Tuesday 29 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইসলামি ক্রেডিট কার্ডে সুদ নয়, বিলম্বের অর্থ যাবে দাতব্য খাতে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:১৮

– ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

ঢাকা: ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আওতায় ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার জন্য নতুন নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় ইসলামী ক্রেডিট কার্ডে (আইসিসি) সুদ বা সুদের হারের ভিত্তিতে কোনো চার্জ আরোপের সুযোগ রাখা হয়নি। ঋণসংশ্লিষ্ট সেবার জন্য নির্ধারিত ফি ব্যাংকের প্রকৃত সরাসরি ব্যয়ের বেশি হতে পারবে না। আর নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ না করলে যে অর্থ নেওয়া হবে, সেটিও ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানো যাবে না; তা সম্পূর্ণভাবে দাতব্য খাতে দিতে হবে।

গত বুধবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি বিভাগ ‘ব্যাংকগুলোর ইসলামি ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রম বিষয়ক নির্দেশিকা’ শীর্ষক এই নির্দেশনা জারি করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে জারি করা নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে শরিয়াহসম্মত পেমেন্ট উপকরণের চাহিদাও বাড়ছে। এ কারণে ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে পণ্য, চুক্তি, লেনদেন, ফি, পরিচালন পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, শরিয়াহ পরিপালন এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতিমালায় ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের মূল কাঠামো হিসেবে ‘ক্বারজে হাসান’ ও ‘উজরাহ’ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ক্বারজে হাসান হলো সুদমুক্ত ঋণ, যেখানে মূল অর্থই ফেরত দিতে হয়। অন্যদিকে উজরাহ হলো সেবার বিপরীতে নেওয়া ফি, মজুরি বা পারিশ্রমিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে, ব্যাংকের আয় গ্রাহকের বকেয়া অর্থের পরিমাণ, অর্থ পরিশোধে বিলম্বের সময় বা বিলম্বের কারণে বাড়তে পারবে না। কোনো ফি বাস্তব সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে এবং ঋণের ওপর রিটার্ন হিসেবে উজরাহ ব্যবহার করা যাবে না।

ক্রেডিট কার্ডের ‘চার্জ-ফ্রি ক্রেডিট পিরিয়ডে’ লেনদেনের তারিখ থেকে পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো চার্জ, মুনাফা বা ক্ষতিপূরণ নেওয়া যাবে না।

নতুন নীতিমালায় ফি ও চার্জকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক্যাটাগরি এ’তে এমন ফি রাখা হয়েছে, যা ক্বারজে হাসানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। এসব ফিতে নির্দিষ্ট শর্তে মুনাফার উপাদান থাকতে পারে।

‘ক্যাটাগরি বি’তে রয়েছে ঋণসংশ্লিষ্ট সেবা। কার্ড ইস্যু, নবায়ন ও প্রতিস্থাপন, অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ, নগদ উত্তোলন, ক্রেডিট সীমা বাড়ানো, ব্যবহার করা অর্থ কিস্তিতে নির্ধারণ, ব্যাংকের মাধ্যমে মুদ্রা রূপান্তর এবং নির্দিষ্ট কিছু কার্ড-নেটওয়ার্ক ও আদায়সংক্রান্ত খরচ এই শ্রেণিতে পড়বে। এসব ক্ষেত্রে শুধু ‘Actual Direct Cost’ বা প্রকৃত সরাসরি ব্যয় পর্যন্ত ফি নেওয়া যাবে; কোনো মুনাফা রাখা যাবে না।

প্রকৃত সরাসরি ব্যয়ের মধ্যে তৃতীয় পক্ষকে দেওয়া বাস্তব খরচ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা সম্পাদনকারী কর্মীর সরাসরি সময়ের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে তহবিলের খরচ, সুযোগব্যয়, মূলধনের খরচ, অফিস-ভাড়া, ইউটিলিটি, সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিপণন ব্যয় কিংবা করপোরেট সদর দপ্তরের সাধারণ ব্যয় এই হিসাবের মধ্যে যুক্ত করা যাবে না। বছর শেষে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ক্যাটাগরি-বি ফি প্রকৃত সরাসরি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকদের ফেরত দিতে হবে। তা সম্ভব না হলে সেই অর্থ ‘Charity Account’-এ জমা দিতে হবে।

