace-keeping Operations-সহ একাধিক বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের বাংলাদেশের বক্তব্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আলাদা বাক্সে রাখা হয়নি।
ছোট রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক আইন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের শক্তি সামরিক দিক থেকে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মতো নয়। তাই আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জন্য নিছক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়টি এই বাস্তবতার প্রতিফলন। সীমান্ত, নদী, সমুদ্র, বাণিজ্য—এসব বিষয়ে একটি ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ অনেক সময় তার আন্তর্জাতিক আইনি অবস্থান এবং কূটনৈতিক যুক্তি। এই জায়গায় জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গঙ্গার পানি: জাতীয় স্বার্থ যখন আন্তর্জাতিক প্রশ্ন
১৯৯৩ সালের বক্তব্যে পানি ও গঙ্গার প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের জন্য সরাসরি জাতীয় স্বার্থের বিষয়। এখানে বিষয়টি শুধু একটি নদীর পানি নয়। নদীর পানি কৃষির সঙ্গে জড়িত, কৃষি খাদ্যের সঙ্গে জড়িত, খাদ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। তাই আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বাংলাদেশের কাছে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক এবং মানবিক—তিন ধরনের প্রশ্ন। খালেদা জিয়া এই সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরেন। আমার কাছে এখানেই এই বক্তব্যের কূটনৈতিক গুরুত্ব। একটি জাতীয় সমস্যা কীভাবে আন্তর্জাতিক নীতির ভাষায় তুলে ধরতে হয়, তার একটি উদাহরণ এখানে পাওয়া যায়।
পরিবেশ: উন্নয়ন থামবে না, কিন্তু পরিবেশও উপেক্ষিত হবে না
১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিটের পর পরিবেশ ও উন্নয়নের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পেয়েছিল। খালেদা জিয়ার বক্তব্যেও এই প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশকে যদি বলা হয়—’পরিবেশ বাঁচাতে উন্নয়ন বন্ধ করুন’, তাহলে সেটা বাস্তবসম্মত নয়। আবার উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করাও দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। সুতরাং আসল প্রশ্ন ভারসাম্যের। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের অধিকার থাকবে, আবার পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্বও থাকবে—এই দ্বৈত বাস্তবতা ১৯৯৩ সালের বক্তব্যে স্পষ্ট। পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও climate justice নিয়ে বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক অবস্থান গড়ে ওঠে, তার সঙ্গে এই চিন্তার একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি ও বাণিজ্য: উন্নয়নকে টেকসই করার প্রশ্ন
খালেদা জিয়ার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তির প্রশ্নও এসেছে। শুধু সাহায্য দিয়ে একটি দেশ উন্নত হয় না। একটি দেশকে উৎপাদন করতে হয়, বাজারে প্রবেশ করতে হয়, প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে হয়। এই জায়গায় জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের বক্তব্যের সঙ্গে ১৯৯৩ সালের বক্তব্যের একটি স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। দুই সময়েই বাংলাদেশের জন্য এমন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায় যেখানে উন্নয়নশীল দেশ শুধু সাহায্য নেবে না; বরং উৎপাদন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্ত করবে।
সার্ক: প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজ করার বাস্তবতা
১৯৯৩ সালে সার্ক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনা খালেদা জিয়ার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। এখানে বাংলাদেশের কূটনীতির একটি বাস্তব কাঠামো দেখা যায়: বিশ্বের জন্য জাতিসংঘ, অঞ্চলের জন্য সার্ক। অর্থাৎ বাংলাদেশ একই সঙ্গে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক দুই স্তরেই নিজের স্বার্থ তুলে ধরতে চেয়েছে। এই দ্বিস্তরীয় কূটনীতি আজও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।
শরণার্থী প্রশ্ন: যে সমস্যা পরে আরও বড় হয়ে উঠবে