ইসলামী ক্রেডিট কার্ডে গ্রাহকের ব্যবহার করা অর্থ নির্ধারিত তারিখে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। ন্যূনতম পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারিত তারিখে পরিশোধ করলে অ্যাকাউন্টকে বকেয়া হিসেবে গণ্য করা হবে না। আংশিক পরিশোধ করলেও নির্ধারিত কিস্তির দায় পুরোপুরি শেষ হবে না, তবে বকেয়া অর্থের ওপর বাড়তি কোনো অর্থ যোগ করা যাবে না। কার্ডে নগদ উত্তোলনের সুযোগ থাকলে তার সামগ্রিক সীমা ক্রেডিট সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ হতে পারবে।

ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিলম্বে পরিশোধের অর্থের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্ধারিত তারিখে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রতিটি পেমেন্ট পিরিয়ডে একবার মাত্র নিরুৎসাহমূলক জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। তবে সেই অর্থ ব্যাংকের আয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না এবং ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে এ অর্থ আলাদা করে দেখাতে হবে।

চুক্তির সময় গ্রাহককে অঙ্গীকার করতে হবে যে, আর্থিকভাবে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ না করলে নির্দিষ্ট একটি অর্থ অনুমোদিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করবেন। এই অর্থ বকেয়া টাকার পরিমাণ বা বিলম্বের সময়ের সঙ্গে বাড়বে-কমবে না এবং সম্পূর্ণ অর্থ দাতব্য খাতে দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের কোনো ফি বা চার্জ প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারকে ভিত্তি করে নির্ধারণ করা যাবে না। সুদের হারের কোনো শতাংশ হিসেবেও ফি নির্ধারণ করা যাবে না। ঋণসংশ্লিষ্ট ফি নির্দিষ্ট অঙ্কের হতে হবে এবং কার্ডের ক্রেডিট সীমা, বকেয়া অর্থ, বিলম্বের সময় বা পরিশোধে দেরির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারবে না।
অন্যদিকে বকেয়া অর্থ, ক্রেডিট সীমা, বিলম্বের সময় বা পরিশোধে দেরির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো পুনরাবৃত্ত বা পরিবর্তনশীল অর্থ, প্রকৃত সরাসরি ব্যয়ের বাইরে কোনো খরচ এবং ঋণসংশ্লিষ্ট কার্ডে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট, ইন্টারচেঞ্জ বা সুইচিং ফি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না।

কার্ডের চুক্তি করার আগে ব্যাংককে গ্রাহককে একটি ‘Product Disclosure Sheet’ দিতে হবে। এতে কার্ডের শরিয়াহ কাঠামো, সব ফি ও চার্জ, ফি নির্ধারণের পদ্ধতি, ন্যূনতম পরিশোধযোগ্য অর্থ, চার্জমুক্ত সময়, বিলম্বে পরিশোধের নিয়ম এবং গ্রাহকের দায়-দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

কার্ড পাওয়ার পর গ্রাহককে কমপক্ষে পাঁচ পূর্ণ কর্মদিবসের ‘কুলিং-অফ’ সময় দিতে হবে। এ সময়ে কার্ড বাতিল করলে সাধারণভাবে কোনো খরচ বা জরিমানা নেওয়া যাবে না। তবে চুক্তির সময় প্রকাশ করা এবং ফেরতযোগ্য নয়—এমন প্রকৃত সরাসরি ব্যয় থাকলে তা নেওয়া যেতে পারে। কার্ড সক্রিয় করা বা প্রথমবার ব্যবহার করলে এই সময় শেষ হয়ে যাবে।

কোনো ফি বা শর্ত পরিবর্তন করতে হলে সক্রিয় কার্ডধারীদের অন্তত ৩০ দিন আগে লিখিত বা ইলেকট্রনিকভাবে জানাতে হবে। ইস্যুর সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি—এমন কোনো চার্জ গ্রাহকের পূর্বানুমতি ছাড়া আরোপ করা যাবে না।