১৯৯৩ সালের বক্তব্যে মিয়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের প্রসঙ্গও ছিল। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরে এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অন্যান্য পক্ষের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগের কথা বলে। পরে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বড় প্রশ্নে পরিণত হয়। তাই ১৯৯৩ সালের এই অংশটি আজকের চোখে পড়লে আরও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। তখন যে সমস্যাটি একটি নির্দিষ্ট শরণার্থী সংকট হিসেবে সামনে ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, মানবিক দায়িত্ব ও আঞ্চলিক কূটনীতির বিশাল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা: বাংলাদেশ শুধু সাহায্য চায়নি
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় নিয়ে কথা বলতে গেলে শান্তিরক্ষার বিষয়টি বাদ দেওয়া যায় না। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের কথা উঠে আসে। নামিবিয়া, কুয়েত, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, মোজাম্বিকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের উল্লেখ ছিল। এখানে বাংলাদেশের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। বাংলাদেশ শুধু দরিদ্র দেশ নয়, শুধু সাহায্যপ্রার্থী দেশ নয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে—এই পরিচয়টিও তখন সামনে আসে। জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের বক্তব্যে যেখানে অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি জোরালো, ১৯৯৩ সালের বক্তব্যে বাংলাদেশ নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবেও তুলে ধরে।
বসনিয়া, ফিলিস্তিন ও বাংলাদেশের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৯৩ সালে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ছিল ভয়াবহ আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্র। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে সেই সংকট নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ফিলিস্তিন প্রশ্নও বক্তব্যে জায়গা পায়। এই অংশগুলো থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়: বাংলাদেশের জাতিসংঘ কূটনীতি সবসময় শুধু ‘আমাদের কী লাভ’ এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক সংঘাত, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার ও শান্তির মতো বৃহত্তর প্রশ্নেও বাংলাদেশ তার অবস্থান জানাতে চেয়েছে। অবশ্য এসব অবস্থানকে ১৯৯৩ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পড়তে হবে। বর্তমান পৃথিবীর মানদণ্ড দিয়ে তখনকার প্রতিটি অবস্থান বিচার করলে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।
যে জায়গায় দুই বক্তব্যের সবচেয়ে বড় মিল
দুই বক্তব্যে আমার চোখে সবচেয়ে বড় মিল হলো উন্নয়নকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা। জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। খালেদা জিয়ার কাছে উন্নয়ন আবার গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়ন কখনোই কেবল GDP বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব ছিল না। এর সঙ্গে মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান জড়িত।
যেখানে পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট
পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আলোচনার পরিধিতে। ১৯৮০ সালে অর্থনৈতিক প্রশ্ন প্রায় সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বাণিজ্য, ঋণ, প্রযুক্তি, জ্বালানি—এসব ছিল মূল কেন্দ্র। ১৯৯৩ সালে সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ, পানি, শরণার্থী এবং শান্তিরক্ষা যুক্ত হয়। এটা অস্বাভাবিক নয়। পৃথিবী বদলেছে, তাই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বক্তব্যও বদলেছে। একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যদি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে একটুও না বদলায়, তাহলে সেটি বরং অস্বাভাবিক।
জাতিসংঘ: ছোট রাষ্ট্রের জন্য বড় মঞ্চ
আমার কাছে এই দুই বক্তব্যের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য বহুপাক্ষিক কূটনীতির গুরুত্ব। বড় শক্তির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় শক্তির ভারসাম্য সবসময় সমান থাকে না। কিন্তু জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে ছোট রাষ্ট্রও কথা বলার সুযোগ পায়। অবশ্য শুধু কথা বললেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বদলে যায় না। কিন্তু নিজের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক রেকর্ডে তুলে ধরা নিজেই একটি কূটনৈতিক সম্পদ। জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক রেকর্ডে তুলেছেন। খালেদা জিয়া পানি, শরণার্থী, পরিবেশ ও শান্তিরক্ষার প্রশ্ন তুলেছেন। এই ধারাটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক ভাষায় বলা
দুই নেতার বক্তব্যের একটি বিষয় আমার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়: তারা জাতীয় স্বার্থকে কেবল জাতীয় অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের খাদ্য ও জ্বালানি সমস্যাকে উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। খালেদা জিয়া পানি, শরণার্থী, পরিবেশ ও বাণিজ্যের প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক আইন, মানবিকতা ও সহযোগিতার ভাষায় তুলে ধরেছেন। এটাই কূটনীতির শক্তি। একটি দেশ যদি শুধু বলে, ‘এটা আমার সমস্যা’, তাহলে অন্য রাষ্ট্রের আগ্রহ সীমিত হতে পারে। কিন্তু যখন বলা হয়, ‘এটি শুধু আমার সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি বৃহত্তর সমস্যা’—তখন আলোচনার পরিসরও বড় হয়।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক চিন্তায় দুই বক্তব্যের উত্তরাধিকার
দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কয়েকটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। (১)বাংলাদেশের কূটনীতিতে উন্নয়ন কোনো সাময়িক বিষয় নয়। জিয়াউর রহমানের সময় খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থায়ন ছিল কেন্দ্রীয় প্রশ্ন; খালেদা জিয়ার সময় তার সঙ্গে মানবাধিকার, পরিবেশ ও বাণিজ্য যুক্ত হয়েছে। (২)বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা। জাতিসংঘকে উভয় সময়েই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। (৩)আঞ্চলিক সহযোগিতা। দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের কূটনীতিতে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। (৪) শান্তি ও নিরাপত্তার বিস্তৃত ধারণা। জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি উপর জোর দিয়েছেন; খালেদা জিয়া শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের দিকে নজর দিয়েছেন। (৫) ছোট রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা। দুই বক্তব্যেই এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় যেখানে ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে না।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের জাতিসংঘ বক্তব্য এবং আপোষহীন দেশনেত্রী ৩বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের বক্তব্য—দুটিকে আমি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অবদানমূলক দুটি আলাদা অধ্যায় হিসেবে দেখি, কিন্তু বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখি না।
জিয়াউর রহমান যে সময়ে জাতিসংঘে কথা বলেছিলেন, তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্নগুলোর একটি ছিল অর্থনৈতিক টিকে থাকা এবং উন্নয়নের সুযোগ পাওয়া। তার বক্তব্যে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং সামরিক ব্যয়ের প্রশ্ন উঠে আসে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে শান্তির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের বক্তব্যে পৃথিবীর পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের কূটনীতিতেও প্রতিফলিত হয়। সেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক আইন, পানি, শরণার্থী, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং শান্তিরক্ষা—সবকিছু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে।
আমার কাছে এই দুই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় কিছু প্রশ্ন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি। বরং তাদের ভাষা বদলেছে। ১৯৮০ সালে প্রশ্ন ছিল: দরিদ্র দেশগুলো কেন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ন্যায্য সুযোগ পাবে না? ১৯৯৩ সালে সেই প্রশ্নের সঙ্গে যোগ হয়েছে: উন্নয়ন কীভাবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হবে? এই জায়গাতেই দুই বক্তব্যের ঐতিহাসিক যোগসূত্র।
জিয়াউর রহমানের বক্তব্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক চিন্তার একটি শক্তিশালী প্রকাশ। খালেদা জিয়ার বক্তব্য সেই চিন্তাকে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে আরও বিস্তৃত করে। তাই এই দুই বক্তব্যকে শুধু জাতিসংঘে দেওয়া দুটি বক্তৃতা হিসেবে দেখলে তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। এগুলো আসলে এমন দুটি মুহূর্ত, যখন বাংলাদেশ পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল—আমাদের সমস্যা আছে, কিন্তু আমরা শুধু সাহায্য চাইতে আসিনি; আমরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম, ন্যায়বিচার, সহযোগিতা এবং নিজেদের অবস্থান নিয়েও কথা বলতে এসেছি। এবং আমার বিচারে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাস বুঝতে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস, ঢাকা