অননুমোদিত লেনদেনে ব্যাংকের দায়

ইসলামী ক্রেডিট কার্ড পরিচালনায় প্রতারণা ঠেকাতে ব্যাংককে ফ্রড মনিটরিং ও রিয়েল-টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকসেবা চালু রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। প্রতারণাজনিত আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে দায় ব্যাংকের, কার্ডধারীর নয়।
কার্ড হারানো, চুরি বা অননুমোদিত ব্যবহারের খবর পাওয়ার পর ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড ব্লক করতে হবে। ব্যাংককে অবহিত করার পর অননুমোদিত লেনদেন হলে তার অর্থ সাত কর্মদিবসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। নতুন কার্ড সক্রিয় করার আগে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকের সম্মতি যাচাইও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া ব্যাংক কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ইসলামী ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে পারবে না। একইভাবে কার্ড আপগ্রেড বা ক্রেডিট সীমা বাড়ানোও গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া করা যাবে না। কার্ডের বৈধতার মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হতে পারবে। ব্যাংক একতরফাভাবে কার্ডের ধরন বা সীমা বাড়াতে পারবে না। শর্ত বা চার্জে এমন পরিবর্তন হলে যাতে গ্রাহকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো বন্ধ ফি ছাড়াই কার্ড সমর্পণের সুযোগ দিতে হবে।

প্রতি মাস শেষে গ্রাহককে লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণসহ বিল দিতে হবে এবং নির্ধারিত পরিশোধের তারিখের অন্তত ১৪ দিন আগে বিলিং স্টেটমেন্ট পাঠাতে হবে। গ্রাহক বিল না পাওয়ার অভিযোগ করলে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে বিনা খরচে তার কপি দিতে হবে।
বকেয়া আদায়ে গ্রাহক, তার পরিবারের সদস্য, রেফারেন্স বা বন্ধুদের হয়রানি, হুমকি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আদায়ের জন্য ফোন বা সরাসরি যোগাযোগ কেবল অফিস সময়ের মধ্যে করতে হবে।

ইসলামী ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বাংলাদেশের আইনে অবৈধ বা শরিয়াহবহির্ভূত কোনো কার্যক্রম বা লেনদেন করা যাবে না। এমন ব্যবহার শনাক্ত হলে ব্যাংককে কার্ড সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানাতে হবে। মার্চেন্টদের ক্ষেত্রেও শরিয়াহবহির্ভূত লেনদেন ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ জন্য ব্যাংকগুলোকে মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড (MCC) ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ও সীমাবদ্ধ ব্যবসা বা লেনদেন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব তালিকা এবং ব্যতিক্রমের অনুমোদন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির (SSC) তত্ত্বাবধানে থাকবে।

প্রতিটি ব্যাংককে ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের ওপর অন্তত বছরে একবার শরিয়াহ অডিট করতে হবে। প্রকৃত সরাসরি ব্যয় নির্ধারণের পদ্ধতি, নিষিদ্ধ মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড, ইবরা নীতি, দাতব্য হিসাব এবং কার্ডের বিজ্ঞাপন ও প্রচারসামগ্রী শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটিকে অনুমোদন ও পর্যালোচনা করতে হবে।

শরিয়াহবহির্ভূত উৎস থেকে কোনো আয় হলে তা ব্যাংকের বণ্টনযোগ্য মুনাফা থেকে বাদ দিয়ে ‘Charity Account’-এ জমা করতে হবে। দাতব্য হিসাবে জমা হওয়া অর্থ এবং সেখান থেকে বিতরণের তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংককে ইসলামী ক্রেডিট কার্ড-সংক্রান্ত লেনদেন, অনুমোদন, বিলিং, গ্রাহকের সম্মতি, পণ্য-সংক্রান্ত তথ্য, শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির অনুমোদন, প্রকৃত সরাসরি ব্যয়ের হিসাব এবং দাতব্য হিসাবের রেকর্ড কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন নীতিমালার লক্ষ্য হলো উদ্ভাবন ও নৈতিকতা, বাজারের চাহিদা ও দায়িত্বশীলতা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। ক্বারদে হাসান, স্বচ্ছ উজরাহ এবং শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে ইসলামী খুচরা অর্থায়নকে আরও স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও উন্নয়নমুখী করাই এই কাঠামোর উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

দুর্গাপূজায় ছুটি বাড়ল
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৮

আরো

সম্পর্কিত খবর